জেসমিন আরা বেগম
আমি হলাম ফরমায়েসী লেখক। কেউ যদি অর্ডার করেন কোন বিষয়ের উপর একটু লিখতে তাহলে অনেক কষ্টে সৃষ্টে একেবারে শেষ দিনে কাগজ কলম নিয়ে বসি। কারণ আলসেমী। লেখার বিষয়ে আমার আলসেমী অপরিসীম। তারও কারণ আছে। আমার বাসায় এক দিগগজ লেখক আছেন। লিখার জন্যে উনার যে শ্রম তা দেখে আমি ভয় পাই। সবাই যদি লেখক হয়ে যাই তাহলে সংসার রসাতলে যাবে। আর চাকুরী করে এরকম শ্রম দেয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার পক্ষে তো নয়ই। এর মধ্যে আমার কাজ এমন যে প্রতি মাসে কয়েক শত পৃষ্ঠা এমন কিছু লিখতে হয় যার সাহিত্যাঙ্গণে বা সংবাদপত্র অঙ্গণে কোন মূল্য নেই। কিন্তু যতœকরে তা আমাকে লিখতে হয়। কিন্তু কিছু লিখতে পারার যে আনন্দ তা ফরমায়েসী লিখার পর তা ছাপা হলে অনেকের রিয়েকশন থেকে হৃদয়ঙ্গম করি। মাঝে মাঝে ফরমায়েস আসে মহিলা জজ এসোসিয়েশনের সম্মেলন থেকে বা জুডিশিয়াল এসোসিয়েশনের ম্যাগাজিনের জন্যে। সেখানে আইন বিষয়ক লিখা বা আইন অঙ্গন সম্পর্কিত গল্প লিখি। জজ সাহেবরা বলেন, ভালো হয়েছে ! ভালো হয়েছে। কিন্তু আমি জানি এটাকে লিখা বলে না। কাজেই আমি কখনও লেখক হবো না। সব মায়েদের স্বপ্ন থাকে সন্তানদের বিভিন্ন গুণের আঁধার করবেন। আমার মায়েরও ছিলো, ছোটবেলা আম্মা কাগজ কলম দিয়ে আমাদের সবাইকে বসিয়ে দিতেন, গল্প/কবিতা লিখার জন্যে। চেষ্টা করতাম, ফল স্বরূপ একুশে ফেব্রুয়ারির লিটল ম্যাগাজিনে মাঝে সাঝে কবিতা, গল্প ছাপা হয়েছে ১৯৭৪/৭৫ সালের দিকে। কিন্তু ১৯৭৭ এ কলেজে উঠে রামেন্দু স্যারের স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ পাঠের পর কবিতা লিখার সাহস জিরো হয়ে যায়। ওরে বাবারে এ যে অংক ! অংক আমি ভয় পাই। তবে কবিতা বলেন, গল্প বলেন গোগ্রাসে পড়ার অভ্যাস আমি কখনও ত্যাগ করতে পারি না, এজন্য আম্মার কাছে প্রচুর চড় খেয়েছি আর স্বামীর খেয়েছি বকা। আমার বই নিয়ে বসা দেখেলে ঘরের কর্তা ভয় পান। কিতাব নিয়ে বসে গেছো ?
