এনাম আহমদ
মুখ ভাত’ আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত দুটি শব্দ। তবে পৃথিবীর আবর্তনে, কালের বিবর্তনে তা আজ ‘হারানো দিনের গানের’ মতো। তবে হ্যাঁ, ‘মুখভাত’ এর মুখটা এখনও ঠিক আছে। তবে ভাতের স্থান দখল করে নিয়েছে বই। ‘বাঁধ’ আমাদের সকল ভাত খেয়ে ফেলেছে। সেটি একটি বিষয়, আমাদের তরুণদের জন্য খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়ে সবাই পড়ালেখায় মনযোগ দিয়ে ফেলেছে। বিষয়টি এমনও নয়। বিষয়টি হচ্ছে ‘মুখবই’। মানে হচ্ছে মুখ (ঋধপব) বই (ইড়ড়শ)। এক্ষেত্রে বয়সের তারুণ্য কোন ব্যাপারই না। মনের তারুণ্যই মূল উপজিব্য। আমাদের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মুখ এখন বই-এ।
ফেসবুক ব্যবহারের দিক দিয়ে ঢাকা শহর এখন পৃথিবীর মধ্যে ২য় স্থানে অবস্থান করছে। খুব শিগগিরই আমরা ১ম স্থান দখল করার গৌরব অর্জন করব, বা কে জানে সম্ভবত আমরা ১ম স্থানেই আছি। পরিসংখ্যান তো সব সময় সত্য কথা বলে না। ঢাকাবাসী এখন একটি পরিকল্পনা করতে পারেন! নিজেদের এমন একটি উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন যে ভবিষ্যতে আর কোন শহর আমাদের টপকে যাওয়ার দু:সাহস দেখাতে না পারে। সামাজিকতায় ঢাকা শহর বিশ্ব রেকর্ড করেছে। এই গর্ব আমরা রাখব কোথায়? পাশের বাড়িতে রাখা যেত কিন্তু পাশের বাড়ির কাউকে তো চিনি না! সামাজিক যোগাযোগ বলে কথা।
আমাদের ছোট শহরে পরিচিত সিনিয়রদের সবাই সম্মান করে। সামনা সামনি পারতো পক্ষে কেউ বেয়াদবী করে না। এই তারাই দেখা যায় কেউ কেউ সিনিয়রদের স্ট্যাটাসে বাজে মন্তব্য করতে পরোয়া করছে না। এতে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সিনিয়ররা হয়ে যাচ্ছেন অসহায়। ফেসবুকে নিয়মিত চলে ভুল তথ্যের আদান প্রদান। তরুণরা এতে বিভ্রান্ত হচ্ছে। ভুল তথ্যকে সঠিক মনে করছে। ফেসবুকে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ঘটনা ঘটছে সেটি হচ্ছে জাতি হিসেবে আমরা চরমপন্থার দিকে যাচ্ছি। কোন ব্যক্তি যে ধারা পছন্দ করে, তাদের ফ্রেন্ড লিস্টে এমন বন্ধু, সংস্থা ও সংগঠন থাকে। তারা তাদের ধ্যান-ধারণা, অনুভূতি লিখছে, শেয়ার করছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তা ক্রমে ক্রমে উগ্রতার দিকে যায়। প্রথম দিকে যার চিন্তা ভাবনা অপেক্ষাকৃত সহনশীল থাকে, উগ্র পোস্ট পড়ে পড়ে তাদের মানসিকতাও উগ্র হয়ে যায়। বিপরীত ধারার লোকজনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। ফলে দুটি বিপরীত ধারা সহনশীলতার মাত্রা অতিক্রম করে দুই মেরুতে অবস্থান করে। একে অন্যের প্রতি চরম ভাবাপন্ন থাকে, যা আমাদের হাজার বছরের সহ অবস্থান সংস্কৃতির পরিপন্থি। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে ফেস-বুক। সমাজে বাড়াচ্ছে অস্থিরতা। তরুণরা অন্তর্মুখি হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক আড্ডায় যোগ না দিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অসামাজিক যোগাযোগের সূচনা করছে। ফেসবুক পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না, সমীচিনও না। তবে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেয়া যেতে পারে। সেটি হচ্ছে ফেসবুক রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা যেতে পারে। এতে তরুণ ও বৃদ্ধ তরুণরা ইনসমনিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। রাত বিরাতে সম্ভব-অসম্ভব ছবি, স্ট্যাটাস, ক্যাকটাসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। রাতে সুনিদ্রার পর সকালে তরতাজা অনুভূতি নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে যেতে পারবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের হিসাবে বর্তমানে দেশে ২ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে।
সবকিছুরই ভাল মন্দ আছে। ফেসবুকেরও আছে। পুরাতন বন্ধুদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা যাচ্ছে। জরুরী প্রয়োজনে রক্ত সরবরাহের আহবানে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
কাউকে আটকে রাখা যাবে না। সেটা আমাদের উদ্দেশ্য হওয়াও উচিত না। তবে ভাল মন্দের পার্থক্য তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। নয় তো নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত তরুণদের আমরা আশাাদী করে তুলব কী করে?
লেখক : সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর ও আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।


