স্বপন কুমার দেব
মথুরা ও বৃন্দাবন-শ্রী কৃষ্ণের জনম্ভূমি ও লীলাভূমি ৬
আজ ১৭/১২/২০১৫ খ্রিস্টাব্দ। বৃহস্পতিবার। দিল্লীর হোটেল থেকে ভোর বেলা শুধু চা খেয়ে আমরা লাগেজ পত্র নিয়ে হোটেল ত্যাগ করলাম। নিচে রাস্তায় দন্ডায়মান একই গাড়ি আর একই চালক। সাড়ে সাতটা বাজে। মহসিন খান গাড়ি স্টার্ট দিলেন। দিল্লী ছেড়ে যাচ্ছি। কুয়াশা ঢাকা দিল্লীর সকাল। তবে রাস্তায় গাড়ি চলাচল আছে যথেষ্ট পরিমাণে। এতবড় দেশের রাজধানী বলে কথা। দিনরাত্রি সর্বক্ষণই কর্মব্যস্ততা। দিল্লীর উত্তরে ও দক্ষিণে হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ। পূর্বে উত্তর প্রদেশ পশ্চিমে হরিয়ানা। অর্থাৎ দিল্লীর চারদিকেই হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ। মথুরা, বৃন্দাবন, আগ্রা- দিল্লী থেকে ক্রমশ: দক্ষিণ-পূর্বে ও দক্ষিণে। অবস্থান উত্তর প্রদেশ রাজ্যে। গাড়ি চলতে চলতে ঢুকে গেল উত্তর প্রদেশে। এই এলাকার নাম নয়ডা। এর কিছুক্ষণ পরই গাড়ি আগ্রামুখী যমুনা এক্সপ্রেস হাইওয়েতে উঠে এলো। এই হাইওয়েটি এতো চওড়া যে মনে হয় একটা ফুটবল মাঠের মতো শরীর নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির গতি ও কুয়াশার জন্য সড়কটি কত লেনের তা ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। তবে আমার কাছে মনে হয় আট লেনের রাস্তা। পাশাপাশি চারটি গাড়ি একদিক থেকে আর বিপরীত দিক থেকে পাশাপাশি আরো চারটি গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা। মাঝখানে বড় আইল। মাঝে মাঝে আইলের উপর সাজানো বাগান। রং বেরংয়ের মৌসুমী ফুল ঝলমল করছে। কুয়াশা থাকলেও ঘন নয়। সূর্যের আলো তখনও ফুটেনি। হুস হুস করে গাড়ি আসা যাওয়া করছে। দু’পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ক্ষেত আর ক্ষেত। গ্রাম মানুষ জন দালান কোঠা চোখে পড়ছে না। যেভাবে আমাদের মহাসড়কগুলির দু’দিকে বাড়ি ঘর লোকজন আর মার্কেটে ঠাসা, তেমন নয়। আদর্শ মহাসড়ক বলা যায়। যানজটের কোন প্রশ্ন উঠে না। গাড়ির ভেতরে ঠান্ডা নেই। আরামসে চলতে চলতে ঝিমুনি এসে গেছে। গাড়ির গতি থামলো টোল প্লাজায়। সড়কের মতোই বিরাট টোল প্লাজা। অকেকগুলি বুথ। এখানকার মহাসড়কগুলিতে মাঝে মাঝে টোল আদায়ের ব্যবস্থা থকে। টোল পেরিয়ে এসে গাড়ি চললো পূর্ণ গতিতে। সড়ক বা হাইওয়ে চলছে সরল রেখায়। মাঝে মাঝে সামান্য বাঁক। সেখান থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট সড়ক ডানে কিংবা বায়ে বেরিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেছে। হয়তো দূরের কোন গ্রামে কিংবা গঞ্জে। নিজ দেশ বাড়ি থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে আছি। মনে একটা উদাসী ভাব। এভাবে প্রায় ঘন্টা খানেক চলার পর মহসিন খান গাড়ি থামালেন একটি ধাবার চত্বরে। ধাবা মানে হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট। সম্ভবত: পাঞ্জাবী ভাষা থেকে ধাবা শব্দটি এসেছে। স্বল্প দামে ভালো খাবার দাবারের ব্যবস্থা থাকে ধাবায়। নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। বেশ ঠান্ডা। একাধিক টুরিষ্ট বাস ও গাড়ি জমা হয়েছে ধাবা চত্বরে। শীত পোশাকে সবাই ঢুকছেন বেরুচ্ছেন। বারান্দায় অনেকের হাতে ধুমায়িত চায়ের কিংবা কফির কাপ। চায়ের কাপের ধোঁয়ার সঙ্গে সুবাসিত গন্ধ। আহা রে। মনে পড়ল একটা গানের কলি “চায়ের পেয়ালা যদি সাগর হতো, সাঁতার কাটিতাম আমি মনের মতো।” ধাবার প্রবেশ মুখে এক কোনায় দাঁড়িয়ে বেহালায় সুর তোলে গান গাইছের এক পল্লী গায়ক। বয়সে যুবক, মাথায় রাজস্থানী পাগড়ী, পায়ে নাগরাই চপ্পল, পড়নে ধুতি ও সাদা শার্টের উপর চাপানো হাতকাটা রঙিন কোট। এই শীতে কোন পরোয়া নেই। গায়ক নিজ গানে মগ্ন। ভাষা বুঝা যায় না তবে সুর বুঝা যায়। চিরন্তন শ্বাশত গ্রামীণ সুর। দুনিয়ার সর্বত্র এই সুর এক ও অদ্বিতীয়। আমরা ব্রেকফাস্ট করলাম আলু-পরোটা দিয়ে। এটি আলু দিয়ে তৈরী এক ধরণের পরোটা। সঙ্গে টক ঝাল আচার। নরম গরম মোটা মোটা সাইজের সুস্বাদু আলু পরোটা। একটা খেলেই পেট ভর্তি। আচারের স্বাদে গন্ধে ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। অত:পর দুধ চা। আগেই লিখে ছিলাম এসব অঞ্চলে লিকার চা বলতে কিছু নেই। সবই দুধ চা। তবে ফিকি আর মিঠি। ফিকি মানে চিনি ছাড়া আর মিঠি মানে চিনি দেওয়া। আমি ফিকি চায়ে সঙ্গে আনা বিকল্প জিরো ক্যালরি সুগার ট্যাবলেট মিশিয়ে চা খাই। ভরপেটে চা খাওয়ার পর পর ঝটপট তরতাজা ভাব এনে দেয়। আবার হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলা। এদিকে