‘বীর নিবাস’ পেলেন ৫৪ মুক্তিযোদ্ধা

বিন্দু তালুকদার
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রতি অনুযায়ী ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের স্বাচ্ছন্দে বসবাস করার জন্য পাকা বসতবাড়ি  (বীর নিবাস) নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে। ৯ লাখ ৯ হাজার ৮৪৭ টাকা ব্যয়ে প্রতিটি বীর নিবাস (ছাদ ঢালাই পাকা বসতঘর) তৈরি করা হচ্ছে।
জাতীয় পতাকার লাল সবুজের রং এর আদলে লাল-সুবজ রং দিয়ে রাঙা করে বীর নিবাসের রঙিন করা হয়েছে। মূল ঘরটি সবুজ রঙ এর, গ্রীল, দরজা-জানালা ও কার্নিস লাল রঙ এর।  প্রতিটি বসত বাড়িতে রয়েছে ৩টি কক্ষ, ১টি রান্নার কক্ষ, ১টি বাথরুম, ঘরের পাশে টিউবওয়েল, ঘরের সামনে খোলা বারান্দা।
প্রতিটি ঘরে মোটা অক্ষরে লিখা থাকছে ‘বীর নিবাস’ মহান মুক্তিযুদ্ধ বিরোচিত অবদানের জন্য (মুক্তিযোদ্ধার নাম) কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার। সারা দেশের ন্যায় সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বীর নিবাস নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে।
৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮১১ টাকা ব্যয়ে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়ে ৫৪টি বীর নিবাস নির্মাণ করছেন এলজিইডি। ইতোমধ্যে অনেক ঘর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সদর উপজেলায় ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে, ছাতক উপজেলায় ৭ জনকে, শাল্লা উপজেলায় ৩ জনকে, দিরাইয়ে ৪ জনকে, জামালগঞ্জে ৩ জনকে, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ২ জনকে, তাহিরপুরে ৫ জনকে, দোয়ারাবাজারে ১১ জনকে, বিশ্বম্ভরপুরে ৪ জনকে ও ধর্মপাশা উপজেলায় ২ জনকে বীর নিবাস তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। ধর্মপাশা ছাড়া অন্য সকল উপজেলায় বীর নিবাস তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ছাতক, শাল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায়   মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বীর নিবাস হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামী মাসেই নির্মাণাধীন ঘরগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এলজিইডি কর্তৃপক্ষ।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, বীর নিবাস নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে জেলার সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইাউনিয়নের বনগাঁও সমাদনগর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রোশন আলী স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে, একই ইউনিয়নের হরিনাপাটি গ্রামের আব্দুল খালেক, মোল্লাপাড়ার উছারগাঁও গ্রামের আছির মিয়া, কুরবাননগর ইউনিয়নের মাইজবাড়ি গ্রামের আজিজুর রহমান, গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের আব্দুর রহিম, শহরের তেঘরিয়ার সোনাহর আলী, মোহনপুর ইউনিয়নের ভৈষবেড় গ্রামের মাকসুদা খাতুন, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের আমপাড়ার শাহজাহান, ঝরঝরিয়া গ্রামের  রফিকুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীরনগর গ্রামের আইয়ুব আলী, সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহীমপুর গ্রামের রজব আলী ও ষোলঘর গ্রামের ইব্রাহিম উল্লাহকে।
শাল্লা উপজেলায় বীর নিবাস পেয়েছেন হবিবপুর ইউনিয়নের চাকুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা রঞ্জন দাস, বাহারা ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের সুরেন্দ্র দাস ও সুকলাইন গ্রামের জগদীশ দাস।
ছাতকে বীর নিবাস পেয়েছেন কালারুকা গ্রামের আজিজুর রহমান, ছাতক পৌর শহরের বাগবাড়ির ময়না মিয়া, জলালীচর গ্রামের জিতু মিয়া, সিংগেরকাছ গ্রামের রহিমা বিবি, এছাড়া বিভিন্ন এলাকার গেদা বিবি, নূরুল ইসলাম ও অনিল চন্দ্র দাসকে।
