বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমাদের দেশে যাওয়ার সময় চলে এসেছে। ছোট খাটো কেনা কাটা করতে হবে। ফোন করলাম আমাদের ছোট ভাই রিন্টু লাল দাসকে। রিন্টুর বাড়ি দোয়ারাবাজার উপজেলার মংলারগাও গ্রামে। ডি,ভি লটারি পেয়ে আমেরিকা এসেছিল। নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশী সমাজে খুবই পরিচিত মুখ রিন্টু। সবাই এক নামে চেনেন। খুবই পরোপকারি ও বন্ধুবাৎসল হিসাবে তার সুনাম আছে। আমেরিকাতে যুব লীগ রাজনিতীর সাথে জড়িত। রিন্টু নিউ ইয়র্কে টেক্সি চালায়। এখানে দুই ধরনের টেক্সি আছে। কেউ কেউ হলুদ টেক্সি চালান আবার কেউ চালান হোবার নামক টেক্সি। হোবারের সেবা এখন ঢাকাতেও চলে এসেছে। রিন্টু হোবার চালায়। তার হোবারে করে আমরা জ্যাকসন হাইটসে গিয়ে কিছু কেনা কাটা করলাম। আজ ইফতার করতে হবে মাহমুদুল চৌধুরীর বাসায়। মাহমুদুল ও মাসুদুল দুই ভাই পরিবার পরিজন নিয়ে থাকে নিউ ইয়র্কে। সুনামগঞ্জ শহরে হাসননগরে তাদের বাসা। সমাজকর্মী ও পরিচিত মুখ এনামুল হক চৌধুরীর ভাই মাহমুদুল ও মাসুদুল। মাহমুদুলের স্ত্রীর বাড়ি মৌলভীবাজার। আমার এক বোন বিয়ে হয়েছে মৌলভীবাজারে। তাদের আত্মীয় হন মাহমুদুলের স্ত্রী। তাছাড়া আমার স্ত্রী মুনমুনের বাড়ি মৌলভীবাজার থাকায় ইফতার পার্টিটা মৌলভীবাজার সমিতির ইফতার পার্টিতে পরিনত গিয়েছিল।
পরদিন ইফতারের দাওয়াত পেয়েছি দুই জায়গা থেকে। একটা ছিল ব্রংকস থেকে। ব্রংকস এলাকায় সুনামগঞ্জের অনেক লোকজন থাকেন। তারা এই ইফতার পার্টির আয়োজন করেছেন। এদের একজন দিরাই থানার তোফায়েল চৌধুরী। আমি তার পূর্ব পরিচিত থাকায় আমাকে ফোনে দাওয়াত করেছিলেন। তোফায়েল চৌধুরী বললেন সুনামগঞ্জ সমিতি নামে তাদের আরেকটি সংগঠন আছে। এই সংগঠনটির উদ্দোগে এই ইফতার পার্টি। এখানেও দ্বিধাবিভক্তিতে আমি কস্ট পেয়েছি। সুনামগঞ্জের সবাই মিলে একটা সংগঠন হলেই ভাল হত। জানতে পারলাম তাদের ইফতার পার্টিটা হবে ব্রংকস এলাকার একটি মসজিদে। তোফায়েল ভাই আমাকে বলেছিলেন সুনামগঞ্জের পিংকু আমাকে নিয়ে আসবে। রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু দেশে থাকতে প্রথম জীবনে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিল। পরে আইন পেশায় আসে। সাংবাদিক থাকা অবস্থায় দৈনিক সংবাদে কাকন বিবির উপর একটা ফিচার করে। এই ফিচারটাই কাকন বিবিকে সারা বাংলাদেশে পরিচয় করিয়ে দেয়। নারী প্রগতি সংঘ নামে একটি সংগঠন কাকন বিবিকে ঢাকাতে নিয়ে সম্বর্ধনা দেয়। তাছাড়া পিংকু সুনামগঞ্জের সাংবাদিকতা ও সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটো বই লিখেছে। পিংকু নিউ ইয়র্কে ইয়েলো ক্যাব চালায়। সে আমার সাথে ফোনে আলাপ করে ঠিকই হোটেলে এসেছিল। আমার সাথে স্ত্রী ও মেয়ে আছে। মসজিদে সবাইর সাথে তারা ইফতার করতে পারবেন কিনা তাই এই ইফতার পার্টিতে যাওয়া বাদ দিলাম। গেলে হয়ত আরো সুনামগঞ্জের লোকজনের সাথে দেখা হত। জ্যকসন হাইটসে ছিল যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইফতার পার্টি। মুকিত চৌধুরী দাওয়াত করেছিলেন। সেখানেই ইফতার করলাম। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পরিচয় হল।