আড়ালে আড়ালে সূর্য দেব উঁকি মারছেন। রোদের আলোয় ঝিকিমিকি হাইওয়ে। কিছু সময় পরই ড্রাইভার মহসিন খান গাড়ি বাঁদিকে ঘুরিয়ে আরেকটি ছোট সড়কে নেমে এলেন। এবার গাড়ি চলছে সবজি ক্ষেতের গা ঘেঁসে। দু’দিকের সবজি ক্ষেতে আলু আর ফুলকপি। এখানকার সাধারণ লোকেরা বেলায় বেলায় আলু ফুলকপির তরকারি খায়। স্থানীয় ভাষায় এই তরকারির নাম আলু-গোবী। রাস্তায় বেশ কিছু বাঁক আছে। গাড়ি ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম বৃন্দাবন শহরে। তবে বৃন্দাবনে না নেমে আগে যাব মথুরা। ফেরার পথে বৃন্দাবন। মথুরা উত্তর প্রদেশের একটি জেলা। আর বৃন্দাবন এই জেলারই একটি শহর। দিল্লী থেকে মথুরা জেলা শহরের দুরত্ব প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। মথুরা আর বৃন্দাবনের মধ্যে পনের/ষোল কিলোমিটারের ব্যবধান। বৃন্দাবনের উপর দিয়ে প্রায় শহরে শহরেই চলে এলাম মথুরা। যমুনা নদীর তীরে মথুরা অতি পুরানো এক ঐতিহ্য মন্ডিত ও ঐতিহাসিক শহর। ৫০০০ (পাঁচ হাজার) বৎসর পূর্বে দ্বাপর যুগে মথুরা নগরীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন। মাতা দেবকী, পিতা বসুদেব। সর্বত্র সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি দিনটি জন্মাষ্টমী হিসাবে পালন করেন। বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে জন্মাষ্টমী পালিত হয়। এ দিন সরকারী ছুটি থাকে। মথুরার রাজা কংস ছিলেন অত্যন্ত অত্যাচারী। কংস ভাবতেন তিনি অমর হয়ে থাকবেন। আর সবার উপর অত্যাচার চালাবেন। নিজের বোন দেবকীর সঙ্গে বসুদেবের বিয়ের পর যখন কংস বায়ুরথে করে ফিরছিলেন তখনই আকাশ থেকে দৈববাণী হয় দেবকীর গভীজাত অষ্টম সন্তানের হাতে কংসের নিধন হবে। এরপরই কংস ভীষণ ভাবে ক্রোধান্নিত হয়ে পড়েন এবং দেবকী ও বসুদেবকে নির্জন কারাগারে অন্ধকার প্রোকোষ্ঠে বন্দী করে রাখেন। কারা প্রকোষ্ঠে দেবকীর গর্ভজাত একে একে সাতটি সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পরপরই কংস তাঁদের মেরে ফেলেন। এবার অষ্টম সন্তানের পালা। মাতা দেবকীর গর্ভে অবতার রূপে জন্ম নিতে আসছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভাদ্র মাসের পূণ্য তিথিতে দেবকীর কোল আলো করে জন্ম নিলেন শিশু শ্রীকৃষ্ণ। সেই সময়ে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। অলৌকিক এক কারণে কারারক্ষীরা ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছেন। বসুদেব শিশু কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বাদল রাতে পায়ে হেঁটে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে চলে যান মাতা যশোদার নিবাসে। যমুনা নদীর জল দু’দিকে সরে গিয়ে বসুদেবকে রাস্তা করে দিয়েছিল। অত:পর বসুদেব শিশু কৃষ্ণকে যশোদার কোলে রেখে যশোদার সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া কন্যাকে (দেবী যোগমায়া) নিয়ে ফিরে আসেন কারাগারে। কংস কারাগারে এসে কন্যা সন্তানকে দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলেন। দু’হাতে শিশু কন্যাকে তুলে আছড়ে ফেলে দিলেন মেঝেতে। সেই কন্যা মুহূর্তে শূন্য উঠে যান। আর দেবী যোগমায়ার মুখ থেকে বাণী নি:সৃত হয় “তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে” সেই বিখ্যাত বা কুখ্যাত কংসের কারাগার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ক্রমশ: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে রূপ নেয়। আমরা এবার দাঁড়িয়ে আছি কংসের কারাগারের সেই প্রায়ান্ধকার প্রকোষ্ঠের সামনে। যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নিয়েছিলেন। সেই শয্যা বাঁধানো অবস্থায় এখনো পূর্ববৎ আছে। সত্যি অবাক লাগছে। কোনদিন ভাবিনি দর্শন করতে পারব এই পূণ্যস্থান। গাইড সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। ফটো তোলা কড়াকড়ি ভাবে নিষিদ্ধ। সাজ-সরঞ্জান জমা দিয়েই মন্দির কমপ্লেক্সে ঢুকতে হয়। অত্যন্ত আঁটসাঁট নিরপত্তা ব্যবস্থা। মন্দিরে তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজো শেষে বন্দনা চলছে। জয় রাধে-জয় কৃষ্ণ ধ্বনিতে মুখরিত মন্দির গৃহ। হাতে সময় নেই তাই চাতালে চলে এলাম। কংসের কারাগার তথা মন্দিরের গা ঘেঁসে আছে একটি মসজিদ। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এখানে কখনো কোন দিন অশান্তি হয়নি। স¤্রাট আওরঙ্গজেব পরবর্তীকালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। উঁচুতে থাকা মন্দির কমপ্লেক্স থেকে ঢালু রাস্তা বেয়ে নিচে এলাম। মথুরা নগরে আরো অনেক দেবালয় ইত্যাদি দেখার স্থান আছে। কিন্তু বৃন্দাবন হয়ে ছুটতে হবে আগ্রায়। হাতছানি দিচ্ছে তাজমহল। পরের দিন শুক্রবার তাজমহল বন্ধ থাকবে। দেরি করলে সমস্ত প্রোগ্রাম তছনছ হয়ে যাবে। বৃন্দাবন পৌঁছে গেলাম স্বল্প সময়ে। বেলা সম্ভবত: সাড়ে দশটা হবে। শীতের সকালে বৃন্দাবন শহরে একটা অলস নির্জন ভাব। দিনের কর্মচাঞ্চল্য তখনও শুরু হয়নি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্য কাল থেকে যৌবন কালের অনেক লীলা খেলা ও কর্মক্ষেত্রের কেন্দ্রভূমি পবিত্র শহর বৃন্দাবন। এখানেই শ্রীকৃষ্ণের ক্রমশ: বেড়ে উঠা। রাখাল বালকদের সঙ্গে গো-চারন। রাজা কংস বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাক্ষস রাক্ষসীকে ছদ্দবেশে বৃন্দাবনে পাঠিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণকে বধ করার জন্য, কিন্তু সব ঘাতকেরই মৃত্যু হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের হাতে। যমুনা নদীর তীরে বৃন্দাবন অগনিত গাছগাছালি আর বনরাজিতে ভর্তি ছিল। এখনো এর অভাব নেই। রাধা-কৃষ্ণের মধুর প্রেম লীলার সঙ্গে কদম গাছ বা কদম্ব বৃক্ষ ও ফুল যেন অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। প্রচুর পরিমাণে কদম গাছে এখনো ছেয়ে আছে বৃন্দাবন শহর। বৃন্দাবনকে বলা হয় মন্দিরের শহর। এখানের দুই হাজারের বেশি মন্দির আছে। আছে বিখ্যাত তুলসী বন। এই তুলসী বনটি রাধাকৃষ্ণের অন্যতম একটি লীলাক্ষেত্র। বৃন্দাবন কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। যে কেউ এখানে এসে থাকতে পারেন। এই শহরে অগনিত গলি। গলির পর তস্য গলি। পুরানো দিনের গৃহে গৃহে সাধু সন্তদের নিবাস। গলি পথে পথে সাধুদের পদচারণা। একজান গাইড ঠিক করা হলো। তিনি উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মন্দির দর্শন করিয়ে দেবেন। কাঁটছাট না করে উপায় নেই। মন্দির গুলি অধিকাংশই রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ কেন্দ্রীক। গাইড আমাদেরকে নিয়ে একটি গলিতে ঢুকলেন আর সাবধান করে দিলেন চশমা খুলে পকেটে রাখুন। চোখে পড়ল একটা টাঙানো সতর্কবাণী। বাংলায় যার অর্থ হলো “বানরের থাবা থেকে চশমা সাবধানে রাখুন।” ঠিকই তো। গলিতে, বাড়ির ছাদে, কার্নিসে প্রচুর বাদরের চলাফেরা। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বানরের দেখা মিলেছে। কিন্তু বৃন্দাবনে সংখ্যায় অনেক। চশমার প্রতি হয়তো তাঁদের একটা দুর্বলতা আছে। চশমা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাজেই আগে ভাগেই সাবধান করে দেওয়া। গাইডের পেছনে পেছনে অলি গলি পেরিয়ে সুউচ্চ প্রাচীন এক মন্দিরে ঢুকলাম। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী। অতি চমৎকার। আরেকটি মন্দিরে গিয়ে পুজো দিলাম। কিন্তু পান্ডা পুরোহিতের তরফ থেকে পুজার জন্য অর্থ আদায় যথেষ্ট চাপাচাপি আছে। এতে ভক্তি রস বিঘিœত হয়। বৃন্দাবনে পরিক্রমা বলে একটি কথা চালু আছে। দলবেঁধে ভক্তরা বৃন্দাবনের রাস্তায় কৃষ্ণ নাম করতে করতে পরিক্রমা করতে থাকেন। অনেক দল দূর দূরান্ত থেকে পদব্রজে পরিক্রমা করতে করতে শ্রী বৃন্দাবনে উপস্থিত হন। রাধাকৃষ্ণের লীলা ক্ষেত্র তুলসী বন দেখে ভক্তি রসে আপ্লুত হতে হয়। চারদিকে বড় দালান কোঠা হয়ে গেলেও তুলসী বন মোটামুটি অক্ষত। তবে সরাসরি তুলসী বনে যাওয়া যায় না। পাশের মন্দিরের বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে তুলসী বন দেখতে হয়। ঘন তুলসী সবুজে আবৃত বেশ কিছু জায়গা নিয়ে তুলসী বনের অবস্থান। আরেকবার সুযোগ পেলে কয়েকদিন থেকে মথুরা ও বৃন্দান দেখার আশা ও ইচ্ছা পোষণ করে আবার গাড়িতে উঠলাম। সূর্য তখন প্রায় মধ্য গগনে। ড্রাইভার মহসিন খান জানালেন আগ্রায় পৌঁছাতে আড়াই ঘন্টার মতো লাগবে।
আগ্রা-যমুনা তীরে স্বপ্নের তাজমহল ৭
বৃন্দাবন থেকে বেড়িয়ে এক সময় গাড়ি আবার যমুনা এক্সপ্রেস হাইওয়েতে উঠে এলো। আগ্রা মুখী গাড়ি ছুটছে। ছুটছে মন। মনের গতির সঙ্গে যন্ত্র আর কত পাল্লা দিবে? আমাদের মন মুহূর্তে পৌঁছে গেল তাজমহলে। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য্যের অন্যতম এক গৌরবমন্ডিত প্রেমের স্মারক অনন্য অদ্বিতীয় এই তাজমহল। ছাত্র-অছাত্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে কে জানে না এই তাজমহলের নাম। সবাই জানেন। দেখেছেন তাজের ছবি। কিন্তু বাস্তবে তাজ দর্শন যে কতো সুখকর ও রোমাঞ্চকর তা সামনে থেকে না দেখলে বুঝা যায় না। তাজমহল দেখা ও তাজ কমপ্লেক্সে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই একটি সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাজমহলের ইতিহাস জানা আছে অনেকেরই। পঞ্চম মোঘল স¤্রাট শাহজাহানের অমর র্কীতি এই তাজমহল। নান্দনিক শিল্প, স্থাপত্য আর সংস্কৃতির এক চরম উৎকর্ষ সাধিত হয় তাজমহল নির্মাণের মধ্য দিয়ে। তাজমহলের স্বপ্নদ্রষ্টা স¤্রাট শাহজাহান একাধারে যেমন ছিলেন স¤্রাট হিসাবে সু-শাসক তেমনি মনোজগতে ছিলেন এক মহান শিল্পী ও প্রেমিক। তাজমহলের মত নিদর্শন পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই। স¤্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহ্জাহান যখন তরুণ যুবরাজ র্খুরম্, তখনই অনন্য সুন্দরী তরুণী আরজুমান্দবানুর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। প্রথম দর্শনেই একে অন্যের প্রেমে পড়েন। প্রেমের পরিণতি হিসেবে এই যুগল বিবাহ বন্ধনে আবব্ধ হন। কিন্তু রাজা মহারাজা আর স¤্রাটদের অন্দর মহলে থাকে নানা কিস্সা কাহিনী আর রাজনীতির ঘূর্ণি জাল। ফলশ্রুতিতে আরজুমান্দ বানু শাহ্জাহানের প্রথমা স্ত্রী হিসাবে স¤্রাট পরিবারে পদার্পণ করতে না পারলে ও স¤্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপে অন্দরমহলে তাঁর আগমন ঘটে। এই আরজুমান্দ বানুই হলেন শাহ্জাহানের প্রিয়তমা পতœী মমতাজ মহল। তাদের প্রেমময় বিবাহিত জীবন ছিল উনিশ বছরের। মমতাজ মারা গেলে স¤্রাট শাহ্জাহানের হৃদয় ভেঙে যায়। অকাল বার্ধক্য দেখা দেয় স¤্রাটের নশ্বর দেহে। প্রিয়তমা পতœী বিয়োগের শোক অবশেষে প্রেমিক শাহ্জাহানকে এনে দেয় এক বিশেষ শক্তি। তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে প্রিয়তমার স্মৃতিকে অক্ষয় রাখতে এমন এক স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করবেন যা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ এক কীর্তি হিসাবে অম্লান থাকবে। স¤্রাটের ইচ্ছাপূরণ হয়েছে। সেই স্মৃতি সৌধের নামই জগদ্ববিখ্যাত তাজমহল। তাজমহল স্মৃতিসৌধের শিল্প, নক্সা, স্থাপত্য, পরিকল্পনা সবই স¤্রাটের নিজস্ব চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা প্রসূত। চলার গতিতে এসব ভাবছি আর ভাবছি। মনে কিছুটা ¯œায়ুর চাপ। আগ্রা পৌঁছাতে কি দেরী হয়ে যাবে? ড্রাইভার মহসিন খানকে জিজ্ঞাসা “ঔর কিত্না টাইম লাগেগা?” মহসিন আশ্বস্ত করলেন এই বলে “টেনশন মৎ করিয়ে, ঠিক টাইমসে পৌছ্ যায়েগা।” মহসিনের ঠিক সময় আর আমাদের ঠিক সময় কখন এক হয়ে ফুরাবে কে জানে। আমার সঙ্গে দুটো ঘড়ি। একটি কবজিতে বাঁধা রিষ্টওয়াচ্। অপরটি মোবাইলে। রিষ্টওয়াচে বাংলাদেশ সময় সেট্ করা আছে। ভারতীয় সময় থেকে আধা ঘন্টা আগে চলে আমাদের দেশের সময়। যখন হাতঘড়ি দেখি তখন মন হায় হায় করে উঠে। কারণ সময় যে চলে যাচ্ছে। আবার যখন মোবাইলের ঘড়িতে ভারতীয় সময় দেখি তখন কিছুটা আশ্বস্ত হই এই ভেবে যে, অতিরিক্ত আরো আধ্ঘন্টা সময় হাতে আছে। সময়ের আরেকটা ব্যাপার আছে। সারা ভারতের স্টান্ডার্ড টাইমের সঙ্গে আমাদের দেশের আধঘন্টা বা ত্রিশ মিনিট আগ পিছু হলেও ভারতের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সূর্য্য মিলিয়ে সময়ের যে ফারাক তা কিন্তু এক ঘন্টার। যেমন ছিল পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। পূর্ব বাংলা একঘন্টা এগিয়ে। সে হিসাবে আগ্রাও তার ধারে কাছে বাংলাদেশ সময়ের তফাৎ প্রায় একঘন্টার। বাংলাদেশ এক ঘন্টা এগিয়ে। তাজমহল সহ ভারতের অধিকাংশ দর্শনীয় স্থানের পরিদর্শন সময়সীমা হলো সকাল ৮ ঘটিকা থেকে বিকেল ৫ ঘটিকা পর্যন্ত। এ সময়টা ভারতের স্টান্ডার্ড সময় অনুযায়ী সর্বত্র অনুসরণ করা হয়। তবে বাস্তবে সূর্য্যরে আলো ঐ অঞ্চলে বাড়তি এক ঘন্টা পাওয়া যাবে এই যা সান্তনা। তাজমহল দেখার স্বপ্ন কার না আছে। ছবিতে তাজমহল তো স্কুল জীবন থেকেই চিনি। সেই তাজমহল আজ সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পাব তা ভাবতে ভাবতে যুগপৎ পুলকিত ও রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। যেন চার চক্ষুর মিলন হবে। ধৈর্য্যের পরীক্ষা শেষ হয়ে অবশেষে এক শুভ মুহূর্তে আগ্রা শহরে গাড়ি ঢুকলো। গাড়ি চলছে, তবে জ্যাম আছে। ভারতীয় সময় বেলা প্রায় আড়াইটা। এগুতে এগুতে এক সময় বা পাশে দেখা দিলো বয়ে চলা যমুনা নদী। বুঝলাম কাছেই এসে গেছি। অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তায় গাড়িতে গাড়িতে ছয়লাব। প্রবেশ মুখ পেরিয়ে মহসিন খান আরো সামনে এগিয়ে গিয়ে থামলেন। উনার পরিচিত গাইড এর সঙ্গে পরিচয় হলো। নাম রশিদ খান। আগ্রাবাসী এক যুবক। তাজমহল দর্শনে টিকেটের দু’রকমের ব্যবস্থা। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য মাথাপিছু বিশ রুপি করে। বিদেশীদের জন্য মাথাপিছু সাড়ে পাঁচশত রুপী। বিদেশ বলতে বুঝায় সাদা চামড়ার সাহেব সুবা। চেহারাগত মিলের কারণে আমরা অনায়াসেই ভারতীয় পরিচয়ে বিশ রুপীর টিকেট কাটতে পারি। তবে আই.ডি দেখাতে বললে অসুবিধায় পড়ব। গাইড রশিদ খানের পরামর্শে পাসপোর্ট দেখিয়ে আমরা দু’জনের জন্য এগারো’শ রুপীর টিকেট কিনলাম। গাইডদের টিকেট লাগে না। প্রথম গেইট থেকে মূল গেইট আরো দেড় কিলোমিটার দুরত্বে। গাড়ি আর এগুবে না। বিভিন্ন ধরণের ছোট যানবাহনে যেতে হয়। গাইড সহ আমরা ইজি বাইকে চেপে চলে এলাম মূল গেইটের সামনে। এতো লম্বা লাইন যে মনে হয় শেষ হবে না। ঘড়ির কাঁটা এগুচ্ছে আর হতাশা বাড়ছে। এবারে বেশি দামের টিকেটের মাজেজা বুঝিয়ে দিলেন রশিদ খান। বেশি দামের বিদেশী টিকেটধারীদের জন্য আলাদা লাইন। তবে অনেক ছোট। আমরা দ্রুততম সময়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। গেইটে তল্লাশি কার্যক্রম অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে পালিত হয়। এবার আর দেরি নয়। ছুটে চলো সামনে। আরেকটি বড় চত্বর। চত্বর পেড়িয়ে তাজে ঢোকার মুখে আরেকটি গেইট। রশিদ খান পেশাগত নিয়মে কিছু ব্রিফ করছিলেন। কিন্তু আমাদের আর তর সইছে না। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বেলা তখন সাড়ে ৩ ঘটিকা। শেষ তোরণ অতিক্রম করলাম। বিশাল পর্দা যেন দুভাগ হয়ে দু’দিকে সরে গেল। সামনে অপার বিস্ময়। অদূরে দাঁড়িয়ে সেই ছবির তাজমহল। সেই করিডোর। দু’পাশে সেই সবুজ ঘাসের নাতিদীর্ঘ বৃক্ষসম স্তম্ভসারি। বিশাল আঙ্গিনা। বাগান, ফুল, ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জলাধার। চিরসবুজ ঘাসের গালিচা পাতা লন। পুলকিত চিত্তে আমরা সামনে এগিয়ে চললাম। যেতে যেতে গাইড রশিদ খানের কথা কানে ঢুকেও ঢুকছে না। আমরা তো দেখায় মগ্ন। বাগানের ভিতর দিয়ে এক প্রান্তে তাজে উঠার এবং আরেক প্রান্ত দিয়ে নামার ব্যবস্থা। তাজমহল নিচের সমতল থেকে বেশ উচ্চতায় অবস্থিত। তাজে উঠার আগে জুতোসুদ্ধ পায়ে পড়ে নিতে হলো সাদা এক ধরণের বড় পলিথিন কভার। ধুলোময়লা যাতে তাজমহলের গায়ে না লাগে এবং পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য এই ব্যবস্থা। একটি বহুজাতিক কোম্পানী বিনা পয়সায় এই কাভারগুলি সরবরাহ করেন। এবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলাম তাজমহল নামের পৃথিবীর বুকে এক অতি আশ্চর্য্য স্মৃতিসৌধে। এমন স্বর্গীয় সৌন্দর্য আগে কখনো অবলোকন করার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। ধন্য নিজেদেরকে। বিরল সৌন্দর্যের বর্ণনা কখনোও ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমিও পারব না। এটি অনুভূতির বিষয়। নয়ন দিয়ে দেখতে হয় আর হৃদয় ও আত্মা দিয়ে ধারণ করতে হয়। তবু কিছু লিখতে হবে। না হলে তো পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। ২২ বছর সময়ে ২২ হাজার শ্রমিক তাজমহল নির্মাণ করেন। মাঝখানে মূল সৌধ। উপরে গম্বুজ। চারদিকে সমান আকৃতির প্রশস্ত চত্বর। চারকোণায় চারটি মিনার। প্রতিটির উচ্চতা একশত সাড়ে বাষট্টি ফুট করে। মূল সৌধের উচ্চতা ১৮০ ফুট। তার উপরে গম্বুজ। গম্বুজের উচ্চতা দুইশত তের ফুট। মূল সৌধ স্থাপনাটিও সমান মাপের। ১৮৬ বাই ১৮৬ ফুট। বিভিন্ন ধরণের মহামূল্যবান শ্বেতপাথর পাথর ও মণি দিয়ে তৈরী হয় তাজমহল। ভারতবর্ষের বিভিন্নস্থানসহ চীন, আফগানিস্তান, ব্রাজিল, শ্রীলংকাসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে এসব পাথর ও মণিমুক্তা সংগ্রহ করা হয়েছিল। মূলত: শ্বেত পাথরের গায়ের উপর বিভিন্ন ধরণের দুষ্প্রাপ্য দামি নীলকান্ত মণি ও পাথর বসানো হয়। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে খোদাই করা আছে শীলালিপি। আছে পবিত্র কোরআন থেকে উদ্বৃত বাণী। এতো সুন্দর আর দৃষ্টিনন্দন সুক্ষকারুকাজ তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। প্রশস্ত চত্বর বা বারান্দা থেকে একপাশে দৃষ্টিগোচরে আসে বহতা যমুনা নদী। তবে তা এখন শীর্ণকায়া। দিনের বেলায় তাজমহলের রং একেক সময় একেক রকমের হয়। সকালে গোলাপী, বিকালে দুধ সাদা আর চাঁদনী রাতে সোনারাঙা। প্রতিমাসে একদিন চাঁদনীরাতে তাজমহল পরিদর্শনের জন্য খোলা থাকে। আমরা যতক্ষণ তাজে ছিলাম তখন বিকেল বেলা। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত। তখন তাজের রঙ শ্বেত শুভ্র। পবিত্র প্রেমের প্রতীক। বহিরাঙ্গণের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে শুধু দেখা আর দেখা। তবু আশা মিটে না। একদিকে যেমন যমুনা নদী তেমনি আরেক দিকে দিগন্ত পানে চক্রাকারে উড়ন্ত পাখ্-পাখালি। তাজের সন্নিকটে বিরাট রাজকীয় মহল। গাইড বললেন, রাজকীয় অতিথিরা তাজমহল দেখতে আসলে এই মহলে অবস্থান করতেন। আরেক দিকে একটি মসজিদ। সপ্তাহে শুক্রবার একদিন তাজমহল বন্ধ থাকে। তবে মুসল্লিদের তাজ মসজিদে নামাজ পড়তে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়। ঐদিন রক্ষণাবেক্ষণের কিছু কাজকর্মও হয়ে থাকে। আমাদের পরিদর্শনের দিন ছিল বৃহস্পতিবার। কাজেই সময়ের জন্য ছিল তাড়াহুড়া। এবারে গাইড রশিদ খান আমাদের নিয়ে মূল সৌধের ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরে ছায়াছায়া আলো আঁধারী পরিবেশ। দর্শকদের হাতে হাতে মোবাইল ফোনের আলো। ভেতরের দেয়ালে শৈল্পিক কারুকার্য। কিছুটা গোল আকৃতির সরু রাস্তা। ভীড়ে ধাক্কাধাক্কি আছে। রশিদ খান আমাদের টেনে নিয়ে এলেন সেই মর্মস্পর্শীস্থানে। পাশাপাশি দু’টি কবর। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন স¤্রাজ্ঞী মমতাজ মহল আর স¤্রাট শাহ্জাহান। একজনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত আরেকজন মহান শিল্পীর মহৎ শিল্পকর্ম এই তাজমহল। স¤্রাট শাহজাহান তাজমহল নামের এক অমর প্রেমের কবিতার কবি ও রচয়িতা। তবে একটি জানার বিষয় আছে। দু’টি মূল কবরই কালের পরিক্রমায় অনেক নিচে তলিয়ে গেছে। বর্তমানের কবর দু’টি রিপ্লেকা বা হুবহু নকল। দেড় ঘন্টার মতো তাজ দর্শন করে মুগ্ধ চিত্তে আর তৃপ্ত হৃদয়ে নেমে এলাম নিচের বাগানে। তাজ চত্বর ও নিচের বাগানে অসংখ্য পর্যটক। অনবরত ফটো তোলা চলছে। আমরাও বাদ নেই। তাজ বিষয়ে লেখার পর একই সঙ্গে অন্য কিছু লেখা যায় না। বাইরে চলে আসলেও তাজ দর্শনের রেশ কাটেনি। অনেকদিন থাকবে এই মুগ্ধতা। সন্ধ্যা আগত প্রায়। রাতে এবং পরের দিন বেশ কিছু সময় থাকবো আগ্রাতেই। তবে অন্য কিছু পরিদর্শনে। জানবেন আগামী সংখ্যায়।
আগ্রা ফোর্ট ও বন্দী স¤্রাট ৮
সব টুরিষ্ট স্পটেই গাইডদের একটা বিশেষ বিষয়ে মিল পরিলক্ষিত হয়। গাড়ির ড্রাইভাররাও গাইডদের সঙ্গে ঐ বিশেষ সূত্রে বাঁধা থাকে। জায়গা দেখানো ছাড়া গাইডদের আরেকটি মূখ্য কাজ হলো টুরিষ্টদের একটি বিশেষ দোকানে নিয়ে গিয়ে কৌশলে কেনাকাটায় প্রায় বাধ্য করা। সর্বত্র পরিদর্শনের জায়গায় হরেক রকম মনোহারী দ্রব্যের দোকান আছে। বিক্রেতাদের ও গাইডদের ভাষ্যমতে জিনিসপত্রগুলি একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ও দুষ্প্রাপ্য। অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু খোঁজ করলে দেখা যাবে সবজায়গায় এমনকি কোন কোন ফুটপাতের দোকানেও এগুলি পাওয়া যায়। এর মধ্যে যে একেবারে ভালো জিনিস নেই তা ঠিক নয়। গাইডরা ভিন্ন ভিন্ন দোকানের এক ধরণের এজেন্টও। ক্রেতা নিয়ে গিয়ে কেনাকাটা করাতে পারলে সেখান থেকে গাইড কমিশন লাভ করে। আমাদের দেশের হাইওয়েতে যেমন গাড়ি ড্রাইভাররা যাত্রীদের নির্দিষ্ট খাবার হোটেলে নিয়ে যান। লাভ হিসাবে ড্রাইভারদের খাওয়া দাওয়া ফ্রি। অনেকটা সেরকমই। তাজমহল থেকে বেরুনোর পর থেকেই গাইড রশিদ খান এখানকার এমন একটি দোকানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন, যেখানে মহার্ঘ্য সব দ্রব্যের সমাহার, গভ: অনুমোদিত দোকান ইত্যাদি। বেশ কিছু সময় একসঙ্গে থাকায় রশিদের সঙ্গে একটা ভাব হয়ে গেছে। কৌশলে এড়াতে চাইলেও রশিদ নাছোরবান্দা। এসব দেখাতে না পারলে তার নাকি খারাপ লাগবে। কেনাকাটার দরকার নেই। শুধু দেখে আসলেই চলবে। রাজী না হয়ে উপায় নেই। তবে মনন্থ করলাম কিছু কিনব না। তার আগে শেষ বিকালে অবেলায় লাঞ্চ। পছন্দমতো রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন গাইড আর ড্রাইভার। আমরা ততক্ষণে হাল ছেড়ে দিয়েছি। যা হবার হবে। ভেজ বা নিরামিষ খাবারের দোকান। এখানে হিন্দু মুসলিম সব রেস্টুরেন্টেই নিরামিষ খাবার। বিভিন্ন পদের তরকারী, ডাল আর চিকন চালের ভাত দিয়ে লাঞ্চ শেষ করলাম। প্রায় হাজার রুপীর মতো বিল এলো। বেশি মনে হলো। রাতে তাহলে আর কিছুই খাব না। এদিকে দোকানে যাওয়া তো বাকীই রইল। তাজমহল দেখার আনন্দে সব বিষাদ কাটিয়ে রওয়ানা দিলাম শপিং কমপ্লেক্সে। ঘড়ির সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা হয়ে যাবার কথা থাকলেও আঁধার নামেনি। বলা যায় গোধুলি বেলা চলছে। মার্কেট বেশি দূরে নয়। নির্দিষ্ট দোকানে গাইড রশিদ খান আমাদের নিয়ে এলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন মালিকের সঙ্গে। তিনি