সর্বনাশ ! এই রাখো! রাখো। আমার সামনে কিতাব নিবা না। আদেশ জারী হয়। কারণ আছে। আমি বই নিয়ে বসলে এক নি:শ্বাসে শেষ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই সেটা যতবড় বড় বই ই হউক না কেন। ছেলে বিছানা থেকে পড়ে কাঁদছে, আমি পড়ছি, আমার খবর নেই। রান্না পুড়ে গন্ধ বেরুচ্চে, আমার খবর নেই, উনি খুব জরুরী একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছেন আমি উ: আ করছি। মায়ের চড় আর স্বামীর বকায় তটস্ত হয়ে আমি বই পড়া কমিয়ে দিয়েছি। তবে এথনও কর্তা নতুন একটা বই নিয়ে বাসায় ঢুকলে আমি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করি। ছেলেমেয়ে, স্বামী সবার বকা খাই। আম্মু রাখো ! পরে পড়ো, এখন এই কাজ, ঔ কাজ, কাজেই আগের মতো পড়া আর হয় না। কাজেই পড়–য়া হওয়া লেখক হওয়া আমার হলো না। তবে ফরমায়েসী লিখা মাঝে সাঝে আবার আমাকে ঐ লাইনে যাওয়ার জন্যে উৎসাহিত করে।
সুনামগঞ্জের খবরের সম্পাদক পংকজ আমাকে ফোন করে তার পত্রিকার বর্ষপূর্তিতে একটা লিখা দেয়ার ফরমায়েস করেছে। আমি লেখক নই জেনেও তার এই অনুরোধ আমাকে উৎসাহিত করেছে, কারণ লেখাটা সুনামগঞ্জের পাঠকেরা পড়বে, যাদের মাঝে আমি বড় হয়েছি। যারা আমাকে ভালো-মন্দ মিলিয়ে ভালোবাসে। তাই শেষ সময় হলেও লেখাটা দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। কিন্তু কি লিখবো ? আমি পন্ডিত মানুষ না। লিখার হাত প্রখর না। সাবলীল না। তাই সংবাদপত্র সম্পর্কিত আমার কিছু স্মৃতি আছে তাই লিখার মনস্ত করলাম জানি ভালো হবে না, তবে এ জেনারেশনের বাচ্চারা পড়লে বুঝবে সংবাদপত্র পাঠের জন্য সুনামগঞ্জের মানুষ কতো আকুলী-বিকুলী করতো, কতো কষ্ট করে আজ সুনামগঞ্জে এতোগুলো সংবাদপত্র চলছে।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে সুনামগঞ্জে কোন দৈনিক পত্রিকা ছিলো না। ছিলো লিটল ম্যাগাজিন, ছাত্ররা চাঁদা তুলে বাড়ী, বাড়ী গিয়ে লেখা কালেকশন করে ম্যানুয়েল প্রেসে অক্ষর বসিয়ে সারা রাত জেগে যে লিটল ম্যাগাজিন বের কবতো, তা সবাই গোগ্রাসে গিলতো। এগুলো বেশীর ভাগ একুশে ফেব্রুয়ারী এবং স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা দিবসে বের হতো। যারা এগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকতো তারা নায়ক হয়ে যেতো। সবাই তাদের উৎসাহ দিতো। মুক্তিযুদ্ধের পর সম্ভবত: ‘বিন্দু বিন্দু রক্তে’ প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা সুন্দর ঝকঝকে কাগজে বের হতো। অনেক নব্য লেখক এখানে লেখা দিয়ে নিজেদের শানিত করতো। তাদের মধ্যে আজ অনেকে প্রতিষ্ঠিত লেখক।
সাপ্তাহিক ‘বিন্দুর বিন্দু রক্তে’ এর সঙ্গে এবং ‘সূর্যের দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক ছিলো। যেহেতু আমি স্মৃতি কথাই লিখছি, সেহেতু এই দুই পত্রিকার বিষয়ই লিখছি। আমার বাবা ছিলেন ‘দৈনিক নত্তবেলাল’ ও ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় মফস্বল প্রতিনিধি। ভাই/বোন জামাই গোলাম রব্বানী ছিলেন ‘বিন্দু বিন্দু রক্ত’ পত্রিকার সম্পাদক আর সূর্যের দেশ পত্রিকার স¤পাদক ছিলেন সু-সাহিত্যিক আবদুল হাই নানা। আমি এদের সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি গুলোই লিখার প্রয়াস নিয়েছি। কারণ মানুষ স্মৃতির মাঝেই বাঁচে।
