হাওরপাড়ে শুধুই শোকের মাতম বিদায় সেনবাবু-রাজনীতির অমর শিল্পী

থৈ থৈ পানির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটুকরো জনপদ দিরাই-আনোয়ারপুরের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে পুরো দেশ এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত যার বিশালতা স্পর্শ করেছিলো তিনি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। রাজনীতির এক অমর শিল্পী তিনি। কথার জাদুকর, কৌশলের ওস্তাদ, জ্ঞানের ভা-ার, পরিমিতিবোধের জীবন্ত উদাহরণ তিনি। ভাটির সহজাত বৈশিষ্ট্য স্বভাবে ধারণ করে উল্টো¯্রােতে নৌঁকা বেয়ে চলেছেন আজীবন। রাজনীতি-জীবনের সেই ঊষালগ্নে আওয়ামী লীগের নামে প্লাবন তৈরির সময়ে সর্বকনিষ্ট সদস্য হিসেবে ১৯৭০ এর নির্বাচনে ন্যাপপ্রার্থী হয়ে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এই হ্যামিলনের বংশীবাদক। সেই যে জনপ্রতিনিধিত্বের অভিষেক ঘটেছিলো জনতার আশীর্বাদে, মরণের সময়ও সেই জনপ্রতিনিধিত্বের জগতে মুকুটহীন স¤্রাট ছিলেন তিনি। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়ে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে রেখেছিলেন অনবদ্য ভূমিকা। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে স্বাধীন দেশকে মূর্ত-চিত্রে রূপায়িত করার অমর শিল্পী ছিলেন তিনি। এর পর আট আটবার জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় রেখেছেন ঐতিহাসিক অবদান। দেশের প্রতিটি সংকটে-ক্রান্তিকালে সিংহবিক্রমে সামনের কাতারে ছিলেন সাহসী এই বীরপুরুষ। ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এবং পরে নিজ জন্মস্থান দিরাইয়ে দুই দুইবার ঘাতকদের হিং¯্রতার শিকার হয়েছিলেন তিনি। শাল্লায় তার জনসমাবেশস্থলে পুঁতে রাখা হয়েছিল বোমা। ২০০৯ সনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান হয়ে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। সুরঞ্জিত এইভাবে নিজের জীবনের পুরোটি কাল দেশ ও মানুষের জন্য ব্যয় করে প্রকৃত অর্থে সার্বজনীন মাহাত্ম্যে উদ্ভাসিত হয়ে ছিলেন। এমন এক মহাপুরুষ হঠাৎই চলে গেলেন ৫ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টা ২৪ মিনিটে সকলকে কাঁদিয়ে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে। মহাপুরুষের মহাপ্রয়াণে অনিঃশ্বেষ শ্রদ্ধা আমাদের তাঁর অমর স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
রাজনৈতিক হিংসার শিকার হয়েছেন তিনি আজীবন। যে মাপের রাজনীতিক সেনগুপ্ত, যথার্থ মূল্যায়নও হয় নি তাঁর ক্ষেত্রে। ভাঙ্গা শামুকের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন বারে বারে। দল বদল করেছেন কিন্তু আদর্শ বদল করেন নি কখনও। দেশ মানুষ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আজীবন নিরাপোষ ছিলেন। সত্যকথনে ছিলো তাঁর দৃঢ়তা। অপ্রিয় সত্য বলে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন। আবার সংকটে সমাধানসূত্র দিয়ে জাতিকে রক্ষা করেছেন। মাত্রই ৭১ বছরের জীবৎকাল তাঁর (জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে জন্মতারিখ ৫ মে ১৯৪৫ উল্লেখ রয়েছে)। অনিরাময়যোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যু নিয়েও অসত্য ও প্রতিহিংসামূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে কয়েকবার। অবশেষে সকল প্রতিহিংসা সকল জাগতিক বিদ্বেষের উর্দ্ধে উঠে গেলেন তিনি। এখন কে তাঁর মৃত্যু নিয়ে অপপ্রচারে মেতে উঠবে?
তাঁর মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশ কেঁদে উঠেছে। রাজনৈতিক ভেদাভেদ এক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠে নি। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান-প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে সকল রাজনৈতিক নেতৃত্ব শোক প্রকাশ করে এই মহান রাজনীতিকের ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। সবকিছুকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগত চিন্তায় মূল্যায়নের সংস্কৃতির অবক্ষয়িত সময়ে এই বিষয়টিও অনন্য।
প্রশ্ন উঠা শুরু করেছে তাঁর অবর্তমানে দিরাই-শাল্লার রাজনীতির চাবি যাবে কার হাতে? এই মুহূর্তে এরকম চিন্তা খুবই অসংগত, তারপরেও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটবে না। সব শেষ কথা হলো এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। যিনিই শূন্যস্থানে জায়গা করে নিতে চাইবেন তাকে অবশ্যই এই আকাশস্পর্শী ব্যক্তিত্বকে ধারণ করেই অগ্রসর হতে হবে। রাজনীতির এই আকাশছুঁয়া অমর শিল্পীর প্রতি আবারও অশেষ শ্রদ্ধা।