শীলা রায়
যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
শোকাবহ আগস্ট মাস। ৪২ বছর আগে আগস্ট এর ১৫ তারিখে এ দেশেরই একদল উচ্ছৃঙ্খল স্বার্থান্বেষী সেনাসদস্য নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করেছিল বিশে^র অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, রূপকার, প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এ মাস শুধুই শোকের মাস নয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করে আত্মপ্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার শপথ নেওয়ার মাস। আমি জাতির জনকের পরিবারসহ স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন নিয়ে লিখার দুঃসাহস আমার নেই। আমি কাছে থেকে তাঁকে যতটুকু দেখেছি, তাঁর কথা শুনেছি, পরম শ্রদ্ধাভরে তারই স্মৃতিচারণ করছি।
১৯৭৪ সনের মে মাস। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির জাতীয় সম্মেলন, অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা কলেজে। ময়মনসিংহ থেকে এক বিশাল প্রতিনিধিদল আমরা সম্মেলনে যোগ দিতে গেলাম। শুনেছিলাম, আমাদের সম্মেলনে প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা তো খুব উল্লসিত। কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখব, তার উদাত্ত ভাষণ শুনব। কিন্তু ঢাকায় এসে শুনলাম, যেহেতু শিক্ষক সমিতি দুইভাগ হয়ে গেছে এবং একই দিনে দুই জায়গায় সম্মেলন হচ্ছে, তাই তিনি না এসে জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবকে আমাদের সম্মেলনে পাঠালেন। সম্মেলনের শেষ দিন ময়মনসিংহ জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দীন সাহেব এসে আমাকে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের নূতন কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একশত প্রতিনিধিকে বিকাল পাঁচটায় গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমাদের জেলা থেকে শিক্ষক নেত্রী হিসাবে আপনি অন্তর্ভুক্ত’। মনটা আনন্দে ভরে উঠল। যথাসময়ে আমরা রওনা হলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন পাবনার শিক্ষক নেত্রী মীরা রায়, বরিশালের নেত্রী সুফিয়া ইসলাম। গণভবনে ঢুকে আমি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, হঠাৎ আমাকে কে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘তোমার সামনে তো বঙ্গবন্ধু।’ চেয়ে দেখি, বঙ্গবন্ধু আমাদের শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডেন্ট মো. কামরুজ্জামান সাহেবকে জড়িয়ে ধরে বলছেন, ‘কামরুজ্জামান তোমার কমিটি কেমন হলো ?’ কামরুজ্জামান সাহেব উত্তর দিলেন, ‘ভালই হয়েছে।’ আমি বসলাম একবারে বঙ্গবন্ধুর ডান পাশের সোফায়। আমাদের সামনে বসেছিলেন ভারতীয় ও বিদেশী প্রতিনিধিবৃন্দ। আবেগে উচ্ছ্বাসে বঙ্গবন্ধু বলে চলেছেন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ায় তার স্বপ্নের কথা। ঘরের জিনিসগুলো দেখিয়ে বলছেন ‘এগুলো সব আমার নিজের দেশের সম্পদ দিয়ে তৈরী। আমার দেশের যে সম্পদ আছে, তাই আমাদের যথেষ্ট।’ জিনিসগুলো হচ্ছে বাঁশের তৈরী ফ্যান-স্ট্যান্ড, কাঠের তৈরী চেয়ার-টেবিল, এ্যাসট্রে ইত্যাদি। কথা শুনতে শুনতে ভারতীয় দলের প্রতিনিধি পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক ইলা মিত্র (নাচোল সাঁওতাল বিদ্রোহের নেত্রী) বললেন, ‘দাদা, আপনি একটু ইংরেজীতে বলুন। ওরা সবাই তো বাংলা বুঝে না।’ বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ ইংরেজীতে বলেই আবার বাংলায় বলা শুরু করলেন। আমরা অভিভূত হয়ে তার দেশ গড়ার কথা শুনেছিলাম। এর মধ্যে বললেন, ‘চলুন চা খাওয়া যাক।’ আমাদেরকে নিয়ে গেলেন হলরুমে। টেবিলের উপর সাজানো ছিল সিঙাড়া, বিস্কুট, চা। সে সময় একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল, বঙ্গবন্ধুর গণভবনের সিঙাড়া ও দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধীর জিলাপী, মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। আমরা চা খাচ্ছিলাম, তিনি ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। তারপর বিদায়ের পালা। তিনি আমাদের বিদায় দিতে গেইট পর্যন্ত আসলেন। আমি পাশে পাশে হাঁটছিলাম। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেনÑ আবেগাপ্লুত কন্ঠে বললেন, ‘এই যে দেখছেন দেয়ালের পাশে লাগানো কৃষ্ণচূড়ার চারাগুলো, এগুলো যখন বড় হবে, ফুল ফুটবে, চারদিক লালে লাল হয়ে যাবে।’ কিছুক্ষণ ঐ দিকেই তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ চমক ভাঙল। আমরা বিদায় নিলাম। গাড়িতে উঠে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, ধীরপায়ে বঙ্গবন্ধু ফিরে যাচ্ছেন গণভবনের দিকে।
