সামাজিক বিচার বা পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার ভাল খারাপ দুই দিকই রয়েছে। এই ব্যবস্থাটি যেমন প্রচলিত আইনি সুরক্ষা পাওয়ার দীর্ঘসূত্রীতা ও অঢেল খরচের বিপরীতে স্বল্প সময়ে মানুষকে সুবিচার পাইয়ে দিতে পারে তেমনি আবার ক্ষেত্র বিশেষে পঞ্চায়েতি বিচারের নামে ব্যক্তি বিশেষের প্রতি চরম অন্যায়ও করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতিষ্ঠান হিসাবে গ্রাম আদালত চালু রয়েছে। এই গ্রাম আদালতের বাইরেও একেবারে সনাতনি পন্থায় গ্রামে বিচার-শালিস হতে দেখা যায়। বলা চলে গ্রামের ছোটখাট সামাজিক অপরাধ ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে এখন পর্যন্ত এই শালিসি পদ্ধতিটিই সবচাইতে বেশি কার্যকরী রয়েছে। যদিও এরকম বিচার ব্যবস্থার কোন স্বীকৃতি দেশের আইনে সমর্থন করে না তারপরও উপযোগিতা থাকায় গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় এটি এখনও জাঁকালোভাবেই রয়ে গেছে। এই ব্যবস্থাটি যে প্রায়স:ই ব্যক্তি বিশেষের জন্য পীড়াদায়ক ও বিড়ম্বনা তৈরি করে তা বুঝা যায় গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে। ওই সংবাদের তথ্য থেকে জানা যায়, ছাতক উপজেলার সিংচাপইড় ইউনিয়নের জিয়াপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাসুক মিয়াসহ ৬টি পরিবারকে গ্রামীণ শালিসের রায়ের নামে একঘরে করে রাখা হয়েছে। একঘরে হওয়া পরিবারগুলো দাবি করেছেন, তাদের বাজারের দোকানকোঠা খুলতে দেয়া হচ্ছে না এমনকি গ্রামের বারোয়ারি রাস্তা দিয়ে চলাচল করতেও বাধা তৈরি করা হচ্ছে। তারা নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি তারা ছাতক থানায় লিখিত অভিযোগ আকারে দাখিল করেছেন।
একঘরে করে রাখার বিষয়টি নিতান্তই সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়ন ব্যবস্থার একটি উপাদান। সাধারণত দুর্বলদের উপর সবলরা এরকম বিধি-নিষেধ আরোপ করে বশে রাখার চেষ্টা করত। সময় পালটালেও আমাদের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় এখনও যে কিছু সামন্তাবশেষ রয়ে গেছে জিয়াপুরের গ্রাম্য বিচারকদের একঘরে করে রাখার এই রায় তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই ৬ পরিবার দোষি না নির্দোষ এই তর্কে না জড়িয়েও আমরা বলতে চাই, একটি আইনি রাষ্ট্রকাঠামোর কোন অংশে কাউকে একঘরে করে রাখার বিধান বলবৎ করার কোন এক্তিয়ার কারও নেই। যদি ওই পরিবারগুলো প্রকৃত অর্থেই দোষি হয়ে থাকেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে বা থানায় আইনি প্রতিকার চাওয়া যেতে পারত। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মূল সুর ছিল সমঝোতা বা আপোষ নিষ্পত্তি। ওই গ্রামীণ বিচার কাঠামো কাউকে কোন কঠিন সাজা দিতে পারে না। আর তথাকথিত শালিস তো এরকম কোন বিরোধ নিষ্পত্তিতে জড়াতেই পারে না। জিয়াপুর সিংচাপইড় ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত। আইন মোতাবেক ওই এলাকার গ্রাম আদালতের প্রধান ইউপি চেয়ারম্যান। কিন্তু কথিত ঘটনাটি ওই ইউপি চেয়ারম্যানের অগোচরেই থেকে গিয়েছিল। সংবাদে উদ্ধৃত চেয়ারম্যানের পরিষ্কার বক্তব্য, একঘরে করে রাখার সিদ্ধান্তটি চরম অমানবিক ছিল এবং জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন তিনি। ছাতকের উপজেলা নির্বাহী অফিসারও তদন্তস্বাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
এখন দেখার বিষয় হলো, আইন ও বিধিবদ্ধ রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো এই বেআইনি ও অমানবিক ঘটনার জন্য কী ব্যবস্থা নেন। আমরা আইনমান্যকারী নাগরিক হিসেবে কামনা করি আইনবহির্ভূত সকল কর্মকা-ই যেন যথোচিত বিচারের আওতায় আসে। জিয়াপুরে ৬ পরিবারকে গ্রামীণ বিচারে প্রহসনের নামে যে অমানবিক সাজা দিয়েছে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ রাখছি। নতুবা বিচারের নামে প্রহসন আর দুর্বলের উপর সবলের উপর পীড়নের মাত্রা বাড়তেই থাকবে।