রশিদের মতোই যুবক বয়সী। উনি আমাদের দুই জনকে প্রথমে একটি ছিমছাম কক্ষে নিয়ে যতœ সহকারে বসালেন। নীচু মোলায়েম স্বরে সংক্ষেপে নিজের আত্মপরিচয় বর্ণনা করলেন। ভাষ্যমতে উনার পূর্বপুরুষ তাজমহল নির্মাণে বাইশ হাজার শ্রমিকের একজন। আদি পুরুষ মারা গেলে অধ:স্তন পুরুষ বা একাধিক পূর্বপুরুষ একে একে তাজমহল নির্মাণে অংশ নেন। সে হিসাবে তিনশতাধিক বৎসর যাবৎ পুরুষানুক্রমে আগ্রায় তাদের বসবাস। সেই আবেগ থেকে এখনও তিনি নিজে প্রতি শুক্রবার তাজ মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ শেষে স্বেচ্ছায় কিছু পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকেন। ব্যবসাটি শুধু লাভ লোকসান নয় আবেগের সঙ্গে জড়িত। কোন ঝুট ঝামেলা নেই। আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম যে কিছু একটা না কিনে বেরুনো যাবে না। এবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো আরেকটি কক্ষে। নানা রং এর পাথরে তৈরী বিভিন্ন ধরণের জিনিস সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। কর্মচারী দেখাচ্ছেন। দাম বলছেন, অনেক দাম। পছন্দ অপছন্দ বিষয়টি মাথায় আসছিল না কারণ আমরা তো কিনতেই চাইনা। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে। শেষে নিয়ে এলেন বড় একটা কক্ষে। রকমারী শাড়ীও মেয়েদের পোশাকে সজ্জিত। আমি তাকাই স্ত্রী শুভ্রার দিকে। তিনিও পূর্বকথামতো নির্লিপ্ত। মালিক আমাকে এমনভাবে এপ্রোচ্ করতে শুরু করলেন যে ভাবলাম একটা কিছু না কিনে ফিরলে ভীষণ লজ্জায় পড়ব। অবশেষে তাজমহলের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একটা রিপ্লেকা ও চাবির রিং পাঁচশত রুপী দিয়ে কিনলাম। মালিকের সঙ্গে ‘ফির আয়েঙ্গা, ফির মিলেঙ্গা বহুত কিনেগা’ বলে বিদায় নিলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। রশিদ খানকে গাইড হিসাবে প্রাপ্য মিটিয়ে দিলাম। মহসিন খান গাড়ি স্টার্ট দিলেন নির্দিষ্ট হোটেলের উদ্দেশে। হোটেল এলাকাটি বেশ নির্জন সুনসান পরিবেশ। মনে হয় আগ্রার বর্ধিত বা শহরতলী এলাকা। আগ্রায় রাতে বেশ ঠা-া। হোটেলটি নতুন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। রুমে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। সারাদিনের ক্লান্তি। রাত ৯টার দিকে বাইরে গিয়ে রাস্তার দোকান থেকে রুটি তরকারী কিনে আনি। এবার অনেক সস্তা। মাত্র ৩০ রুপী। বাইরে কন্কনে ঠা-া। স্থানে স্থানে মানুষের কুন্ডুলীর মাঝে আগুন জ্বলছে। শীত তাড়াতে বিশ্বের সবচেয়ে আদি ও অকৃত্রিম ব্যবস্থা। এক ঘুমে রাত শেষ। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বাথরুম। অত:পর আচ্ছাসে ¯œান। এখানকার সব হোটেলেই গরম পানির আলাদা টেপ আছে। শীতে টগবগে গরম পানি আর সুগন্ধী সাবান দিয়ে বেশ সময় নিয়ে ¯œান করা, ভারী তোয়ালে দিয়ে গা মোছা এসবই সারাদিনের জন্য বাড়তি এনার্জি। আমরা এভাবে রেডি হয়ে চা-বিস্কিট খেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে সোজা গাড়িতে। মহসিন খান তৈরী। গাড়ি ছুটে চললো আগ্রা ফোর্টের দিকে। সকাল ৯টা বাজে। তাজমহল থেকে আগ্রা ফোর্টের দুরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। ১০৮০ খ্রি. রাজপুত রাজা বাদল সিংহ ইটের গাঁথুনি দিয়ে প্রথমে এই দুর্গটি তৈরী করেছিলেন। রাজার নাম অনুসারে দুর্গের নাম ছিল ‘বাদল গড়’। অত:পর দিল্লীর সুলতান সিকান্দার লোদী এই দুর্গ দখল করেন এবং ১৪৮৮ খি. থেকে ১৫০৭ খি. পর্যন্ত আগ্রা দুর্গে বসবাস করে দেশ শাসন করেন। সিকান্দর লোদী মারা গেলে উনার পুত্র ইব্রাহিম লোদী আগ্রা দুর্গে প্রায় ১০ বৎসর বসবাস করেন। দুর্গের ভিতর একাধিক নতুন স্থাপনা তৈরী করেন। ১৫২৭ খ্রি. প্রথম মুঘল স¤্রাট বাবরের সঙ্গে প্রথম পানি পথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদী পরাজিত হন এবং তার মৃত্যু হয়। অত:পর স¤্রাট বাবর আগ্রা দুর্গে বসবাস করে মুঘল সা¤্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। বাবর মারা গেলে পুত্র স¤্রাট হুমায়ুন দুর্গে বসবাস করেন ও রাজ্য শাসন করেন। ১৫৪০ খ্রি. শের শাহ হুমায়ুনকে পরাজিত করে দুর্গ দখলে নেন। ১৫৫৫ খ্রি. হুমায়ুন আবার শেরশাহকে পরাজিত করে দুর্গ পুন:দখল করেন। অত:পর রাজা হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য (রাজা হেমু নামে পরিচিত) হুমায়ুনকে পরাজিত করে আগ্রা দুর্গ দখল করেন। এভাবে চলতে থাকে পালাবদলের পালা। রাজা হেমু ২য় পানিপথের যুদ্ধে স¤্রাট আকবরের হাতে পরাজিত হন। স¤্রাট আকবর ১৫৫৮ খ্রি. আগ্রা ফোর্টে