সুখেন্দু সেন (কলকাতা পর্ব ২)
একদিকে আমহার্স্ট স্ট্রিট অপরদিকে কলেজ স্ট্রিট। আরেক দিকে বউবাজার স্ট্রিট, অন্যদিকে মির্জাপুর স্ট্রিট। মধ্য কলকাতার এমন এক জায়গায় ঠাসাঠাসি করে আছে অসংখ্য অলিগলি। এর একটি গলি কানাই ধর লেনের ৫/১ বাড়িটি জেঠতুতো দিদির। আমাদের প্রজন্মের সবার বড়। ঠানদি বলে ডাকে সবাই। অন্যদিকে আমি কনিষ্ঠ বিধায় বয়সের ব্যবধান অনেক। দু’তিনটে ভাগনে-ভাগনিও আমার বড়। মায়া মমতা সরলতায় জেষ্ঠমার দ্বিতীয় সংস্করণ। কলকাতার লোকজন সম্পর্কে অনেকের ধারণা, আত্মীয় বিমুখ ওরা। সবাই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। বড় অর্ন্তমুখী। এবারের এই দুর্যোগে আত্মীয় স্বজনদের নাকি স্বীকারই করেনি কেউ কেউ। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, না চেনার ভান করেছে। অনেক ভগ্ন হৃদয় এমন বেদনাময় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নিয়েছে। হতাশা আর অপমান সহ্য করে বাধ্য হয়েই দূরে সরে গেছে। এমন ঘটনা যে কোন কোন ক্ষেত্রে ঘটেনি, তা নয়। কথা গুলিও হয়তো অনেকাংশে সত্য। তবে এই অর্ন্তমুখীতায় একতরফা দোষ দেওয়া যায় না তাদের। এরাও এক সময় ছিন্নমূল হয়ে এসেছিল। এখন হয়তো উদ্বাস্তু নাম ঘুচে গেছে। কিন্তু প্রথম দিককার সেই উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। সে ক্ষত রয়ে গেছে এখনো।
দেশে যাদের বাড়ি-ঘর, পুকুর, বাগান, ক্ষেত-জমি ছিল তাদের অনেকেই এখানে এসে ভাগ্য বিড়ম্বনায় শিয়ালদহের প্লাটফর্মে, ফুটপাতে ঠাঁই নিয়েছিল। আশ্রয় বলতে সেখানেই ভলান্টিয়ারের নির্দিষ্ট করে দেওয়া এক চিলতে জায়গা। পাউডার গোলা দুধের জন্য, বাড়তি একটু চালের জন্য, চিহ্নিত পরিসর আধহাত বাড়ানোর জন্য শিক্ষিত, মার্জিত, মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষেরা কেমন হন্যে হয়ে উঠেছিল তখন। রোগে মেলেনি চিকিৎসা, পায়নি সেবা, এমনকি মমতা মাখা কোন সান্তনার কথা শোনাতেও এগিয়ে আসেনি কেউ। দেশ বিভাগের স্বাধীনতা মানুষকে রাতারাতি কেমন অসহায় করে তুলেছিল। অনেক ক্ষেত্রে অমানুষও। সামাজিকতা, আত্মীয়তা, আন্তরিকতা প্রদর্শনের জন্য কে কোথায় কখন আর সুযোগ পেল। নি:সঙ্গ সারথীর মতো কেবল জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। সময় আর পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছে আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর হতে।
আমাদের পরিবারের যারা পঞ্চাশের দশকে জন্মভূমি ছেড়ে, মা-বাবার ¯েœহ-মমতা বঞ্চিত হয়ে, পারিবারিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরের কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলেন, তারা এসেছিলেন এই ঠানদিকে কেন্দ্র করেই। ভগ্নিপতি মহেন্দ্র লাল সেন এসেছিলেন আরো আগে। নোয়াখালির দাঙ্গা তাড়িত হয়ে। কিছু শিক্ষা-দীক্ষা থাকায় কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভাগ্যগুণে করণিকের একটি চাকুরী জুটে