কুরবানী : সুন্নতে ইবরাহীমী

মাহবুবুল হক সালমান
কুরবানী আরবী শব্দ, কুরবুন ধাতু থেকে নির্গত। কুরবানীর শাব্দিক অর্থ হল নৈকট্য , ত্যাগ , বিসর্জন , উৎসর্গ ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত যে কোন সময় নির্দিষ্ট হালাল পশু যথানিয়মে জবেহ করাকে কুরবানী বলে।
কুরবানীর ঐতিহ্য শুরু হয়েছে হযরত আদম আ. এর যুগ থেকেই। তবে তখনকার কুরবানী আর বর্তমান কুরবানীর মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। তাদের কুরবানীর জন্য কোন সময় নির্দিষ্ট ছিল না। আগে কুরবানীর নিয়ম ছিল তারা যে বস্তু বা জন্তু কুরবানী করবে তা পাহাড়ের উপর রেখে আসবে। যার কুরবানী কবুল হবে তার রেখে যাওয়া বস্তু বা জন্তু আগুনে গ্রাস করে ফেলবে। হযরত আদম আ. এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মধ্যে যখন কাবিলের সহজাত সহোদরা পরমা সুন্দরী আকলিমাকে বিয়ে করা নিয়ে ঝগড়া বেঁধেছিল। তা নিরসনের জন্য আল্লাহর হুকুম পেয়ে আদম আ. তখন তাদেরকে কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যার কুরবানী কবুল হবে সেই আকলিমাকে বিবাহ করবে।
হাবিল যেহেতু পশু লালন পালন করতো তাই সে তার পিতার নির্দেশ পেয়ে তার গৃহপালিত পশু কুরবানী করেছিল এবং কাবিল যেহেতু শষ্য ইত্যাদি উৎপাদন করতো তাই সে শষ্যাদি কুরবানী করেছিল। হাবিল তৎকালীন শরীয়ত মোতাবেক তার দাবিতে ছিল সত্য তাই তার কুরবানী কবুল করা হয়েছিল। আর কাবিল ছিল তার দাবিতে মিথ্যা এবং পিতার অবাধ্য তাই তার কুরবানী কবুল করা হয়নি। এদিকে ইঙ্গিত করেই পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে ‘‘যখন তারা উভয়েই কিছু উৎসর্গ নিবেদন করেছিল , তখন তাদের একজনের উৎসর্গ গৃহিত হয়েছিল , অপরজনের গৃহিত হয়নি। সে বলল আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বলল আল্লাহ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন।’’
কিন্তু আমরা যে কুরবানী করি তার উৎসমূলে রয়েছে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে হযরত ইবরাহীম আ. কর্তৃক তদীয় প্রাণপ্রিয় আত্মজ , নির্ঘুম কান্নার ফসল শিশুপুত্র ইসমাঈল আ. কে কুরবানী করার ঘটনা। ইবরাহীম আ. যখন যৌবনের সবুজ প্রাঙ্গন অতিক্রান্ত করে বার্ধক্যের ধূসর ময়দানে উপনীত, তখন তিনি অবসান ঘটাতে চাইলেন সন্তানহীন জীবনের। গুচাতে চাইলেন সন্তানের অভাব। আবেগ মথিত কন্ঠে বলে উঠলেন, “রাব্বি হাবলী মিনাস সালিহীন”। ইবরাহীম আ. এর দোয়া আকাশে উত্তাল তরঙ্গের সৃষ্টি করল। কাঁপতে লাগলো আকাশের ছতুন। আল্লাহ  খলীলুল্লাহ উপাধীতে ভূষিত হযরত ইবরাহীম আ. এর এই দোয়াকে ফেরত দিলেন না। সু-সংবাদ দিলেন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের।           
এদিকে লক্ষ্য করেই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে “অর্থ্যাৎ আমি তাঁকে ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।”
অতঃপর জীবনের সন্ধ্যালগ্নে নবী ইবরাহীম আ. এর ঘর আলোকিত করে আগমন করলেন শিশুপুত্র ইসমাঈল আ.। ভালোবাসতে লাগলেন তনুমন উজাড় করে। ইসমাঈল আ. ও বেড়ে উঠতে লাগলেন পিতা মাতার ¯েœহের পরশে। ভালোবাসা যখন ষোলকলায় পূর্ণ হবার দোরগোড়ায় তখনই স্বপ্নে নির্দেশ এলো ইসমাঈলকে আমার নামে কুরবানী দাও।
অথচ যাকে পেতে কত রজনীই না নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে। দোয়ায় বসে কেঁদে কেঁদে জায়নামাজ ভেজাতে হয়েছে। বইয়ে দিতে হয়েছে অশ্রুধারা । আর আজ কি না পিতা হয়ে তাকেই নিজ হাতে কুরবানী করার নির্দেশ এসেছে। হযরত ইবরাহীম আ. বিষয়টা নিছক স্বপ্ন বলেই উড়িয়ে দিতে পারতেন । কিন্তু তিনি তো আল্লাহর বন্ধু , খলীলুল্লাহ। আল্লাহর নির্দেশ তাকে বাস্তবায়ন করতেই হবে। চাই সে আদেশ স্বপ্নে হোক কি বাস্তবে। কিন্তু ইসমাঈল ! সে কি মেনে নিবে ? সে কি খোদার রাহে জীবন বিলাতে রাজী হবে ? সে কি তার পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সুযোগ দিবে ? জানতে চাইলেন হযরত ইবরাহীম খলিলুল্লাহ। কথায় আছে বাপে বেটা , গাছে গোটা। ইসমাঈল ! তিনিতো ইবরাহিমেরই আ. পুত্র ;ইবরাহিমের সুযোগ্য উত্তরসূরী। পিতার নবুওয়্যাতের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী । পিতার প্রশ্নের জবাবে দীপ্ত কন্ঠে জবাব দিলেন , “আব্বু আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আপনি তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ ! আমাকে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।
শিশু ইসমাঈল আ. এর জবাব শুনে ইবরাহীম আ. আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তাকে কুরবানী করার জন্য নিয়ে চললেন। হাত-পা বেঁধে শুইয়ে দিলেন মাটিতে। ধারালো ছুরি চালাতে লাগলেন পুত্রের গলায়। কিন্তু ছুরি গলা কাটবে তো দূরের কথা দাগও বসাতে পারেনি। ইবরাহীম আ. ছুরিতে ধার কম দেয়া হয়েছে মনে করে ছুড়ে ফেললেন পাথরের উপর । ছুরির আঘাতে পাথর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ইবরাহীম আ. আবারো ছুরি চালালেন পুত্রের গলায়, তখনই গায়েব থেকে আওয়াজ আসলো ইবরাহীম ! তুমি পরীক্ষায় সফল হয়ে গেছো। পুত্রকে ছেড়ে দাও। পুত্রের বদলে দুম্বা কুরবানী করো। ইবরাহীম আ. দুম্বা কুরবানী করে আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। পিতা-পুত্রের এই আত্মত্যাগের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা পরবর্তীতে তা উম্মতে মুহাম্মদীর উপর ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাইতো সাহাবায়ে কেরাম যখন রাসূলে আরাবী সা.কে জিজ্ঞেস করেছিলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরবানী কী? তখন মুহাম্মদে আরাবী সা.-এর কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছিল“ইহা তোমাদের পিতা ইবরাহীম আ.-এর সুন্নত [আদর্শ]। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন- এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে? হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল সা.বললেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে নেকী।
উপরোক্ত হাদীসে খুব স্পষ্টভাবেই বর্ণনা রয়েছে যে, কুরবানী ইবরাহীম আ.এর আদর্শ বা সুন্নত। সাথে সাথে রয়েছে এর বিস্ময়কর ফযীলতের বর্ণনাও। এক একটি পশমের বদলে এক একটি নেকী। এ কথাটিই যে কোন কুরবানীদাতা বিশ্বাসী মু’মিনের অন্তরে জাগায় প্রেমের তুফান, ভাবের তরঙ্গ। অনুপ্রাণিত করে কুরবানীর প্রতি।
কিন্তু কেন? সাধারণ একটা পশু কুরবানীর মধ্যে কেন এই বিস্ময়কর ফযীলত। রহস্য উদঘাটন করতে হলে আমাদেরকে এর উৎসমূলে প্রবেশ করতে হবে। কারণ এর উৎসমূলে রয়েছে এলাহী প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে পিতা কর্তৃক প্রাণপ্রিয় আত্মজতে কুরবানী করা এবং আল্লাহ নির্দেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শণ করে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর ঘটনা। আমাদের কুরবানী বাহ্যিকভাবে পশু কুরবানী হলেও তা মূলত পুত্র বিসর্জনেরই নামান্তর।
কিন্তু এ ফযীলত অর্জন করতে হলে আমাদের কুরবানীতে থাকতে হবে ইবরাহীমী প্রেমের পরশ এবং ইসমাঈলী ত্যাগের আভা। থাকতে হবে নিয়তের পরিশুদ্ধতা, তাক্বওয়ার পরিপক্ষতা। মনে প্রাণে সপে দিতে হবে খোদার রাহে। ছেড়ে দিতে হবে লোক দেখানো ও নাম ফুটানোর হীন উদ্দেশ্য। কারণ আল্লাহ কাছে শুধু আমাদের বাহ্যিক অবস্থাই পৌছায়না বরং মনের অবস্থা ও তাক্বওয়া পৌছবে। তাইতো কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
“ আল্লাহর নিকট তোমাদের কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত পৌছেনা বরং তোমাদের তাক্বওয়া পৌছে।”
পাঠক! তাই আসুন আমরা ইবরাহীমী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, ইসমাঈলী ত্যাগের বিভায়স উদ্ভাসিত হয়ে কুরবানী করি। কুরবানীর মাধ্যমে আত্মাকে করে তুলি প্রোজ্জল ও পরিশুদ্ধ। অপকট মনে সামর্থানুযায়ী উৎকৃষ্ট পশু কুরবানী করি। যাতে পশুটি হতে পারে পরকালে আমাদের মুক্তির বাহন। কুরবানীর মাধ্যমে সকল বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তি ও সমষ্টির আপন আপন অন্তরকে প্রভূর নৈকট্য লাভের মহিমায় প্রাণবন্ত করে তুলি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন!!
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া দারুল কুরআন সিলেট।