আগামিকাল আমাদের বাংলাদেশ যাওয়ার দিনক্ষন আগেই ঠিক করা আছে। আমাদের ফ্লাইট নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে ছাড়বে রাত ১০ টায় কিন্তু আমাদের তিন ঘন্টা আগে পৌছতে হবে। হোটেলের চেক আউটের সময় সকাল ১১ টায়। এর পরে হোটেলে থাকলে ১৭৫ ডলার গুনতে হবে। আগে থেকেই রিন্টুকে বলেছিলাম আমরা সকালে তোমাদের বাসায় চলে আসব। রিন্টু আমাদেরকে সে সুযোগ দেয়নি। সকালে সে তার গাড়ী নিয়ে হোটেলে উপস্থিত। হোটেল থেকে নিজেই লাগেজগুলো নামিয়ে গাড়ীতে তুলে নেয়। রিন্টু একটা এপার্টমেন্টে থাকে । সুবর্না নামে মন ও মননে সুন্দর মেয়েটি তার জীবন সাথী। বিয়ে করেছে বছর দুয়েক হবে। নুতন মেহমান আসবেন তাদের। তারা আবার শ্রী শ্রী অনুকুল ঠাকুরের অনুসারী। আমরা জানতে চেয়েছিলাম নুতন মেহমানের লিঙ্গ জেনেছে কিনা। সেটা নাকি তাদের ঠাকুরের নিষেধ আছে তাই এই রকম পরীক্ষায় সুবর্ণা যায়নি। এই অবস্থা নিয়ে সুবর্ণা আমাদের যেভাবে আতিথেয়তা করল তাতে আমরা অভিভুত। রিন্টুর বাসায় থাকতে থাকতেই ফোন পেলাম ইরফান উল্লাহ সিকদারের। ইরফানের বাড়ি নারায়নগঞ্জ।
১৯৭১ সালে তার বাবা সিলেটে একটা চা বাগানের ম্যানেজার ছিলেন । বঙ্গবন্ধুর একজন একনিষ্ট সহযোদ্ধা থাকায় ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারনা করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাদের পুরো পরিবার ডাউকি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ইরফান ও ইকরাম দুই ভাই ইকো ওয়ান থেকে প্রথম ব্যাচে ট্রেনিং করে সেলা সাব সেক্টরে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। সেই থেকেই এই দুই ভাইর সাথে আমার বন্ধুত্ব। বড় ভাই ইকরাম এখন বেলজিয়ামে থাকে। ১৯৯৬ সালে আমি বেলজিয়ামে গেলে তার আতিথেয়তা নিয়েছিলাম। ইরফান ওপি-১ লটারিতে আমেরিকা আসে আশির দশকে। ছেলেরা উচ্চ শিক্ষিত হয়েছে। বড় ছেলে ওনকোলজির ডাক্তার আর ছোট ছেলে এ্যাটর্নি হিসাবে প্রেকটিস করছে। ইরফান আমাদের জন্য অনেকগুলো উপহার নিয়ে আসল। আমার জন্য শার্ট, আমার মেয়ে স্ত্রীর জন্য বিভিন্ন প্রকার কসমেটিকস, দামি পারফিউম। ইরফানের সাথে গল্পে শুধুই মুক্তিযুদ্ধ। সেই বাংলাবাজার, লক্ষীপুর, টেংরাটিলা, বাঁশতলা ইত্যাদি। নষ্টালজিয়ায় ইরফান। আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল বাঁশতলা, বাংলাবাজার, লক্ষীপুরের কথা। এখন কি ঐ এলাকা একই রকম আছে। কর্ণেল হেলাল, কর্ণেল রউফ, শহীদ চৌধুরী, সাধন ভদ্র, উজির মিয়া , মোস্তাফিজ বিল্লাহ, সবার কথা তার মনে আছে। এদের অনেকেই এখন পরপারে চলে গেছেন। তার পরেও এই সহযোদ্ধাদের পরিবার, ছেলে , মেয়ে সবার খোঁজ নিচ্ছিল। ইরফান একাই বলে যাচ্ছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ট জায়গায় থেকেও তার মনে হয় জীবনের শ্রেষ্ট