গিয়েছিল। আর তাতেই কানাই ধর লেনের ছোট্ট বাড়িটি আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। উদ্বাস্তু হয়ে আসা দাদাদের প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তির পেছনে ঠানদির শুধু বড় বোনের দায়িত্ব পালন নয়, মায়ের মমতাও ক্রীয়াশীল ছিল। এর প্রমাণ পেলাম দুই ভাই বোন একাত্তরে শরণার্থী হয়ে এসে। আশ্রয় কেন্দ্রের সে দরজাটি খোলা কুড়ি বছর পরেও। ভগ্নিপতিও ছিলেন সহজ-সরল আর উদার মনের মানুষ। দীর্ঘদিন কলকাতা বাসের পরও কলকাতার ভাষা আর জটিলতা আয়ত্ব করতে পারেননি দু’জনের কেউই। আয় রোজগার ভালোই ছিল। ছ’সাত জনের পরিবারে আরো সচ্ছলতা-সাচ্ছন্দ আসতো যদি বড় ভাগ্নেটি সময় মতো একটি চাকুরী-বাকুরী জুটিয়ে নিতে পারতো। কলকাতার চাকরীর বাজারে আক্রা। সারা রাজ্যের কর্মহীনেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কলকাতায়। ঘরে ঘরে বেকার। মহার্ঘ্য চাকুরীর নাগাল পাওয়া থেকে বিপ্লবী হওয়া অনেক সহজ। তাই ঘরে ঘরে নকশাল। পাইপগান, পেটো (বোমা), নিয়ে ছুটাছুটি না করলেও পুলিশের খাতায় নাম উঠে গেছে বড় ভাগ্নে দীপালের। কখন সিআরপি’র ঘেরাওয়ে বেঘোরে প্রাণ যায় সে ভয়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় আসামে। অর্থাৎ করিমগঞ্জের নিলাম বাজারে। যেখানে জড়ো হয়ে আছেন শরণার্থী হয়ে আসা আমাদের পরিবারের আরো কয়েকজন।
মাও সেতুং মার্কসবাদের কি এক নতুন ব্যাখ্যা দিলেন আর তাতেই শুরু হয়ে গেল মারামারি খুনোখুনি। চারু মজুমদার, সৌরেন বসু, কানু স্যান্নাল, আজিজুল হক, জঙ্গল সাঁওতাল, অসীম চ্যাটার্জীরা দল ছেড়ে খতমের লাইন ধরে নতুন পার্টি গড়লেন। নকশালবাড়ি থেকে শ্রেণী শত্রু খতমের সূত্রপাত হলেও হুড়মুড় করে ছড়িয়ে পড়লো পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ডমেডেলিস্ট থেকে শুরু করে পাড়ার রকবাজ, রাতারাতি বিপ্লবী বনে গেল। সারাদিন রকে বসে যারা আড্ডা দিত, মেয়েদের দেখে সিটি মারতো, তারা এখন দেয়াল লেখেÑ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।’ ছাপ মারে মাও সেতুং এর মুখাকৃতির। আরো সক্রিয় যারা, যেখানে সেখানে ধুমধাম পেটো ঝাড়ছে, পাইপগান নিয়ে ছোটাছুটি, পুলিশের সাথে যুদ্ধ। আগুন খেকো বিপ্লবীদের প্রাণ নেয়া আর প্রাণ দেয়ার এ এক মহোৎসব। ক’দিন আগে একই দলে ছিল আজ তাদেরও খুন করতে হবে। ওরা যে শোধনবাদী। কংগ্রেস তো বর্জুয়াদল। প্রতিদিন খুন হচ্ছে সিপিএম, কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতারা। নিজেরাও মরছে পুলিশের গুলিতে, জেল থেকে, প্রিজন ভ্যান থেকে পালাতে গিয়ে, নিজের বোমায় নিজেই, আবার লাইনচ্যুতি বা পার্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে। চীনা সংযোগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ওরা বৈরী। অনেক জায়গায় নকশালপন্থীরা শরণার্থীদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠে। কলকাতার দেয়ালে লেখা হয়Ñ‘দুই কুকুরের লড়াইয়ে পূর্ব পাকিস্তানবাসীরা বিভ্রান্ত হবেন না, ইন্দিরা-ইয়াহিয়া শ্রেণীগত তফাত নাই, দুই বোতলে একই মদ’ ইত্যাদি।
