মধুর রসের পদকর্তা রাধারমণ দত্ত

ইকবাল কাগজী
সুনামগঞ্জের চার লোককবিকে নিয়ে উৎসব চলছে। ছাতকবাসীর প্রত্যাশাকে স্বীকৃতি দিয়ে এবারকার লোকউৎসবে দূর্বীণ শাহকে অঙ্গীভূত করা হয়েছে। রাধারামণ দত্ত, হাছন রাজা ও শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গে। পত্রিকায় একজন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন-“৪ দিন ব্যাপী লোক উৎসবের পর্দা উঠলো গতকাল।” গতকাল মানে ২৫ চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ৮ এপ্রিল ২০১৬ খ্রি:। বিজ্ঞজনে এই ৪ জনকে লোককবি, বাউল, মরমী কবি, এই রকম বিভিন্ন তাত্ত্বিক নামে বর্ণনা করে থাকেন।
তাত্ত্বিকদের মধ্যে এই চার কবির প্রকার প্রকৃতি নিয়ে বির্তক আছে। যেমন করিমকে কয়েক দশক আগে থেকেই বাউল কেবল নয়, একেবারে ‘বাউল সম্রাট’ নামে বিখ্যাত করে তোলা হয়েছে। অথচ কেউ কেউ বলেন করিম কখনও বাউল ছিলেন না। যেমন কেউ কেউ রাধারামণকে লোককবি বলতে নারাজ, তিনি নাকি বৈষ্ণব কবি। অথচ এই চার কবির প্রত্যেকেই আমজনতার কাছে লোককবি বলে বিখ্যাত ও ভক্তির পাত্র। তবে এসব ক্ষেত্রে সাধারাণত সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণীয় নয়, বা হয়ে ওঠে না। এবং সেটাই সঙ্গত, স্বাভাবিক ও যথার্থ। ক্রিটোর সঙ্গে আলাপচারিতায় সক্রেটিস বলেছেন-“সাধারণ মানুষের সব অভিমতই গ্রাহ্য নয়। কিছু সংখ্যক মানুষের মত অনেক সময়ে গ্রহণীয় হয়, কিন্তু অপর সবার মত গ্রহণোপযোগী হয় না।” আলোচ্য বিষয়ে ‘কিছু সংখ্যক’ বলতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষভাবে শিক্ষিত ও বিশেষজ্ঞজনকে নির্দেশ করা হচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট বিষয়টি এখানে সঙ্গত কারণেই বৃহৎ অর্থে লোকসংস্কৃতিবিদ্যা । আগেই সবিনয়ে স্বীকার করে নিচ্ছি আমি কোন লোক সংস্কৃতি বিষয়ক বিজ্ঞজন নই, আসলে ভীষণ অ-বিজ্ঞজন। আমাকে এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ ভেবে বসলে সত্যিকার অর্থেই অবিচার করা হবে। আর এখানে আমি চার জন কবিকে নিয়ে কোনও লম্বা ফিরিস্তি রচনা করতে প্রস্তুত নই। সে সাধ তো আমার নেইই সাধ্যও আমার নেই। কেবল রাধারমণকে নিয়ে একটু আমার সাধ্যমতো চর্বিতচর্বনে পারদর্শিতা অর্জনের চেষ্টা করবো এর বেশি কিছু নয়।
লোকসংস্কৃতি বিষয়ে যারাই একটু খোঁজ খবর রাখেন, তাদেরই জানা আছে যে, রাধারমণ সংগীত চর্চার পরিধি বিশাল। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় তো চর্চা হয়ই কম বেশি, তাছাড়া ত্রিপুরা আর আসামের অংশ বিশেষ বাংলাভাষী এলাকাগুলোতেও হয়। মোদ্দাকথা বাংলাভাষীদের বসতি যেখানে আছে সেখানেই লালন, হাছন, করিমের মতো রাধারমণও সুপারিচিত না হলেও পরিচিত কবি। তাঁর গান বিশেষ করে ধামাইল কম বেশী গীত হয়। যেখানে বাঙলি সনাতনধর্মী লোকজনের বাস সেখানেই মানুষের নিত্যদিনের যাপিতজীবনে রাধারমণ অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য।
