করিমের জন্মদিনেও কেক কাটতে হয়?

সুনামগঞ্জের লোকশিল্পী, যিনি বাউল স¤্রাট অভিধায় অভিষিক্ত বিশ্বব্যাপীÑ শাহ আব্দুল করিমের ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে এবার বড় কোন কর্মসূচী ছিল না কোথাও। তবে শিল্পীর জন্মস্থান উজানধলে তাঁর মাজারে কেক কেটেছেন পৌত্র-শিষ্যরা। সাধারণভাবে যে কারও জন্মবার্ষিকীতে কেক কাটার মতো পাশ্চাত্য প্রথাচরণটি স্বাভাবিক মনে করা হলেও শাহ আব্দুল করিমের জন্মদিনে এই আচরণটি বৈসাদৃশ্যপূর্ণ ঠেকেছে অনেকের কাছেই। যে শিল্পী জীবনভর দারিদ্রতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে স্বসংস্কৃতিকে লালন করেছেন অতিশয় যতেœ, যিনি এতদঞ্চলের লোক-সংস্কৃতিকে নিয়ে গেছেন অন্যরকম এক উচ্চতায়, যিনি সর্বদা ঘৃণা করে গেছেন অপসংস্কৃতি আর অপশাসনকে তাঁর জন্মদিনে কেক কাটার মতো অবাঙালি সংস্কৃতির তোষণ করাটা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক দীনতাকে প্রকটিত করে। এরকম অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহান এই গণশিল্পীকে অশ্রদ্ধাই করা হয় কেবল। বাউল ঘরাণা কিংবা গণসংস্কৃতির জায়গা যেখান থেকেই দেখুন না কেন এখানে কেক কাটার বিষয়টি কোনভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ হবে না।
গতবছর বাংলাদেশ ও ভারতে সাড়ম্বরে শাহ আব্দুল করিমের জন্ম শতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এর এক বছর পেরোতেই অনেকটা নিরবে চলে গেল তাঁর জন্মের একশত একতম বার্ষিকীটি। জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে এজন্য ছিলো না কোন আয়োজন। অথচ আমরা একুশে পদক দানের মধ্য দিয়ে এই শিল্পীকে জাতীয় সম্মান দিয়েছি। যাকে সম্মান দেয়া হলো তাঁর সম্মান রক্ষা করা না গেলে সম্মান দেখানোর বিষয়টি হয়ে উঠে কৃত্রিম ও নিছক দায়সারা গোছের। যে করিম সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ভাটির এই জনপদের সুনাম বাড়িয়েছেন তাঁকে সম্মান দেখানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোন উদ্যোগ থাকবে না এমনটি হতাশ্জানক। আমরা বলে থাকি সাংস্কৃতিক জাগরণের লক্ষ্যে নাকি আমাদের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। এই কি এর লক্ষণ? একটি জিনিস আমরা খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করছি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা নামে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের আয়োজন হয়ে আসলেও কেন জানি এগুলোর কোনটিই প্রাণে প্রাণে আলো ছড়াতে ব্যর্থ হয়। আমাদের কেবলই মনে হয় এগুলো সূর্যালোকে উদ্ভাসিত নয় বরং এগুলো কৃত্রিম আলোর ঝলমল রঙে রাঙানো থাকে। আমাদের মনে হয়- যতোটা না সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটানো এর উদ্দেশ্য ততোটাই নিয়ম রক্ষার তাগিদপ্রসূত এক ধরনের অনান্তরিক প্রয়াস। সম্ভবত এ কারণেই করিমের জন্মদিনটি চলে যায় একেবারেই অনাদরে, বিস্মরণের পথ ধরে।
সাংস্কৃতিক জাগরণের বিষয়টি আসলে শহরকেন্দ্রীক নয়। এটি মূলত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আচরণের বিষয়। শহরে মধ্যবিত্তসুলভ কিছু আয়োজনের অর্থ কোনভাবেই সাংস্কৃতিক জাগরণের সমার্থক নয়। এই বোধটি আসতে হবে সংস্কৃতি অঙ্গনের পৃষ্ঠপোষকদের। আজ গ্রামে গ্রামে বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের পরিবর্তে নানা ধরনের অপসংস্কৃতি ও অন্ধ বিশ্বাসের চর্চা বেড়ে চলেছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মানসিকতায় জাতিগত ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজিত গোষ্ঠীপ্রীতি শিকড় মেলছে। এমন এক অবস্থায় আমাদের সংস্কৃতিগত জায়গাটিকে সুসংহত ও দৃঢ় করার জন্য এই করিমসহ আমাদের ঐতিহ্য হাসন, রাধারমণ, শাহনূর, শীতালং প্রমুখ হতে পারতেন একএকটি জ্যোতিষ্ক। এইসব জ্যোতিষ্কের আলো নিতে আমরা ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি বলেই বাঙালি মননে উদারতা ও একতার বদলে আজ কেবলই আত্মকেন্দ্রীকতার বিস্তার।
সংস্কৃতির বিকাশের মধ্য দিয়ে জাতি গঠনের কথা যারা বলেন, তাদেরকে আজ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে অকৃত্রিম বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার দিকে মনোযোগী হতে হবে। এখানে হাছন-করিম-রাধারমণ সহ সকল আলোর উৎসগুলোকে আত্মস্থ করে তাঁদের দেখানো পথেই হাঁটতে হবে। তখন আর লোককবির জন্মদিনে কেক কাটার মেকি আচরণ দেখতে হবে না কাউকে।