প্রায় একই সময়ে আমাদের দেশের অনেক স্থানেও নকশালবাড়ির আগুনের আঁচ লেগেছিল। তবে বিপ্লবী আবেগের তাপ চাপা পড়ে গিয়েছিল ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে, সত্তরের নির্বাচনে, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের ডামাডোলে। নির্বাচনের আগে সুনামগঞ্জ মাতৃমঙ্গলের দেয়ালে একটি লেখা চোখে পড়তোÑ‘বন্দুকের নল সকল ক্ষমতার উৎস।’ এইচএমপি স্কুল, বুলচান্দ স্কুলের দেয়ালেÑ‘নকশাল বাড়ির লাল আগুন পূর্ব বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দাও, চেয়ারম্যান মাও লাল সালাম’ এ ধরনের লেখা দেখা যেতো। চীনপন্থী ন্যাপ কিছুটা বিপ্লবী ভাবাদর্শে ভোটের আগে ভাত চাই বলে সত্তরের নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছিল। দলীয় প্রধান মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করে শরণার্থী হয়ে ভারতে অবস্থান করলেও তার দলের সম্পাদক পাকিস্তানীদের পক্ষে। চীনপন্থী কমিউনিস্টদের অনেক গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই হিসাবে আখ্যায়িত করে কখনো পাঞ্জাবীর বিরুদ্ধে আবার কখনো মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। কেউ কেউ পাকসেনাদের গণহত্যা, নারী নির্যাতন সমর্থন করে তাদের সহযোগি হয়ে উঠে। রাশেদ খান মেননেরা চীনপন্থী হিসাবে পরিচিত হলেও কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি নামে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। এদের সহযোগিতা নেয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনীহা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের প্রধান এবং প্রভাবশালী বিরোধী দল সিপিএম’র আশ্রয় প্রশয় পেয়েছে তারা।
বিশাল শহর কলকাতা। এপাড় বাংলা ওপাড় বাংলার মানুষে একাকার হয়ে আছে। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। সবাই যে যার মতো ছুটছে। এর মাঝে আমি এক অকিঞ্চিতকর, ইতস্তত ঘোরাঘুরি ছাড়া এখন কোন কাজ নেই। সকাল বেলা আলু মটরের ঘুঘনি দিয়ে আস্ত একটা ফিরপো পাওরুটি আর চা খেয়ে বেড়িয়ে পড়ি। সকালের খাবারে পাউরুটির অবস্থান একধাপ উপরে। গ্রেট ইস্টার্ণ হোটেল প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের নিজস্ব কনফেকশনারীতে তৈরী সতেরো নয়া পয়সা দামের ফিরপো আরেকটু কুলীন। কিন্তু পাউরুটিতে তেমন অভ্যস্ত নই। আস্ত একটা খাওয়াও যায় না। ঠানদি জোর করে খাইয়ে দেন। ধমক দিয়ে বলেন,‘দুধ সর ঘি আর গন্ডা গন্ডা মাছ ভাজা এখানে পাইবি না। আমরা যা খাই পেট ভরে তা’ই খাইতে হইবো। ট ুটু কইরা তো ঘুরবি, ক্ষুধা লাগলে তখন কি করবি।’
কলকাতার কাটখোট্টা কেন্দ্রস্থলে একেবারে গ্রামীণ সরলতা আর মমতা মাখানো এমন বকুনি শুধু পেট ভরিয়ে দেয় না, মনও ভরিয়ে দেয়। আশ্রিতের হীনমন্যতা তখন আর থাকে না। মরমী এক অধিকার আপনা থেকেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে নেয়।