সমাতনধর্মালম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে সঙ্গীত অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। সঙ্গীত না হলে এসব   অনুষ্ঠান পূর্ণ হয় না। সঙ্গীতের প্রয়োজনে সেসব অনুষ্ঠানে রাধারমণের গান অনিবার্য হয়ে উঠে। তবে সে ক্ষেত্রে তাঁর ধামাইল গান সবিশেষ সমাদৃত। এই গান (ধামাইল) বর্তমান সিলেট ও আসামের বরাক উপত্যকার লোকসমাজের প্রচলিত এক বিশেষ ধরণের ‘নৃত্যরীতি’ কারও কারও মতে। কিন্তু ধামাইলকে ‘নৃত্যরীতি’ না বলে ‘নৃত্যগীতি’ বা ‘গীতিনৃত্য’ বলাই সঙ্গত। তার ও চেয়ে বেশী যথাযথ হয় যদি বলা হয় ‘ধামাইল সঙ্গীত।’ যেহেতু ধামাইলে সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ গীত, বাদ্য, নৃত্য এই সবকয়টিই পরির্পূণভাবে বিদ্যমান। তা ছাড়া অন্য ধারার গানগুলোও কম বেশি সঙ্গীতের লক্ষণাক্রান্ত। সে সুবাদে ‘রাধারমণ গীতি’ না বলে তার গানের সমগ্রকে বলা উচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত ইত্যাদির মতো রাধারমণ সঙ্গীত। কেন না প্রায়শ দেখি সঙ্গীতমালা না বলে গীতিমালা বলা হচ্ছে। বইয়ের নাম রাখা হচ্ছে রাধারমণ গীতিমালা।
বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলেই ধামাইল সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ সৃজণক্ষেত্র। এখানকার লোক কবিরাই প্রচুর পরিমাণে ধামাইল রচনা করেছেন। এদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত সৃষ্টিপ্রতিভার দিক থেকে রাধারমণ অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেষ্ঠ ধামাইল স্রষ্টা। তাঁর ধামাইল গানের সংখ্যা কত আমার জানা নেই, যারা এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ তারা হয় তো জানেন, তবে আমি একটা বিষয় জানি, সেটা হলো ধামাইল ছাড়া রাধারমণ আর যত গানই রচনা করে থাকুন না কেন, তিনি কিন্তু ধামাইল গানের জন্যই বিখ্যাত ও সমাদৃত । বিশেষ করে বঙ্গ সমাজের সনাতন ধর্মী নারীমহলে। তাঁর নাম রাধারমণ না হয়ে রমণীরঞ্জন হলে মন্দ হতো না। শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির রূপরেখা বইয়ে শ্রীজ্যোতিরিন্দ্র নাথ চৌধুরী রাধারমণ সম্পর্কে লিখেছেন-“শ্রীহট্ট/কাছাড়ের নানা পারিবারিক উৎসব যেমন বিবাহ, অন্নপ্রাসন, সূর্যব্রত ইত্যাদিতে ধামাইল নৃত্যের তালে তালে মেয়েরা যাঁর গান বিশেষ প্রীতির সঙ্গে করে থাকে তাঁর নাম রাধারমণ। এই সুবাদে রাধারমণের অবিসংবাদিত পরিচয় তিনি লোককবি।” (শিলং ১৯৯৬, পৃ-২৬৩)
কবির এই ‘লোককবি’র সাহিত্য পরিচয় নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। লোক সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা আছে। তারই একটি রাধারমণ সঙ্গীত। ধামাইল রাধারমণসঙ্গীতের একটি অংশ। ধামাইল ছাড়া তিনি যা রচনা করেছেন, কেউ কেউ বলে থাকেন,‘প্রেমরসাপ্লুত বাউল সঙ্গীত’। কিন্তু সাহিত্য বিচারে কথিত বাউল সঙ্গীতগুলোকে কোনও কোনও বিশেষজ্ঞজন বাউলসঙ্গীত বলে স্বীকার করেন না। তারা এগুলোকে মধুর রসের পদাবলী বলে অভিহিত করেছেন। সুবীরচন্দ্র পাল বলেন-“রাধারমণ শুধু মধুর রসের পদাবলীর স্রষ্ট্রা। বৈষ্ণব্য সাহিত্যের আমরা শান্ত, সখ্য, দাস্য, বাৎসল্য ও মধুর রসের সন্ধান পাই।…..রাধারমনের পদগুলি শুধু উজ্জ্বল মধুর রসের দ্বারা ফুটিয়া উঠিয়াছে। ঈশ্বরের সহিত মিলিত হইবার গভীর আকুতি পদাবলীতে বিধৃত।” [সাধক কবি শিতালং শাহ, রাধারমণ, হাছন রাজা (প্রবন্ধ) মাসিক জালালাবাদ, ফাল্গুন ১৩৭২, পৃ-১-২]। এই দিক থেকে বিবেচনায় রাধারমণের রচনা বাংলা ভাবসঙ্গীতের অন্তর্গত তো বটেই, সেই সঙ্গে মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলীর সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই সুবাদে রাধারমণ যেমন লোককবি, তেমনি বৈষ্ণব ভাবধারার সঙ্গীতের সার্থক ¯্রষ্ট্রা। ‘দার্শনিকের দেশ সিলেট’ প্রবন্ধে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেছেনÑ“সাধারণ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকেরা ভগবানের প্রেমে বিভোর হয়ে তাদের ভগবানের কাছে নিবেদন করেন। ভক্তের গরজেই সে ভগবানের জন্য আকুল হয়Ñএই তত্ত্বজ্ঞানীর কাব্যে ভগবানও ভক্তের প্রেমে ব্যাকুল হন। তাঁর নানা গানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকার প্রেমে ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছেন।” [জালালাবাদ এসোসিয়েশন বার্ষিকী, ১৯৯৩-৯৪, ঢাকা, পৃ-২৩]
লোককবিদের নিয়ে অতিমাত্রায় যথাসম্ভব সমীক্ষা গবেষণা পরিচালনা করা বর্তমানে জরুরী হয়ে উঠেছে। হাছনরাজা ও আব্দুল করিমকে নিয়ে যৎসামান্য গবেষণা কর্ম হলেও রাধারমণকে নিয়ে তেমন একটা কিছু হয়েছে বলে এখনো জানা যায় না। ফলে রাধারমণের সত্যিকার সাহিত্যিক পরিচয়টি কী সে বিষয়ে পরষ্পর বিরোধী মত প্রচলিত হয়ে আছে। তাঁকে যিনি লোককবি বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তিনিই আবার তাকে বাউল বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অথচ বাউল তো তাত্ত্বিক স্বীকৃতি অনুসারে লোক কবিদেরই অন্তর্গত। লোককবিদের নিয়ে যেখানে ব্যাপক গবেষণাকর্ম পরিচালনা জরুরী, সেখানে তাঁদের সৃষ্টিসম্ভারকে পণ্য করে তোলে মুনাফা অর্জনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দেদারসে, অধিকমাত্রায়। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে যেভাবে কর্পোরেট বাণিজ্য শুরু হয়েছে রাধারমণকে নিয়ে সেটা এখনও শুরু হয়নি, হয় তো হয়ে যাবে। করিম ও হাছন রাজা যেভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতির বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়ে প্রসিদ্ধির পাদপ্রদীপের তলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন, রাধারমণকে সেই উজ্জ্বলতা এখনও ¯œাত করেনি। তিনি এখনও সনাতনধর্মী লোকসমাজের অঙ্গনাদের আঙ্গিনায় অধিষ্ঠিত হয়েই আছেন, বহাল তবিয়তে। পুঁজি এখনও তাঁকে যথাযথমাত্রায় মুনাফা অর্জনের পণ্য করে তোলতে পারেনি। তাই তার পরিচিতি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাজ্ঞজনের দরবারে যতটা বড় জায়গা জুড়ে আছে সনাতনধর্মী লোকসমাজের অঙ্গনাপ্রাঙ্গণ ব্যতীত অন্য জনসাধারণ্যে তাঁর পরিচিতি ততটাই সীমিত। অতি সম্প্রতি লোকোৎসবের বদৌলতে অবশ্য তাঁর পরিচিতির পরিসর ক্রমে প্রসারিত হচ্ছে।