চলে আসেন এবং সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। বাদশা আকবর বেলে পাথর বা ঝঅঘউ ঝঞঙঘঊ আগ্রা ফোর্ট পুন:নির্মাণ করেন। প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক ৮ বৎসর সময়ে দুর্গের পুন:নির্মাণ কার্য্য সম্পন্ন করেন। স¤্রাট আকবর দুর্গের ভিতরে পুত্র জাহাঙ্গীরের জন্য একটি প্যালেস নির্মাণ করেন। যার নাম জাহাঙ্গীর প্যালেস। স¤্রাট শাহজাহান আগ্রা ফোর্টের অধিক উন্নতি ও বিভিন্ন রকম সংস্কার সাধন করেছিলেন। ফোর্টের ভিতর শীষ মহলে রাতের বেলা মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করলে মহলটি মোহময়ী রূপ ধারণ করতো। জীবন সায়াহ্নে স¤্রাট শাহজাহান পুত্র আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দি হন। আওরঙ্গজেব শাহজাহানকে এই আগ্রা ফোর্টে বন্দি করে রেখেছিলেন। যে কক্ষে স¤্রাট বন্দি ছিলেন সেই কক্ষের লাগোয়া সুদৃশ্য মার্বেল পাথরে তৈরী ব্যলকনি থেকে স¤্রাট শাহজাহান দিনের দীর্ঘ সময় তাজমহল অবলোকন করে বন্দি জীবন অতিক্রান্ত করতেন। সিংহাসনের লড়াই বড়ই কঠিন আর নিষ্ঠুর। আগ্রা দুর্গ নিয়ে ক্ষমতার লড়াই চলতেই থাকে। পরে মারাঠারা আবার আগ্রা দুর্গ দখল করে। তৃতীয় পানি পথের যুদ্ধে মারাঠাদের হাত থেকে আবার দখল চলে যায়। অত:পর মারাঠারা পুন: দুর্গ দখল করে। ১৮০৩ খ্রি ইংরেজরা মারাঠাদের পরাজিত করে আগ্রা দুর্গ নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে আসে। ১৮৫৭ খ্রি. সিপাহী বিদ্রোহের সময় আগ্রা দুর্গে ইংরেজ সৈনিকদের সঙ্গে সিপাহীদের যুদ্ধ হয়েছিল। আগ্রা ফোর্টের বা আগ্রা দুর্গের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জানা অজানা নানা ইতিহাস। আমরা দুর্গে পৌঁছে গেলাম বেলা সাড়ে ৯টার দিকে। সমতল থেকে বেশ উঁচুতে দুর্গের অবস্থান। চারিদিকে একটা নির্জনতা। সকালবেলা লোকজন কম। সামনেই বিশাল সবুজ মাঠে ফুলের সমারোহ। ভেতরে মহলের পর মহল আর বাগান। লালকেল্লার মতো সরগরম নয়। তবে আগ্রা দুর্গে একটা নিরিবিলি আবাসিক পরিবেশ বিরাজমান। এখানেও আছে দেওয়ানি আম ও দেওয়ানি খাস। বিভিন্ন মহলের ভেতর থেকে ভূগর্ভে নেমে গেছে সিঁড়ি। নিচে হয়তো গোপন আরো মহল আছে। দুর্গ থেকে সরাসরি যমুনার তীরে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। যমুনার জলে রাজপরিবারের সদস্যদের ¯œানের জন্য সুদৃশ্য ঘাট সম্বলিত সুব্যবস্থা ছিল। নাদির শাহ দুর্গ আক্রমণ করে অনেক কিছু ধ্বংস করে দেন এবং বিখ্যাত কোহিনূর ডায়মন্ড এখান থেকেই লুন্ঠন করে নিয়ে যান। ইংরেজরা দুর্গ দখল করার পর তাদের সেনাবাহিনী এটি ব্যারাক বা গ্যারিসন হিসাবে ব্যবহার করে। দুর্গের ভিতর একাধিক মসজিদ আছে। মতি মসজিদ, নাগিনা মসজিদ ইত্যাদি। আছে গেস্টহাউস। সব স্থাপনা গুলির স্থাপত্যকার্য চমৎকার সুন্দর ও উচ্চ মানের। সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত বৃহৎ আকৃতির উঠোন, লন, বাগান দুর্গের সৌন্দর্য অধিক বাড়িয়ে দেয়। হাঁটথে হাঁটতে অনেকটা গোলকধাঁধার মতো লাগছে। মনের আয়নায় বারবার ভেসে উঠছিল বন্দি অবস্থায় প্রেমিক স¤্রাট শাহজাহানের অসহায় মুখচ্ছবি। কন্যা জাহানারা ছাড়া স¤্রাটের পাশে তখন আর কেউ ছিল না। সিংহাসনের লড়াইয়ে কেবল পিতামাতা প্রিয জন নয় সব কিছুই তুচ্ছ। এভাবে সিংহাসন বা কুর্শি নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে করতে একসময়ের প্রবল প্রতাপশালী মুঘল সা¤্রাজ্য ক্রমশ: দুর্বল হতে হতে অবশেষে পতন ঘটে। লাল কেল্লার চেয়ে আগ্রা দুর্গ আমাদেরকে অধিক আকর্ষণ করে। একটা শান্ত সমাহিত ভাব। যেন সহজেই কাছে টেনে নেয়। ইতিহাস ও ঘটনা প্রবাহ এখানে গভীর থেকে গভীরতর। তবে আগ্রা দুর্গ, তাজমহল আর লালকেল্লা তিনটি যেন একসূত্রে গাঁথা। দিনের পর দিন আগ্রা ফোর্ট আর তাজমহলে বসে থেকে গবেষণা করতে থাকুন। ঘাঁটতে থাকুন ইতিহাস। কিন্তু অনন্ত কাহিনীর শেষ হবে না। হয়তো বেরিয়ে আসবে আরো নতুন নতুন কাহিনী। কালের স্বাক্ষী হিসাবে আরো শতশত বৎসর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকুক বিশ্ব ঐতিহ্য এই আগ্রা ফোর্ট আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পদার্পণ করুক আগ্রা ফোর্টের অঙ্গণে। বেশ সময় অতিবাহিত করে আগ্রা ফোর্ট থেকে বেরিয়ে আবার গাড়িতে উঠলাম। এবারের গন্তব্য ফতেপুর সিক্রি। (চলবে)
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
- দোয়ারায় শিশু তাজুলের এক পাটি দাঁত উপড়ে ফেলার মতো নৃশংসতা
- কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরার অপরাধে দুই জেলেকে জরিমানা