দিরাই উপজেলায় পেয়েছেন ফজলুল হক, দিলীপ দে, কাজল রেখা খানম ও সুশীল রঞ্জন দাসকে। জামালগঞ্জ উপজেলায় বীর নিবাস পেয়েছেন বিনাজুরা গ্রামের কালী কুমার দাস, লম্বাবাঁক গ্রামের মন্তাজ আলী ও শাহপুর গ্রামের মৃত শামছুল হুদার স্ত্রী মোছাম্মৎ নুরুননাহার।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের বদউল্লাপুর গ্রামের রবিফুল বিবি ও পাথারিয়া ইউনিয়নের কান্দিগাঁও গ্রামের রাধাকান্ত দাসকে। জগন্নাথপুর উপজেলায় চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের দাসনোয়াগাঁও গ্রামের রনজিৎ কান্তি দাস।
তাহিরপুরে পাচ্ছেন রতনশ্রী গ্রামের আবুল কালাম, পুরানঘাট গ্রামের মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী জাহানারা বেগম, মোল্লাপাড়ার মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী সাহিদা বেগম, গোলপপুর গ্রামের হুসিয়া বেগম ও ভাটিতাহিরপুর গ্রামের কুদরত আলী।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় নরসিংপুর ইউনিয়নের সিরাজপুর গ্রামের আব্দুল মালিক, লক্ষীপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের জালাল উদ্দিন, সদর ইউনিয়নের মাঝেরগাঁও গ্রামের নূরুল ইসলাম, বাংলাবাজার ইউনিয়নের পেকপাড়ার মন্তাজ আলী, মান্নারগাঁও ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের আরশ আলী, সুরমা ইউনিয়নের টেংরাটিলা গ্রামের মুসলেম উদ্দিন, পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের মঙ্গলপুর গ্রামের মারফত আলী, বাংলাবাজার ইউনিয়নের ছননুগাঁও গ্রামের মফিজ উদ্দিন, দোহালিয়া ইউনিয়নের কান্দাগাঁও গ্রামের নূরুল ইসলাম, লক্ষীপুর ইউনিয়নের সুরিরগাঁও গ্রামের সিরাজ আলী ও বোগলাবাজার ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের আব্দুস শহীদ।
বিশ্বম্ভরপুরে পাচ্ছেন পলাশ ইউনিয়নের অচুকোনা গ্রামের কিতাব আলী, ধনপুর ইউনিয়নের সুরেশনগর গ্রামের আব্দুর রহমান, সলুকাবাদ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের নূরুল ইসলাম ও ধনপুর ইউনিয়নের রতারগাঁও গ্রামের ইছব আলী। ধর্মপাশা উপজেলায় বীর নিবাস পাবেন মুক্তিযোদ্ধার স্বজন ক্ষমা রানী সরকার ও আব্দুল হাসিম।
বীর নিবাসপ্রাপ্ত শাল্লা উপজেলা চাকুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা রঞ্জন দাস বলেন,‘আগে আমি কুড়েঘরে বাস করতাম। ঝড়-বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ত। এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় মাথা গোজার স্থায়ী ব্যবস্থা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া পাকা দালানকোটায় এখন বসবাস করছি। এর চেয়ে আনন্দ ও খুশির খবর কি হতে পারে। আমি খুবই আনন্দিত। আমি চাই বসতভিটাহীন সকল মুক্তিযোদ্ধাকেই আমার মত করে ঘর-বাড়ি দেয়া হোক। যাতে মুক্তিযোদ্ধারা মাথা গোজার জায়গা পায়।’
জামালগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অ্যাড. আসাদ উল্লাহ সরকার বলেন,‘দরিদ্র ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের পূনবার্সন করতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই উদ্যোগের ফলে বসতভিটাহীন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার স্থায়ীভাবে মাথা গোজার জায়গা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মহতী এই উদ্যোগকে মুক্তিযোদ্ধারা সারা জীবন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।’
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান বলেন,‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বীর নিবাস নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। যেগুলোর কাজ শেষ হয়েছে সেগুলি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকীগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরপরই আমরা হস্তান্তর করব।’
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষনা কেন্দ্র সুনামগঞ্জ এর আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী বলেন,‘ দেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধা দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। বসত-বাড়িহীন মুক্তিযোদ্ধাদের পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই, অভিনন্দন জানাই। মুক্তিযোদ্ধারা শেষ বয়সে এসে স্থায়ী আবাস পেয়ে অনুপ্রাণিত হবেন।’