একটি কর্পোরেট হাউসের বদান্যতায় শাহ আব্দুল করিমের জন্মভিটা উজান ধলে দুই দিনের করিম লোক উৎসব গতকাল শেষ হয়েছে। কালজয়ী এই লোকশিল্পীকে একুশে পদকে ভূষিত করে জাতীয় সম্মাননা দেয়া হয়েছিলো। একুশে সম্মাননায় ভূষিত এই শিল্পীর স্মরণে এবার সরকারি উদ্যোগে ছিলো না কোন অনুষ্ঠানমালা। অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায়। জাতীয় সংস্কৃতির জন্য এ হলো হতাশাজনক অবস্থা। তাঁকে বাউল স¤্রাট অভিধা দেয়া হলেও শাহ আব্দুল করিমের সংগীতচর্চার একটি প্রধান ধারা ছিলো দেশ, জাতি ও মানুষকে ঘিরে। বিশেষ করে শোষণহীন সমতার সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও এই প্রত্যয়ে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি গানের বাণীতে। তিনি প্রগতিশীল ও কুসংস্কারমুক্ত মননের অধিকারী ছিলেন। গণসংস্কৃতির ইতিহাসে আমাদের ভাটির এই শিল্পীর নাম থাকবে উপরের সারিতেই। এহেন শিল্পী একটি জাতিকে দেশকে সমৃদ্ধ করেন প্রতিনিধিত্ব করেন। আজ আব্দুল করিমের গান গীত হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ সারা বিশ্ব্রে বাংলাভাষাভাষীদের মধ্যে। ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে তাঁর আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, বসন্ত বাতাসে সই গো, কুঞ্জ সাজাও গিয়া, বন্দে মায়া লাগাইছে, ঝিলমিল ঝিলমিল করেরে ময়ুরপঙ্খী নাও, গাড়ি চলে না চলে না…সহ অসংখ্য গান। এসব গান সারা বিশ্বব্যাপী গীত হয়ে সুনামগঞ্জ, বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত করছে। আর আমরা কত আশ্চর্য নির্লিপ্ততায় অবজ্ঞা করে চলেছি তাঁকে। এমন সমাজে গুণী ব্যক্তিদের বিকাশ ঘটবে কীভাবে?
শাহ আব্দুল করিমের জন্মের এক শ’ বছর পেরিয়েছে ২০১৬ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এবার তার জন্মের এক শ’ একতম বার্ষিকী। আর এই মহান গণশিল্পীর মৃত্যুর ৮ বছর পূর্ণ হবে সামনের ১২ সেপ্টেম্বর। তিনি পরাধীন বৃটিশ, বিকলাঙ্গ পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দ্রষ্টা। তিনি বিদেশি শাসন-শোষণের সাথে দেশীয় প্রভুদের লোভী চেহারা দেখেছেন। দেখেছেন সমাজের সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের দুঃখ দুর্দশা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এক মহান বিপ্লব তথা গণমানুষের রাজ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত এই সামাজিক শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটবে না। তিনি গেয়ে উঠলেন ‘মোদের কেউ নাই রে কৃষক মজুর ভাই/ হাড়কুটা পরিশ্রম করি খাইতে নাহি পাই/ সাম্রাজ্যবাদ পূঁজিবাদ সামন্তবাদ মিলে/ দেশের সম্পদ লুটে নিল তিন ডাকাতের দলে। তিনি একতারা বাজিয়ে সর্বহারাদের উজ্জীবিত করতে লাগলেন এই বলে যে, ‘আরে ও সর্বহারার দল/ভয় কিরে আর বন্দুক কামান/ একযুগে সব চল রে সর্বহারার দল’ কিংবা ‘মূলমন্ত্র সমাজতন্ত্র আসে যদি ভাই/ধনীদের চলে যাবে জীবনের কামাই’। কিন্তু বাস্তবতা হলো করিমের এই গণমুখী সৃষ্টিসম্ভারকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আজ লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। করিমকে এখন পরিচিত করা হচ্ছে ১০/১৫ টি জনপ্রিয় গানের মধ্য দিয়ে। এভাবে এক ¯্রষ্টার সৃষ্টিসম্ভারকে খ-িত কিংবা বিভাজিত করে অল্প কয়েকটি গানের আধিকারিকরূপে প্রচারের উদ্দেশ্য হলো মানুষ যাতে নিজের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এগিয়ে আসতে না পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কী চাইল বা না চাইল সমাজ তার তোয়াক্কা করে না। ঠিকই করিমের উদ্দীপক গানগুলো সমাজ সচেতনতা বাড়াতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখছে, রাখবেও।
সংস্কৃতি জগতের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি আমাদের আহ্বান, করিমকে আড়াল করে নয় তাঁকে অবলম্বন করে দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে প্রয়াসী হোন। সমাজের অন্তর্গত যে শক্তি সমাজ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেন তাদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, করিমের গণমুখী সঙ্গীতসম্ভারকে ছড়িয়ে দিন প্রাণে প্রাণে। সহজ সরল ভাষায় রচিত এইসব গণসঙ্গীত মানুষকে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও শাণিত করবে।