কথাবার্তায় বাঙাল টান আর উচ্চারণ মুখে মুখে বয়ে নিয়ে চলছে পূর্ববঙ্গাগত প্রায় সকলেই। সিলেটি টান আরো বেশি প্রবল। সহজে পিছু ছাড়ে না। জন্মমাটির দীর্ঘ বিচ্ছেদ জন্ম ভাষা অনেকটা ভুলিয়ে দিয়েছে। সিলেটি ভাষা এখন আর ঠিক মতো বলা যায় না। আবার কলকতার ভাষাও রপ্ত হয় না। দুয়ে মিলে জগাখিচুড়ি ভাষার সৃষ্টি। ঠানদি’র কথাবার্তা নিয়ে ভাগ্নে ভাগ্নিরা আগে থেকেই হাসাহাসি করতো। আমরা দু’জন এসে যোগ দেয়ায় তার আরো বিস্তৃতি ঘটলো। ঘটি বাঙাল সনাক্তকরণে ভাষাটাই প্রথম চিহ্ন। শরণার্থীর বেলাতেও তাই। কথাবার্তা শোনে ধরে নেয়া যায়, জয় বাংলার লোক। তবে নাক সিঁটকিয়ে এখন আর কেউ বাঙাল বলে না। বরং কিছুটা সমীহ আর বিস্ময় ভরে তাকায়। দেখে ইতিহাস সৃষ্টি করা জয় বাংলার শরণার্থীদের। যারা লড়ছে জীবনের জন্য, স্বাধীনতার জন্য। শুধু রণাঙ্গণেই নয়, সামাজিক সাংস্কৃতিক সেক্টরে, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্ব রাজনীতিতে তুলেছে অভূতপূর্ব আলোড়ন। ওরা অত্যাচারিত হয়ে নিঃশেষিত হয়েও ভেঙে পড়ে না। ওরা স্বাধীনতা চায় জীবনের বিনিময়ে। তারা চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে পৃথিবীর জঘন্যতম ঘটনাবলী। আদিম নিষ্ঠুরতার বলি হয়েছে। দেহ মনে ধারণ করে রেখেছে সে ক্ষত। নিজের ঘর-সংসার পুড়ে যেতে দেখেছে। দেখেছে স্বজনের মৃত্যু। সহায় সম্পদ হারিয়ে রিক্ত নিঃস্ব হয়ে, রোগ, শোক, ক্ষুধা, মৃত্যুর সাথে মাখামাখি করে বসবাস হলেও মনের গহীনে ধারণ করে রাখা স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা আর চোখে মুখে দেশপ্রেমের দীপ্ত প্রকাশ শরণার্থীদের শুধু আশ্রিতের করুণা নয়, অন্য এক মর্যাদায়ও অধিষ্ঠিত করেছে।
দু’চারদিনের চর্চায় অলিগলির গোলক ধাঁধা পেরিয়ে কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার স্ট্রিট, মহাত্মা গান্ধী রোডে ঘোরাঘুরি করে আবার নিরাপদে ফিরে আসা রপ্ত করে নিয়েছি। গলির মুখে আমহার্স্ট স্ট্রিট, শ্রদ্ধানন্দ পার্ক। কলেজ স্ট্রিটের একপাশ জুড়ে মেডিকেল কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজের বিশাল ক্যাম্পাস। আরেক পাশে কলেজ স্কয়ার, বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিট। কলেজ স্কয়ারের সুইমিং পুলের চারধারে বসার জন্য লোহার তৈরি হেলান বেঞ্চ পাতা। এর পাশাপাশি কয়েকজন মনীষীর মুন্ডুবিহীন প্রস্তুর মূর্তির উৎকট অবস্থান। রাজা রাম মোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, আশুতোষ মুখার্জী এরা সব বর্জুয়া। খতমের তত্বে এদের গলা সর্বাগ্রে কর্তনযোগ্য। কিন্তু সবাই তো গত হয়েছেন অনেক আগেই। তাতে কি? মুন্ডুপাত হলো সকল স্ট্যাচুর। সরকারী ট্রাম বাসের গায়ে লিখে লিখে জানানো হচ্ছে আকুল আবেদনÑ‘নিজে বাঁচুন, অপরকে বাঁচতে দিন। হিং¯্রতা বর্জন করুন।’ বোমার শব্দ মিলিয়ে গেলে ভয়টা কেটে যায়। কিন্তু চারদিকে এমন খোলামেলা হিং¯্রতা বর্জনের আহবান, অপরকে বাঁচতে দেয়ার আবেদন, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার পরামর্শ এসব দেখে একটা স্থায়ী আতংক মনে বাসা বেঁধে ফেলে। কে আর পাত্তা দেয় এই আবেদন নিবেদনে। দৈনিক সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে যেমন থাকছে, বাংলাদেশে পাক বাহিনীর নৃশংসতা, শরণার্থীর ঢল, আশ্রয় শিবিরের দুর্ভোগ, রণাঙ্গণে মুক্তি বাহিনীর সাফল্যের খবর, পাশাপাশি তেমনি পশ্চিমবঙ্গের খুনোখুনি, নকশাল ধৃত, বন্দি ছিনতাই এমন খবরও আছে। বোমা ফাটানোর বিরাম নেই। আছে পাইপ গানের ঠুসঠাস আওয়াজ। মাঝেমাঝে পাড়া রেইড হলে সিআরপি’র কালো ভ্যান বোঝাই করে চালান হয়ে যায় ছাত্র-তরুণ-যুবক। কেউ ছাড়া পায়, কেউ জেলে পঁচে। কারো ভাগ্যে আরো খারাপ কিছু ঘটে যায়।
প্রেসিডেন্সি কলেজ বিপ্লবীদের শক্ত ঘাঁটি এমন কথা শোনা যায়। বড়বড় ডিগ্রিধারী জ্ঞানী-গুণি অধ্যাপক, ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মেধাবী ছাত্রছাত্রী বিপ্লবের তত্ত্ব ঝাড়ছে, খতমের লাইন বাতলে দিচ্ছে, কলেজ ল্যাবরেটরিকে অস্ত্রাগার বানিয়ে রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যাওয়া আসা করলেও এখনো সে মুখী হইনি। একটানা ঘোরাঘুরির পর ক্লান্তি নিরসনে কলেজ স্কয়ারের পাতানো বেঞ্চই উপযুক্ত স্থান। কিন্তু পাশের মস্তকবিহীন মূর্তিগুলি আমার কাছে কেমন অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠে।
রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষ বসুর কীর্তিগাঁথা ধারণ করেই ’৪৭ পরবর্তী কলকাতার ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত বাঙালি মানস গর্ববোধ করেছে, তৃপ্ত থেকেছে। পাশ্ববর্তী পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামকে সময়োচিত সমর্থন করে এগিয়ে আসা, হাত বাড়িয়ে দেয়া, হৃদয় পেতে দেয়ার মতো উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে, কলকাতা সহ পুরো পশ্চিমবঙ্গবাসী। বাঙালির ইতিহাসের এমন ঝলসিত অধ্যায়ে ভিনদেশী হয়েও সরাসরি সম্পৃক্তির গৌরবময় এতো অর্জন কেমন যেনো ম্লান করে দেয় ব্যর্থ বিপ্লবের এই তীব্র দহন। হতাশাগ্রস্ত মধ্যবিত্ত মানস কখনো ক্ষোভে আর কখনো আত্মগ্লানিতে ভোগে অপকটে স্বীকার করে নেয়Ñ‘ওপার বাংলার ছেলেরা মায়ের ইজ্জত, বোনের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। দেশকে মুক্ত করার জন্য বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জয় বাংলা বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীরের মতো প্রাণ দিচ্ছে। আর এপাড় বাংলার ছেলেরা মাওয়ের তত্ত্বে মত্ত হয়ে বিপ্লব-বিপ্লøব বলে আত্মঘাতি হচ্ছে। মহৎ উদ্দেশ্যে প্রাণ দিতে বাঙালি কখনো দ্বিধা করেনি। শুধু শুধু ব্যর্থ মৃত্যু এতো সব সুন্দর জীবন অকালে ঝরে পড়লো। এতে কি, রাজ্যে উদ্ধার হলো, না দেশ উদ্ধার পেল? বাঙালির কোন উপকারটা হলো। (অসমাপ্ত)