বরুণ রায় প্রায় সময়েই বঙ্গবন্ধুর কথা বলতেন। অনেকদিন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে একত্রে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে নাম ধরে ডাকতেন, খুব ¯েœহ করতেন। বরুণ রায় বলতেন, ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, এক বিশাল উদার হৃদয়ের অধিকারী। কোন সমস্যা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বলে উঠতেন, বরুণ একটা গান শোনা’, এমনই অনেক স্মৃতি।
এবার বঙ্গবন্ধু পরিবারের স্মৃতি। তা না বললে তো স্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭৫ এর জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। বিয়ের পর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘনিষ্ঠজন জনাব আবদুস সামাদ আজাদ সাহেবের আমন্ত্রণে তার বাড়ি গিয়েছি। কথা হলো বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যাওয়ার । সামাদ সাহেব বললেন, ‘এখন তো বঙ্গবন্ধু বাড়িতে নেই, তা ছাড়া খুবই ব্যস্ত। পরে সুবিধামত যাওয়া যাবে।’ তিনি বরুণ রায়কে বললেন, ‘আপনি এখানে বিশ্রাম করুন, আপনার ভাবী বৌদিকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘুরে পরিচয় করিয়ে নিয়ে আসুক।’ প্রথমে আমরা প্রধানমন্ত্রী জনাব এম. মনসুর আলী সাহেবের বাড়ি গেলাম। সেখান থেকে ৩২ নং ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাড়িÑ কোন প্রটোকল নেই, শুধু দু’জন পুলিশ সামনে বসে আছে। পরিচয় দিয়ে আমরা উঠে গেলাম দোতলায়। বাড়িতে নেই কোন দামী আসবাপত্র, নেই কোন সাজসজ্জা। শেখ রেহানা এগিয়ে এল। আমরা হলরুমে সোফায় বসলাম। হঠাৎ দেখি, আটপৌরে শাড়ীপরা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী সেই মহীয়সী নারী, বেগম ফজিলাতুন্নেছা, যিনি বঙ্গবন্ধুর কর্মময় জীবনে যুগিয়েছেন প্রেরণা, দিয়েছেন সময়োপযোগী নির্দেশনা। মনে পড়লো কবি নজরুলের কবিতার দু’টো লাইনÑ
কোনকালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়ীলক্ষ্মী নারী।
ভাবী আমার পরিচয় নিলেন। তারা কথা বলছিলেন, আমি শুনেছিলাম আর চারদিক দেখছিলাম। ছোট রাসেল তার সাইকেলটি নিয়ে হলজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল, বড় হলে সে দেখতে অবিকল বঙ্গবন্ধুর মত হবে। দেখা যাচ্ছিল শেখ কামালকে Ñ তার ঘরে বসে কারও সাথে আলাপ করতে। রেহানা বলল, ক’দিন পরই তো কামালের বিয়ে, তাই সুলতানার ভাবী এসেছে দেখা করতে। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে পরিতৃপ্ত মনে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
এর দেড়মাস পরই ঘটলো সেই ভয়াবহ ঘটনা। হারালাম পরিবারসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে। বিদেশে থাকায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা । বিয়াল্লিশ বছরে অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনায় উন্নয়নের ধারায় ‘রোল মডেল’ হতে চলছে। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ হয়ে উঠুক সকল প্রকার নির্যাতন, সহিংসতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক মানবিক কল্যাণসমৃদ্ধ দেশÑ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখা এক কবির কবিতার ক’টি লাইনের মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যে দিয়েই শেষ হচ্ছে এ স্মৃতিচারণ।
‘গণমানুষের তুমি পরমাত্মীয়
সর্বহারা নেতা অদ্বিতীয়
বাংলাদেশের স্থপতি তুমি
জাতির জনক চিরঞ্জীব।’ জয়তু বঙ্গবন্ধু
জয় হোক বাংলাদেশের।
লেখক : সভাপতি, সুনামগঞ্জ জেলা উদীচী।


