সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য
সুনামগঞ্জ সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হীরক জয়ন্তি উৎসব উদযাপনকে সামনে রেখে একই পরিবার থেকে বেরিয়ে আসা সহোদরাদের নিয়ে আলোচনাই আজকের প্রয়াস। প্রয়াত মনোরঞ্জন চক্রবর্তী ও প্রয়াত দিপালী চক্রবর্তীর তিন কন্যা সম্পর্কে আলোকপাতের আগে মা দিপালী চক্রবর্তীর আলোকময় জীবন সম্পর্কিত বাস্তবতাকে সামনে আনতে চাই। একজন আলোকিত নারী হিসেবে কেবল সমাজকেই আলোকিত করেছেন তা নয়, নিজেও আলোকিত হয়েছেন এবং সেই আলোর পুরোটাই সমাজে দ্যুতি ছড়িয়েছে। সাত সন্তানের জননী এই নারী সপ্তম সন্তানের জন্মের পর স্নাতক ডিগ্রী লাভ করে সেই সময়ের সামাজিক অবস্থায় সুনামগঞ্জে বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করে অসাধারণ নারী হিসেবে নিজের পরিচয়কে বিশেষায়িত করেছিলেন। এক শব্দে তাঁকে ‘রতœগর্ভা’ বলা হয়। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নিজ শহরের পুনর্বাসন ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু অবদান রেখেছেন।
তাঁদের তিন কন্যা হলেন : – রতœা চক্রবর্তী , মুক্তা চক্রবর্তী ও ভারতী চক্রবর্তী জবা। তিনজনই কৈশোরে সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছেন। এবার এই তিন কন্যার নিজ নিজ স্বতন্ত্রতা ও স্বকীয়তা নিয়ে আলোকপাত করা যাক।
রতœা চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ শহরে নিজ পিত্রালয়ে। ১৯৬৮ সালে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন এবং
পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে একই কলেজে অধ্যয়ন করে স্নাতক(বিজ্ঞান) ডিগ্রী লাভ করেন। সেই বৎসর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের হার ছিল শতকরা তিন জন। তাঁর জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের পর নিতান্তই শখের বশে আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন, সুনামগঞ্জে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর হবিগঞ্জ সরকারি বি কে জি সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। তারপর সিলেটের সরকারী অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলী এবং পরবর্তীতে পদোন্নতি। প্রধান শিক্ষিকা(ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কয়েকমাস দায়িত্ব পালনের পর জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেসময় সরকারী সফরে ইংল্যান্ড থেকে ঘুরে আসেন। প্রধান শিক্ষিকা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে ২০১২ সালে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
শৈশবেই গানের প্রতি ঝোঁক ছিল রতœা চক্রবর্তীর। ওস্তাদ করুণাময় চৌধুরীর তালিমে নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে রেডিও পাকিস্তান সিলেটে নজরুল গীতির নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে ঢাকা গিয়ে প্রিয় গীত ¯্রষ্টা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁরই রচিত গান গেয়ে শুনিয়েছেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হাসন রাজার গানের সিডিতে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। এই অসামান্য গুণবতী নারী রতœা চক্রবর্তীর এক পুত্র পেশায় ডাক্তার ও এক কন্যা পেশায় শিক্ষিকা। বর্তমানে স্বামী-পুত্র সহ তিনি হবিগঞ্জে নিজ বাসভবনে অবসর জীবন যাপন করছেন।
কনিষ্ঠা ভারতী চক্রবর্তী জবা মুক্তিযুদ্ধ উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে সংগ্রামের পরের দ্বিতীয় ব্যাচে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়ন করে এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
পেশাগত জীবনের শুরু ১৯৮৭ সালে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগদানের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারপর বিভিন্ন উপজেলায় বদলী হয়ে চাকুরি অব্যাহত রাখেন। চাকুরিকালীন সময়ে দুইবার শ্রেষ্ঠ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে সনদ ও পদক অর্জন করেন। ২০১৩ সালে অফিসিয়াল ভিজিট কালে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় আঘাত পাওয়ার পর ২০১৪ সালে চাকুরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন।
সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে জন্ম নেয়ায় শৈশব থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ছাড়াও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর ২/৩ বৎসর সুনামগঞ্জ মহিলা সমিতির সদস্যদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে নিতান্ত শখের বশে গান শেখানো শুরু করেন। পরবর্তীতে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অভিভাবকদের অনুরোধে নিজের বাসায় গানের স্কুল খুলতে বাধ্য হন। বড় ভাই প্রয়াত ডঃ মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী গানের সূক্ষ কলাকৌশল আয়ত্তে সকল সময় তাঁর সহযোগিতা গ্রহণ করতেন। পারিবারিক জীবনে স্বামী বিয়োগের পর একমাত্র সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট ভারতী চক্রবর্তী বর্তমানে প্রকৌশলী পুত্রটির সাথে ঢাকায় অবস্থান করে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।
তিন বোনের মধ্যে প্রয়াত মুক্তা চক্রবর্তী দ্বিতীয়। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে জন্ম ও বেড়ে ওঠার প্রভাবে প্রভাবিত তিনি নাচ, গান ও আবৃত্তিতে পটু ছিলেন। বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। নিজের সম্পৃক্ততার চেয়ে অন্যকে উৎসাহিত করে শিখিয়ে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে সফলতা দানেই ছিল তাঁর আনন্দ। জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর গত মার্চ ২০১৬তে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে স্বামী ও তিন সন্তান রেখে গেছেন। তাঁর আত্মার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।


