গণসংস্কৃতি চর্চার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ

সাম্প্রতিক সময়ে (বিশেষ করে গত কয়েক দিন যাবৎ) বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে গেল জেলা শহরে। সুনামগঞ্জ থিয়েটারের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হবিগঞ্জের জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠীর পরিবেশিত ‘জ্যোতিসংহিতা’ মঞ্চ নাটকটি দর্শকদের প্রভূত প্রশংসাধন্য হয়েছে। সোমবার জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনাটিও ছিল পরিচ্ছন্ন ও উন্নত মেজাজের। দর্শক-শ্রোতারা অনুষ্ঠান দুইটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমন মানসম্মত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জেলার সংস্কৃতি চর্চার বিকাশমান ধারাটি নিঃসন্দেহে আরও উন্নততর অবস্থায় পৌঁছাবে। সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে সমাজ প্রগতির রথে আরোহণ করে। মননশীলতার বিকাশ ঘটে। অতি অবশ্যই মানসিক উৎকর্ষতা সাধনের জন্য সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে সম্পর্কিত। মানুষ যেদিন থেকে সভ্যতার পথে যাত্রা শুরু করল সেদিন থেকেই মূলত মানুষের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার শুরু। সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে তার সাংস্কৃতিক দিকটিও পূর্ণতা পেতে শুরু করলো। বলা যেতে পারে সৃজনশীল মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন ও অনুপ্রেরণা তার সংস্কৃতি। মানবসভ্যতা বিকাশের এমন এক অনুষঙ্গ কখনও অবহেলার বিষয়বস্তু হতে পারে না। সেই বিবেচনায় সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক তৎপরতা প্রশংসার দাবিদার। আমরা তাদের প্রাণখোলা অভিনন্দন জানাই।
আমাদের প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সংস্কৃতির লক্ষ্য এবং এর উদ্দিষ্ট কারা? নিশ্চিতভাবেই এর উত্তর হবেÑ মানুষ। এই জায়গায় প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা যারা আজ সাংস্কৃতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছি, বিশেষ করে গণসংস্কৃতির, তারা বৃহৎসংখ্যক মানুষের কাছে কি পৌঁছাতে পারছি? মোটামুটি মধ্যবিত্ত সুরূচিসম্পন্ন মানুষজন নিজেদের পারিবারিক-ব্যক্তিক-প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে একটি সংস্কৃতির স্বাদ পাচ্ছে বটে কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কি এই সংস্কৃতির কাছে পৌঁছাতে পারছে। আজ যখন কোন সুসজ্জিত মঞ্চে সাংস্কৃতিক পরিবেশনাগুলো দর্শকনন্দিত হচ্ছে তখন এই মঞ্চের দর্শকসারিতে কি আম জনতার উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে ? নিশ্চয়ই তারা এসব অপূর্ব শিল্পসমৃদ্ধ পরিবেশনাগুলোর আস্বাদন থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। সংস্কৃতি যদি মননশীলতা বিকাশের উপকরণ হয়ে থাকে এবং দায়বদ্ধ সংস্কৃতিকর্মীরা যদি এই লক্ষ্য পূরণ করতে চান তাহলে অবশ্যই সংস্কৃতিকে নিয়ে যেতে হবে জনতার কাছে। অবশ্যই জনতার যে শিল্পমান তার ভিত্তিতে নির্মিত হতে হবে সেইসব শিল্পসম্ভার। গণনাটক, গণসঙ্গীত চর্চার ইতিহাস আমাদের এই ভূখ-ে কম নয়। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন বা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণার উন্মেষ, শোষণের বিরুদ্ধে চেতনাকে জাগ্রত করা, সর্বত্রই এই গণসংস্কৃতি চর্চার উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ। সেই গণসংস্কৃতি চর্চার ব্যাপকতা ঘটানো এই সময়ের অন্যতম প্রধান চাহিদা। মানুষের মননে প্রগতির পরিবর্তে রুদ্ধতা, সাহসের পরিবর্তে নির্জীবতা, সবকিছুকে সয়ে নেওয়ার মানসিকতা, আমাদের প্রিয় স্বদেশকে ঘিরে ধরেছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই ভূখন্ডে আজ মানুষ ক্রমশ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অন্ধ বলয় গড়ে তুলছে। এমন অবস্থায় গণসংস্কৃতি হতে পারত একটি উপযুক্ত উপায় যা মানুষকে আবারও বিকাশমান ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারে। এজন্যই সংস্কৃতি চর্চাকে নিয়ে যেতে হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায়।  
সংস্কৃতিকর্মীরা জনগোষ্ঠীর অগ্রসর অংশ। তারা সমাজের রূচি ও মানসিকতা বিনির্মাণ করতে সহায়তা করেন। অবশ্যই সমাজের চেহারাটি কেমন হবে তা ফুটে উঠে সংস্কৃতির আয়নায়। সুতরাং সংস্কৃতিকর্মীদের রয়েছে ব্যাপক সামাজিক দায়। এই দায়বোধ থেকে তাদেরকে অবশ্যই মানুষের হৃদয়ের ভিতরে পৌঁছে যেতে হবে। নাগরিক সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি এই বিষয়টি বিবেচনা করলে সমাজের লাভ। একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ার জায়গায় সংস্কৃতিকর্মীদের নিকট এই আমাদের প্রত্যাশা।