আকবর হোসেন
গুড মনিং এর চেয়ে কোন অংশে শুভ সকাল শব্দটি অসুন্দর নয়. আমরা ইচ্ছে করেই বলি হাইস্কুল, কলেজ, ইউনির্ভাসিটি !! আমরা কি বলতে পারি না মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বলতে পারি না মহাবিদ্যালয়, বলতে পারি না বিশ্ববিদ্যালয়? আমরা অনেকেই নিজেকে আধুনিক হিসেবে সমাজে পরিচিতি লাভ করার জন্য বাংলা না বলে ইংরেজির চর্চা করি। ইয়েস, নো ভেরী গুড, থ্যাংক ইউ, সরি এমনসব ইংরেজি ছোট খাটো শব্দ যে কোন অনুষ্ঠানে আমরা অহরহ ব্যবহার করি। অথচ আমরা একবারও ভাবিনি আমাদের পূর্ব সুরীরা ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়েছেন।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর কেটে গেছে ছয়টি দশক। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা হয়েছে আমাদের রাষ্ট্রভাষা। একুশের পথ ধরেই আমরা একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, স্বাধীন হয়েছি। এখন ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ আর্ন্তজাতিক পরিসরেও উদযাপন হচ্ছে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।
ভাষার জন্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের গর্ব। আমাদের মতো খুব কম জাতিকেই তাদের মাতৃভাষার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য গৌরবের। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানিরা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। শাসকদের সব চক্রান্ত রুখে বাঙালি সেদিন আদায় করে নিয়েছিল নিজের অধিকার।
ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের অর্জন অনেক। দুঃখজনক হলো, পয়ষট্টি বছরেও সর্বস্তরে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা চালু হয়নি। বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার মুক্তি ঘটে সত্যি; তবে এখনও এ ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে না। হচ্ছে না বাংলা ভাষা নিয়ে যথাযথ গবেষণা। ভাষাসৈনিকদের যথাযথ মূল্যায়নও এদেশে হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মতো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও বিকৃত হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে একুশের প্রভাতফেরি সংস্কৃতি।
একুশের মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অর্জন হয়েছে। তবে প্রত্যাশিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন হয়নি। আন্দোলনের মূল প্রত্যাশা অনুযায়ী সর্বস্তরে বাংলা চালু হয়নি। কেন হয়নি- এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। কীভাবে চালু করা যায়, সেটাও তাদের জানা নেই। ভাষা শহীদ ও সৈনিকরা মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করেছেন, জীবন দিয়েছেন। তবে এ ভাষাকে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে চালু করার দায়িত্ব তাদের নয়। দায়িত্বটা তাদের, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। আমি মনে করি, সর্বস্তরে বাংলা চালু এবং একে নিয়ে গবেষণা না হলে আমাদের মাতৃভাষা এগোতে পারবে না।
একুশের একটি সংস্কৃতি হলো প্রভাত ফেরি। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ সকালে শিক্ষার্থীরা প্রভাতফেরি করে। এ সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। অনেকে বলতে পারেন, এটা ষাট বছর আগের ব্যাপার। সময়ের ব্যবধানে তো অনেক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বা রীতি বিলুপ্ত হয়। তাদের বক্তব্য আমি সঠিক বলেই মনে করি। এটাও সত্যি, প্রভাতফেরির জন্য দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ এবং সেরকম সুযোগ-সুবিধাও আজ আর নেই।
ভাষা আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের ছিল না। সেটা ছিল ছাত্রদের আন্দোলন। আজকের প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস ঠিকভাবে জানানো প্রয়োজন। প্রকৃত ইতিহাস রচনার মাধ্যমে বিকৃতি ও বিভ্রান্তির অবসান ঘটানো এখনই দরকার।
দেশের কিছু রাজনীতিবিদ আর কয়েকটি সংগঠনের নেতা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃত করছেন। তারা মনগড়া ইতিহাস উপস্থাপন করছেন বক্তব্য-ভাষণে। আন্দোলন সম্পর্কে নানা কৌশলে তারা যা বলছেন, এর অর্থ দাঁড়ায় ভাষা আন্দোলনের সাফল্য ও বিজয় তাদের নেতৃত্বেই হয়েছিল। নিজেকে বা নিজের দলের নেতাকে ‘ভাষাসৈনিক’ বলে দাবি করছেন, যা খুবই নিন্দনীয় ও দুঃখজনক।
আবদুল মতিন একজন ভাষাসৈনিক। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। তারই নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হয়। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’- কার্জন হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দেওয়া এ বক্তব্যের তিনি প্রথম প্রতিবাদকারী। তাৎক্ষণিকভাবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে তিনি বলেছিলেন, “নো, নো; ইট উইল বি নট।”
পরিশেষে আমি কয়েকটি প্রস্তাবনা রাখলাম পাঠকের উদ্দ্যেশ্যে – বিদেশী ভাষা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দাঁড়াতে হবে। আদালত ও রাষ্ট্রের দাফতরিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সকল জাতি গোষ্ঠীর মাতৃ ভাষার অধিকার সুরক্ষা করতে হবে। বাংলা ভাষার অশুদ্ধ ব্যবহার ও বিকৃত উচ্চারণ বন্ধ করতে হবে। সকল সাইনবোর্ড ও ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে।
লেখক-সভাপতি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, জামালগঞ্জ উপজেলা শাখা, সুনামগঞ্জ জেলা


