রাধারমণ ও করিম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু

বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের লোক সংষ্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র গীতিকবি রাধারমণ দত্ত এবং অসংখ্য জনপ্রিয় বাউল গান ও গণসংগীতের রচয়িতা বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের সৃষ্টি রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাধারমণ দত্ত এবং শাহ্ আব্দুল করিম’এর নামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কাম লাইব্রেরি নির্মাণের জন্য জমি নির্ধারণের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে- মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের গৃহীত দুটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাধারমণ দত্ত এবং শাহ্ আব্দুল করিম’এর নামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কাম লাইব্রেরী নির্মাণের জন্য ৬০ (ষাট) শতাংশ জমি প্রয়োজন। স্টেকহোল্ডারদের মতামতের আলোকে স্থান নির্বাচন এবং স্থাপনা নির্মাণের জন্য ৬০ শতাংশ জমি প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জমি নির্ধারণ পূর্বক জমির মূল্যমান সম্পর্কিত তথ্য ডিপিপিতে সংযোজন করার বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা রয়েছে।
এই চিঠির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সম্প্রতি জমি নির্বাচনের জন্য চিঠি পাঠান।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ্ বলেন, ‘খাস খতিয়ানের ক’ তফশিলভুক্ত ৬০ শতক জমি বাছাই করে অবৈধ দখলদারদের
উচ্ছেদ করা হয়েছে। জমি নির্ধারণের সকল কাগজপত্র গত ২২ জুন জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’ তিনি জানান, জগন্নাথপুর-রসুলগঞ্জ সড়কের কেশবপুর বাজারের পাশে এবং জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজের উল্টোদিকের ৬০ শতক জমি বাছাই করা হয়েছে।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন,‘দিরাই-সুনামগঞ্জ সড়কের দিরাই পৌরসভার ভেতরের ফায়ার সার্ভিস অফিস সংলগ্ন ৬০ শতক জমি শাহ্ আব্দুল করিম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কাম লাইব্রেরির জন্য বাছাই করা হয়েছে। জমির মালিকদের সঙ্গেও এ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। গত সপ্তাহে জমি নির্ধারণের এই চিঠি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাবেরা আক্তার বলেন,‘জমি বাছাই করার কাজ সম্পন্ন করে দ্রুত চিঠি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর কাজ করছি আমরা’।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন,‘মরমি কবি রাধারমণ দত্ত ও একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল শাহ্ আব্দুল করিম বাংলাভাষি মানুষের কাছে জনপ্রিয়, তারা কেবল সুনামগঞ্জবাসীর নয়, প্রত্যেক বাঙালি’র কাছেই নিজের সৃষ্টিকর্মের জন্যই চীরঞ্জিব হয়ে আছেন, থাকবেন। আমরা এই দুই লোক কবির নামে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কাম লাইব্রেরি নির্মাণ করতে চাই। এজন্য কাজ শুরু হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে যা করণিয় আমরা দ্রুতই তা করে দেব।’
প্রসঙ্গত. ১৮৩৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা সদরের কেশবপুর গ্রামে মরমি সাধক রাধারমণ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবে প্রচুর ধন সম্পত্তির মালিক রাধারমণ দত্ত জীবনে কখনও এসবের প্রতি খেয়াল দেননি। ঘরবাড়ি ফেলে তিনি নলুয়ার হাওরে আশ্রম স্থাপন করে গান রচনা করতেন, আর গাইতেন, শুনে শুনে ভক্তরা তা মুখস্থ রাখতেন। জীবদ্দশায় তিনি তিন হাজারেও বেশী গান রচনা করেছেন। সংরক্ষণের অভাবে তাঁর অনেক গান হারিয়েছে। এ পর্যন্ত রাধারমণের সংরক্ষিত গানের সংখ্যা এক হাজার পঞ্চাশ। রাধারমণ অনুরাগীদের বিশ্বাস এখনও খুঁজ করলে রাধারমণ দত্তের অপ্রকাশিত গান বের হবে। ১৮৯১ সালে ৮৩ বছরে বয়সে তিনি নিজ গৃহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই মরমি কবির প্রায় ৩০ একর ভূ-সম্পত্তি অর্পিত হয়ে আছে। এই সম্পদ কেউ বন্দোবস্ত, কেউবা জোর করেই অবৈধ দখলে রেখেছে।
অসংখ্য জনপ্রিয় বাউল গান ও গণসংগীতের রচয়িতা বাউল শাহ্ আব্দুল করিম। কিংবদন্তিতূল্য এই বাউল স্বশরীরে আমাদের মাঝে না থাকলেও তার গান ও সুরধারা কোটি কোটি তরুণসহ সকল স্তরের মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম মহান মুক্তিযুদ্ধে পথে পথে ঘুরে গানের মাধ্যমে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন, উজ্জীবীত করেছেন মানুষকে। ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই বাউল। সমাজ পরিবর্তনের স্বাপ্নিক বাউল ছিলেন শাহ্ আব্দুল করিম। আমৃত্যু তিনি উজানধল গ্রামেই ছিলেন। অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন তিনি। গানে-গানে অর্ধ শতাব্দিরও বেশী লড়াই করেছেন ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে। এজন্য মৌলবাদীদের দ্বারা নানা লাঞ্ছনারও শিকার হয়েছিলেন তিনি। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কোটি ভক্তকে ছেড়ে চলে যান এই বাউল।