ছাতক প্রতিনিধি
ছাতকে সুন্নী-কওমী অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে জোড়া খুনের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলায় সিংহভাগ আসামী করা হয়েছে আওয়ামীলীগ-বিএনপিসহ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের। মামলায় সুন্নী-কওমী অনুসারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাউকে আসামী করা হয়নি। ফলে পুরো বিষয়টিই উদুর পিন্ডি বুধুর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার মতোই মনে করছেন সচেতন মহল। পাল্টাপাল্টি মামলায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আসামী করায় শহর জুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের মাধ্যমে ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন অনেকে। আবার অনেকেই বলছেন ঘটনার সাথে উভয় মামলার আসামীদের বড়ই অমিল রয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাউয়াবাজারে ফুলতলী অনুসারীদের টানানো একটি ব্যানার কওমী অনুসারীরা নামিয়ে ফেলার ঘটনায় ছাতক হাইস্কুল মাঠে খাদিমুল ইসলাম আয়োজিত তিনদিন ব্যাপী কওমীদের ওয়াজ মাহফিলে বাধা হয়ে দাঁড়ান সুন্নী অনুসারীরা। এ ঘটনার জের ধরে ২৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী তুমুল সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সুন্নী-কওমী
অনুসারীরা। সংঘর্ষে দুই ব্যক্তি নিহত ও পুলিশ, পথচারী, শিক্ষার্থীসহ উভয় পক্ষের অন্তত দেড় শতাধিক লোক আহত হয়। দফায়-দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় যখন গোটা শহর পরিণত হয় রণক্ষেত্রে, তখন সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ারসেল ও শর্টগানের গুলি ছুঁড়েও নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। শুরু থেকে চেষ্টা করে বিকেল ৪টার দিকে পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আব্দুল বাছিত বাবুল ও পথচারী রুবেল মিয়া। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর-লুটপাট, ফুটপাতের দোকান তছনছ ও মালামাল লুটসহ শহরের প্রায় কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয় সংঘর্ষের কারণে। উপর্যুপরি মধ্যস্থতাকারী ও অনুপস্থিত অনেককেই করা হয়েছে পাল্ট-পাল্টি হত্যা মামলায় আসামী। সুন্নী পক্ষের নিহত আব্দুল বাছিত বাবুলের বড় ভাই হাজী কবির মিয়া বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উলেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো ১৫-২০জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা(নং-০২) দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হলেন আ.লীগের দুলু মিয়া, হাজী জামিল আহমদ, ফরিছ মিয়া মেম্বার, আক্তার মিয়া, দিলোয়ার হোসেন, বিএনপির আনোয়ার পাশা, খেলোয়ার টুটুল, ইসলামপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জামাত নেতা এড. সুফী আলম সুহেলসহ কামাল মিয়া, আক্তার মিয়া-২ ও আব্দুলাহ। কওমী পক্ষের নিহত রুবেল মিয়ার ভাই আহমদ আলী বাদী হয়ে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে পাল্টা হত্যা মামলা(নং-০৯) দায়ের করেন। মামলায় পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন সুমেনকে প্রধান আসামী করা হয়। মামলার অন্যান্য আসামীরা হল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াদ চৌধুরী, পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান মাহমুদ সানি, আ.লীগের আবুল হায়াত, ছাব্বির আহমদ, আব্দুল মমিন, স্বপন চৌধুরী, মাহবুব, আশরাফ, সহিদুল ইসলাম, রাশেদ, সানি, শ্রমিকলীগ নেতা সুমন খান, ইমন খান, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক হিফজুল বারী শিমুল, উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল ইসলাম পাবেল, যুবদল নেতা খোকন, ছাত্রদল নেতা কানন, কার্জন. রাহেল. সাহেদসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৭০-৮০ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করা হয়।
উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ফারুক আহমদ বলেন, ইসলামিক মতাদর্শের দু’টি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে দু’টি হত্যাকান্ডের ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু এ ঘটনায় দায়েরী হত্যা মামলায় বিএনপি-জামাতসহ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আসামী করা হয়েছে। সবকিছুতে রাজনীতি সম্পৃক্ত করা উচিত নয়। তিনি এর নিন্দা জানিয়ে মামলা থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের নাম প্রত্যাহারের দাবি জানান।
কেন্দ্রিয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য জেলা আ.লীগ নেতা শামীম আহমদ চৌধুরী জানান, পৌর মেয়র আবুল কালাম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিষয়টি আপোষ প্রক্রিয়ার কাজ চলছে। মামলার আসামী বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে শীঘ্রই সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানান তিনি।
ছাতক প্রেসক্লাবের সভাপতি সৈয়দ হারুন-অর রশীদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ছাতকে এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা নজীরবিহীন। অনাকাংখিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িত নয় এমন কোন ব্যক্তিকে আসামী করা সঠিক নয় মন্তব্য করে বৃহত্তর স্বার্থে বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি কামনা করেছেন তিনি।


