৩৪ কোম্পানির ওষুধ উৎপাদনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের করা এক রিট আবেদনের উপর সোমবার বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি আতাউর রহমান খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশ দিয়েছেন। ২০ টি কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির এন্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলো গোপনে ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করছে কি-না সে তথ্যসহ কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিন মাস পর পর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এইসব কোম্পানির নি¤œমানের ঔষধ জনস্বাস্থ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছিলÑএমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবশেষে হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে নি¤œমানের ঔষধ উৎপাদন ও বিপণন বন্ধের বিষয়ে একটি আলোর দিশা পাওয়া গেল যা স্বস্তিদায়ক। অবশ্য হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন ও নির্দেশ যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে কি-না তা দেখভালের দায়িত্ব সরকারের। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করেন তাহলে জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণে এই রায়ের ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়বে। আমরা আশা করব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
যেহেতু ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো সীমিত তাই সারা দেশে বিপণন ঠেকানোর পরিবর্তে তারা যদি উৎপাদন পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেন তাহলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব বলে আমরা মনে করি। ঔষধ শিল্পে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। ফলে চাহিদার পচানব্বই শতাংশের যোগান এখন দেশীয় কোম্পানিগুলোই দিচ্ছে। উপরন্তু এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত ঔষধ ব্যাপকভাবে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পাশাপাশি নি¤œমানের ঔষধ উৎপাদন ও চিকিৎসক-ফার্মেসি ব্যবসায়ীদেরদের প্রভাবিত করে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ বিক্রির অশুভ প্রবণতাও বেড়ে গেছে উদ্বেগজনক হারে। নি¤œমানের ওষুধ সেবনের ফলে জীবন হানির মতো ঘটনাও ঘটে চলেছে আখছার।
কোম্পানিগুলো এখন বিপণন কৌশলের নামে যে ভয়ানক অনৈতিক প্রবণতায় লিপ্ত হয়েছে সেটি যেকোন দেশের স্বাস্থ্যকাঠামোকে ভেঙে ফেলতে পারঙ্গম। বাংলাদেশে দরিদ্র শ্রেণির লোকজন উচ্চমূল্যের চিকিৎসাসেবা নিতে ব্যর্থ হয়ে অথবা ঔষধের নামে বিষ খেয়ে নিজেদের জীবন ও স্বাস্থ্যকে প্রচ- ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। এছাড়া তথাকথিত অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষার নামে এখন টাকার শ্রাদ্ধ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে এক শ্রেণির চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানি ও বিভিন্ন ডায়গনস্টিক সেন্টারের সাথে কমিশন গ্রহণের সম্পর্কসূত্রে বাঁধা পড়ে মাত্রাহীনভাবে রোগীদের গলা কাটছেন। দেশের স্বনামখ্যাত চিকিৎসক প্রাণগোপাল দত্তের মতে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে এখন চিকিৎসা ব্যয় ৪০% বেড়ে গেছে। বাস্তব অবস্থা এর চাইতেও খারাপ। নি¤œমানের ঔষধ উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এই অনৈতিক বিপণন কৌশল ও হয়রাণিমূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধের বিষয়েও দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। দেশের ঔষধের বাজার যে ভয়ানক আগ্রাসী চরিত্র ধারণ করেছে তা আজ মানুষের জন্য মহা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে সরকার কিংবা জনসাধারণ নির্বিকার থাকতে পারেন না। হাইকোর্ট জনস্বার্থে যে আদেশ দিয়েছেন তার মর্ম উপলব্ধি করা উচিৎ সকলের। স্বৈরাচার অভিধায় ভূষিত এরশাদ সরকারের শাসনামলে একটি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করা হয়েছিলো যা চিকিৎসকদের বিরোধিতার কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি। গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে এখন এরকম একটি গণমুখী চিকিৎসানীতি প্রণয়নে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