আমার বাবার সাংবাদিকতা সম্মন্ধে আমার কোন স্মৃতি নেই। শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্র্রস্থে আমি জেনেছি তিনি দৈনিক নওবেলাল ও ইত্তেফাক পত্রিকার সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলেন এ সম্বন্ধে আমার আগ্রহও ছিলো না। কিন্তু প্রায় ২ বৎসর পূর্বে জগৎজ্যোতি পাঠাগারে মতিউর মামা ও সুখেন্দ সেন হারু মামা, বিশিষ্ট সাংবাদিক বর্ণাঢ্য সাংবাদিক জীবনের অধিকারী হাসান শাহরিয়ার সাহেবকে সম্বর্ন্ধনা দেন, যেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। আমাকে উপস্থিত দেখে তিনি বক্তৃতায় বলেন, ‘এখানে উপস্থিত জেসমিন আরা আজ আমাকে চিনে না, কিন্তু সে জানে না যে তার বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেখান থেকে আমার সাংবাদিকতা শুরু।’ তার এই বক্তব্যে আমি আবেগে আপ্লুত হই। সেই অনুষ্ঠানেই আমি উপলব্ধি করি, হ্যাঁ আমার বাবা সাংবাদিকতার কাজ করেছিলেন যে সম্মন্ধে আমার আগ্রহ থাকা উচিৎ ছিল।
সাপ্তাহিক বিন্দু বিন্দু রক্তে বের হয় ১৯৭২ সালে। পোস্ট অফিসের সামনে একটি দোকান ছিলো। বেশ বড়। সেখানে প্রেস ছিলো। সম্পাদক গোলাম রব্বানী। সহকারী সম্পাদক আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন। ১৯৭২ সালে আমি ফ্রক পড়ে হাফ প্যান্ট পড়ে সারা সুনামগঞ্জ চক্কর দিতাম সে কারণে ঐ অফিসে যেতাম। ঝকঝক, তক তকে অপূর্ব সুন্দর চেহারার আবু আলী মামা ঐ অফিস ঔজ্জলমন্ডিত করে রাখতেন এবং প্রেসের হরফগুলোতে হাত দিলে ধমক দিতেন। ঐ অফিসে আমি প্রথম টেলিফোন দেখি। কালো সেট ডায়ল করা লাগে। ফোনে কথা বলার আমার খুব শখ। আবু আলী মামাকে বল্লাম কথা বলার শখের কথা। মামা প্রথমে ধমক দিলেন, পরে এক্রাচেঞ্জে লাগিয়ে দিলেন। ওপ্রান্ত থেকে ”হ্যালো হ্যালো”—শব্দ দুটো আমার কানে মধু বর্ষণ করলো। আমার সেই সুমধুর ¯¥ৃতি আজও ভুলিনি। আমি যেনো রাজ্য জয় করেছি। ফোনে হ্যালো শুনেছি! বাসায় এসে সবাইকে ফোনে কথা বলার গল্প বলেছি। আজ কালকার যুগের শিশুরা এ লেখা পড়লে হাসবে। ফোনে কথা বলা আবার গৌরবের বিষয় নাকি?
হ্যাঁ বিন্দু বিন্দু রক্তে পত্রিকাটি আমার কাছে আরো একটি কারণে প্রণিধানযোগ্য। সেটা হলো দাদা (গোলাম রব্বানী) সম্পাদক হওয়ায় প্রচুর লেখা আসতো। আবু আলী মামা বহু লিখা বাতিল করতেন। সেই বাতিল লেখায় অপর পৃষ্ঠা সাদা থাকতো। সেই বাতিল লিখা সেলাই করে খাতার মতো বানিয়ে আমি রাফ অংক করতাম। কারণ রাফ অংক করার খাতা আমার ছিল না। দাদা ফেলে দেওয়া কাগজ গুলো আমাকে দিতেন। আমি খুশি হয়ে নিতাম। প্রায়ই বাতিল লিখাগুলো পড়তাম। সব লেখাই আমার ভালো লাগতো কেন যে আবু আলী মামা লিখা রিজেক্ট করেন ? আমার খারাপ লাগতো। আজ এতো অফুরন্ত কাগজের ভিড়ে আমি এখনও সাদা কাগজ পেলেই যতœ করে রাখি। মনে হয় হয়তো এখনও আমার মতো কেউ আছে যার অংক করার জন্য এই কাগজ দরকার।
বিন্দু বিন্দু রক্ত ঠিক কি কারণে বন্ধ হয় জানি না। তবে ঐ সময়ে প্রতি সপ্তাহে সুন্দর কড় কড়ে ঐ কাগজটা আমি যতœ করে পড়তাম।