সময় কাটিয়েছে একাত্তরে। আমি যখন জানতে চাইছিলাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিখিয়েছ কিনা। বলল তালিকায় তাদের দুই ভাইর নামই নেই। এখানকার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ (যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদ) তাদেরকে আর স্বীকৃতি দেননা। কোন অনুষ্টানে ডাকেননা। মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য নাম লেখাতে হবে সেটাও তারা জানতেননা। এভাবেই হয়তো একদিন ইতিহাস বদলে যাবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তালিকাতে নাম না লেখানোর কারণে হারিয়ে যাবেন ইতিহাস থেকে। রিন্টুর বাসায় ইরফানের সাথে গল্প করতে করতে এক সময় আমাদের এয়ারপোর্ট যাওয়ার সময় চলে আসল। ইরফানকে বিদায় দিয়ে আমরা প্রস্ততি নিচ্ছি। সুবর্ণা এই শরীর নিয়ে এত রান্না বান্না করেছে। তার আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ। সুবর্ণা আর রিন্টু আমাদের জন্য অনেক উপহার নিয়ে এসেছে।
দীর্ঘ দেড় মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমনের পর ১৪ জুন রাত দশটায় নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের ফ্লাইট নির্ধারিত আছে। রিন্টু তার হোবার টেক্সি দিয়ে আমাদেরকে এয়ারপোর্টে নিয়ে আসল। রিন্টুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ইমিগ্রেশনের দিকে এগিয়ে গেলাম। অনেক ঘোরাঘোরি অনেক স্মৃতি নিয়ে আজ আমরা আমেরিকা ছেড়ে যাচ্ছি। আমাদের ফ্লাইট যাবে লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে। সেখানে আমাদের এক ঘন্টা যাত্রা বিরতি। তার পরে কুয়েত আর সেখান থেকেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের রাজধানি ঢাকা। আমাদের ফ্লাইটটি কুয়েত পর্যন্ত ঠিক ঠিক ভাবে আসলেও সেখান থেকে ঢাকা আসতে চার ঘন্টা লেইট। কুয়েত থেকে তাদের নির্ধারিত ফ্লাইটটি টেক-অফ করার সময় ঘটল যান্ত্রিক বিপত্তি। ভাগ্য ভাল এটা ছাড়ার পর কোন বিপত্তি ঘটলে কি হত জানিনা। এয়ারপোর্টেই কুয়েত এয়ারলাইন্সের বিমানের মধ্যেই আমাদের বসিয়ে রেখে তারা এয়ারক্রাফটি ঠিক করল। এতে সময় লাগল অনুমান ৪ ঘন্টা। বিমানে বসা অবস্থায় পাশের ছেলেটিকে আমার খুব পরিচিত মনে হল। কোথায় যেন দেখেছি ছেলেটাকে। আলাপে জানতে পারলাম সে ভারতীয়। কয়েকবার কোথায় দেখেছি বলায় বলল আপনি কি জি বাংলায় ইন্ডিয়া গট টেলেন্ট (India got talent) দেখেন ? আমি কান দিয়ে ৮২ কেজি আর চোখ দিয়ে ২২ কেজি ওজন তুলে (Guness book of world record) গিনেস বুক অব ওয়াল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছি। আমার মনে হল তাইতো এরকম একটা অনুষ্টান দেখেছিলাম। কুয়েত এয়ারলাইন্স সকালে এসে পৌছল ঢাকা বিমানবন্দরে। প্রান ভরে দেখছি আমার দেশ বাংলাদেশকে। আমি ফিরে আসলাম আমার মাতৃভূমিতে।
- ছাতকে ছিন্নমুল শীতার্ত মানুষের পাশে একঝাঁক যুবক
- ডলুরায় শুল্কস্টেশনের সাথে ইমিগ্রেশন পয়েন্ট স্থাপন করা হোক


