ভোটের গতি-প্রকৃতি আর দিরাই-শাল্লার রাজনীতির চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য মোতাবেক প্রত্যাশিতভাবেই জয়া সেন গুপ্তা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। কাস্টিং ১৩৬৯২৪ ভোটের মধ্যে ৯৫৯৯৫ ভোট অর্থাৎ শতকরা ৭০ ভাগ ভোট পেয়েছেন জয়া। প্রায় ৫৬ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে নির্বাচনে। প্রবল বৃষ্টিবিঘিœত নির্বাচনে ৫৬% ভোট কাস্টিং সন্তোষজনক। অন্যদিকে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেনের ৪০৯২৯ ভোট পাওয়া বিশেষ তাৎপর্যম-িত। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময়ে ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেনের এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোন আভাস না থাকলেও এক পর্যায়ে বিএনপি তথা নাছির চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের ছোট্ট একটি অংশের সমর্থন লাভের কারণে তিনি এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীর এই উত্থান সামনের দিনে দিরাই-শাল্লার নির্বাচনকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী ধনকুবের এই ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেন যদি প্রত্যাশার বাইরে বিপুল ভোট পাওয়ার কারণে উৎসাহিত হয়ে রাজনীতি তথা নির্বাচন নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করেন তাহলে সামনের নির্বাচনের অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে পারে। তবে এই পরিবর্তন আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীর উপর তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। বরং ছায়েদ আলী মাহবুব হোসেনকে সমর্থনকারী নাছির চৌধুরীর অবস্থান কিছুটা আলগা হয়ে পড়ে কি-না সেটিই দেখার বিষয়। যাইহোক দিরাই-শাল্লার এই নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত করে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনি প্রশংসাভাজন হয়েছেন। আমরা বিজয়ী জয়া সেন গুপ্তাকে অভিনন্দন জানাই। রাজনীতির অনেক জটিল জগতে এই সুশিক্ষিতা নারী কতটুকু স্থায়িত্ব পাবেন তার হিসাব শুরু হবে এখন থেকে। তিনি যদি নিজের যোগ্যতা বলে জায়গা তৈরি করে নিতে পারেন তাহলে কথিত ‘সুরঞ্জিত যুগ’ যে আরও বেশ কিছু দিন অনেকের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দীর্ঘ সংগ্রাম আর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পুড়খাওয়া রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের সহধর্মীনি জয়া সেন গুপ্তা নির্বাচনে বিজয় লাভের অব্যবহিত পরেই গণমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তা সুনামগঞ্জের রাজনীতির জন্য সবিশেষ তাৎপর্যম-িত। তিনি বলেছেন, দিরাই-শাল্লায় আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রেখে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তিনি কারও বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়েন নি, সমালোচনা করেন নি প্রতিপক্ষসহ নিজ দলের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বিরুদ্ধাচরণকারীদের। একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদের পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন প্রাথমিক পর্যায়েই। মূলত পুরো নির্বাচনী প্রচারকালে এই নারী ব্যক্তিত্ব, শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও পরিমিতিজ্ঞানের পরিচয় দিয়ে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। তাঁর এই দায়িত্বশীলতা সুনামগঞ্জের আওয়ামী রাজনীতিতে সামনের দিনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হতে পারে। কারণ জয়া সেনকে এই আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন খোদ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। স্থানীয় রাজনীতির বিভাজন ও মতভেদকে অগ্রাহ্য করে নিজের নির্বাচনে অন্তত প্রকাশ্যে এক রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। যারা তাঁর প্রয়াত স্বামীর সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন তাঁরাও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে জয়া সেন নিজেকে জেলা আওয়ামী লীগের একটি স্তম্ভে পরিণত করতে পেরেছেন। এই অর্জনকে যদি দলের বিভেদ-বিভাজন দূর করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তিনি ব্যবহার করতে পারেন তাহলে আওয়ামী লীগের বিশাল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আশা সঞ্চার হবে।
আর বছর দেড়েক পরেই জাতীয় নির্বাচন। একটি গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে আসা আওয়ামী লীগের এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জয়া সেন কতটুকু ভূমিকা রাখেন সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন জেলার রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করেন এমন ব্যক্তিগণ। তাকিয়ে আছি আমরাও।