সূর্যের দেশ পত্রিকার স¤পাদক আবদুল হাই নানা আমার মায়ের মামা হন। তিনি বাউলা কিসিমের পন্ডিত মানুষ ছিলেন। আমাকে ভালবাসতেন। তার কারন তিনি মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় এসে আমাদের ইংলিশ গ্রামার জিজ্ঞাসা করতেন। আমি চটপট উত্তর দিতাম। তিনি মাথায় হাত দিয়ে বলতেন ‘‘শান্তি তোমার মেয়ে তো খুব ভাল ছাত্রী, অনেক বড় হবে ’’… আমিও উনাকে পছন্দ করতাম। তাই সূর্যের দেশ পত্রিকার অফিসে জালালাবাদ হোটেলের পাশের একটি ঘরে আমি উনার সামনা সামনি বসে থাকতাম। বড় মামার বিয়ের উপহার ওখান থেকেই ছাপিয় ছিলাম। এই পত্রিকাও কিছু দিন চলার পর কেন যে বন্ধ হয়ে গেলো জানি না।
সংবাদপত্র বিষয়ক লিখতে গিয়ে সংবাদ পত্র পড়ার জন্যে সুনামগঞ্জের মানুষ কেমন পাগলামী করতো তার বর্ণনা দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না। আজকাল রাত ১২.০০ ঘটিকার পর ঙহষরহব এ সব পত্রিকা চলে আসতেছে। কত চ্যানেল, কত পত্রিকা কে কোনটা পড়বে কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু ২০০৮ সালের পূর্বেও তা ছিলো না। দাদা (গোলাম রব্বানী) ছিলেন পত্রিকা পাগল লোক। টেলিভিশনের সব খবর তার দেখা চাইই। আর সংবাদ পত্রিকা যার প্রতিনিধি তিনি ছিলেন। এ ছাড়াও দু/তিনটা পত্রিকা বাসায় রাখতেন। সেই পত্রিকা সুনামগঞ্জে আসতো ১২.৩০/১.০০ ঘটিকার মধ্যে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই শুরু হতো তার লোক পাঠানো। ‘‘এ্যাই আবদুর নুর বাবুর দোকানে যা, গিয়ে দেখ পত্রিকা এলো কিনা ?’’ সকাল ৯.০০ টা থেকে শুরু হতো লোক পাঠানোর, হাক ডাক এ্যাই পত্রিকা এখনও আসে নাই?’’ আবার যা। অথচ তিনি জানতেন, সময়ের আগে পত্রিকা আসবে না। কিন্তু পত্রিকা পড়ার জন্যে সে যে কি উচাটন অবস্থা ঘর বার, ঘর বার, আবদুর নুরকে হাক ডাক ! আমরা বিরক্ত হয়ে যেতাম। তৎপর যখন পত্রিকা আসতো নিজের রুমে বসে গোগ্রাসে পড়তেন। আমরা হাসা হাসি করতাম। আজ মাত্র ১০ বৎসর পেরিয়েছে। ঙহষরহব এ সব পত্রিকা যে কোন জায়গা থেকে পড়া যাচ্ছে। আমার আজ দাদাকে মনে পড়ছে।
আজ সুনামগঞ্জে ৪/৫ টা পত্রিকা স্বগৌরেেব চলছে। পংকজের ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ দেশে বিদেশ যাচ্ছে। আমাদের বাসায় অফিস থেকে তিনটা পত্রিকা দেয়া হয়। অফিসে আমি তিনটা পত্রিকা পাচ্ছি। ঙহষরহব এ অনেক পত্রিকা আছে। তবুও সুনামঞ্জের খবর ডাক মারফত পংকজ প্রতিদিন পাঠায়। আর সব পত্রিকা রেখে আমি ও আমার কর্তা সে পত্রিকাই হাতে নিই। যে প্রথম দেখে সে খাম খুলে। প্রতিটি হেডিং পড়া হয়ে যায় কারণ এই ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ সুনামগঞ্জের মানুষের হাসি কান্নার বার্তা নিয়ে এসেছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান সুন্দর সাফল্যমন্ডিত হউক। যুগ যুগ এই পত্রিকা স্বগৌরবে সুনামগঞ্জের মানুষের রাজনৈতিক ও মানসিক মনন সৃষ্টিতে আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করুক। কৃষক শ্রমিকের মেহনতি মানুষের হাসি কান্নার সাক্ষী হউক আজ এই কামনা করি।
লেখক : বিচারক, নারী ও শিশু নির্যতন ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা


