সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর সুনামগঞ্জ

হাসান শাহরিয়ার
আমার জন্মশহর সুনামগঞ্জ। অনতিদূরেই সীমান্ত। ওপারে খাসিয়া পাহাড় ও ভারত। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে ঢেলে সাজিয়েছে এই অঞ্চলটিকে। খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে ¯্রােতস্বিনী যাদুকাটা নদীর তীরে লাউড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য পর্যটককে মুগ্ধ করে, বার বার আসার তাগিদ দেয়। আমাদের ছেলেবেলায় অবহেলিত এই প্রান্তিক শহর বা ‘ভিলেজ টাউনে’ আধুনিক সভ্যতার তেমন ছোঁয়া লাগেনি। বৈদ্যুতিক বাতি ছিল না, পাখা ছিল না, ছিল না এসি, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভেন, গিজার বা ওয়াশিং মেশিন। রিকশাই যেখানে ছিল না সেখানে প্রাইভেট কার আসবে কোত্থেকে ? এখন বাড়ির ঝি থেকে শুরু করে সবার হাতেই মোবাইল ফোন। তখন টেলিফোনই ছিল না। কিন্তু যা ছিল তা নিয়ে এই শেষ বয়সেও আমি গর্ব বোধ করি। দেশের অন্য কোথাও ছিল কি না জানি না, তবে ছায়াঢাকা, কোলাহলমুক্ত ও ছবির মতো সুন্দর আমার জন্মস্থানে ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। জন্মেছিলাম ব্রিটিশ ভারতে, বড় হয়েছি পাকিস্তানে, কর্মজীবন শেষ করে অবসরের দিনগুলো কাটাচ্ছি বাংলাদেশে। তিন দেশের নাগরিকত্ব ! অনেকেই ভয় পেয়েছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিন্তানে বুঝি বা হিন্দুরা থাকতেই পারবে না। বৃহত্তর সিলেটের বাইরে অন্যান্য জেলায় তাদের প্রতি কিছুটা অবিচার যে হয়নি তা নয়, তবে সুনামগঞ্জ তথা সিলেট জেলা ছিল ব্যতিক্রম। সৌজন্য ও সৌহার্দ্যরে খাতিরে  আগে যেমন মুসলমানেরা হিন্দুদের পূজাম-পে যেতেন, এখনও সেই ট্রাডিশন অব্যাহত আছে। ঠিক তেমনি ঈদের সময় মুসলমানদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন হিন্দুরা। ঈদের নামাজ শেষ হলে প্রাক্তন মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাশ        
এইচ এম পি হাইস্কুলের কাছে দাঁড়িয়ে সকলকে ‘ঈদ মোবারক’ বলতেন। রায়বাহাদুর অমরনাথ রায়ের ভাই আইনজীবী জিতেন্দ্রনাথ রায় (চারুবাবু) তো শহরের কোনো কোনো মিলাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতাই দিতেন। বিবাহ অনুষ্ঠানে উভয় ধর্মের লোকজন উপস্থিত থাকতেন। লাউড়ে আমার পিতৃপুরুষের গ্রাম বিন্নাকুলির অদূরেই যাদুকাটা নদীর তীরে রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থকেন্দ্র শ্রী শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর আশ্রম। পাশেই বাংলাদেশÑভারত সীমান্তের ওপারে খাসিয়া পাহাড়ে হয়রত শাহজালাল (র.)Ñএর অন্যতম সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিন (র.)Ñএর মোকাম। প্রতি বছর মোকামে উরস হয় এবং নদীর তীরে বসে পণাতীর্থ বা বারুণির মেলা। দুই ধর্মের অগণিত ভক্তের পদভারে মুখরিত হয় নদীর উভয় তীর। পড়ন্ত বেলায় অস্তগামী সূর্যকিরণ যখন যাদুকাটার নীলাভ পানিতে বিচ্ছুরিত হয়, তখন এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আজ অবধি সুনামগঞ্জ শহর বা জেলার হিন্দুÑমুসলমানের প্রীতির সম্পর্কে ছেদ পড়েনি।
হিন্দুদের বার মাসে তের পার্বন। ফুল ছাড়া তাদের পূজা হয় না। কিন্তু আমাদের বাল্যকালে শহরে নার্সারি বা ফুলের দোকান ছিল না। শেষ রাতে ফুল চুরি করতে বাড়ি বাড়ি হানা দিত হিন্দু ছেলেমেয়েরা। তাদের কাছে কোনো বাছবিচার ছিল না। ফুলের বাগানের বাড়িই ছিল তাদের টার্গেট। বাড়ির মালিক হিন্দু না মুসলমান তা তাদের ভাবনার বিষয়ও ছিল না। আর থাকবেই বা কেন ? আপত্তি তো দূরের কথা, কোনো মুসলমান বাড়ির মালিক বা তার লোকেরা কোনোদিন হিন্দু ছেলেমেয়েদের ফুল চুরির অপবাদও দেননি। এই দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। পূজার ফুল আসে নার্সারি থেকে এবং অনেকের ফুলের বাগানে গড়ে উঠেছে বহুতলবিশিষ্ট ইমারত।
হিন্দু ছাত্রছাত্রীরা জাঁকজমকের সঙ্গে সরস্বতী পূজা পালন করতো। এই পূজা হত স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন পাড়ায়। সরকারি জুবিলি হাইস্কুল ও সতীশচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজাম-পে মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা যেতো। ঠিক তেমনি স্কুলের বার্ষিক মিলাদের বনরুটি ও তোষা হালুয়া খাওয়ার জন্য ভিড় করতো হিন্দু ছাত্রছাত্রীরা। আমার ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরী (বর্তমানে আইনজীবী ও কলাম লেখক) ও আমি যখন প্রথম পূজা দেখতে যাই, তখন গুরুজনদের অনুমতি চেয়েছিলাম। তারা বললেন, ‘যেতে চাও, যাও। তবে তাদের পূজায় অংশ নিও না, দেবীকে প্রণাম করো না এবং দেবীর প্রসাদ খেয়ো না।’ কারণ জানতে চাইলে তারা বললেন, ‘এগুলো আমাদের ধর্মে নিষেধ আছে। বড় হলে সব জানতে পারবে।’ সেদিনই প্রথম বুঝলাম যে, হিন্দু ও মুসলমানের রীতিনীতির মধ্যে অনেক ফারাক। আমরা যখন জুবিলি স্কুলের পূজাম-পে গেলাম, তখন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতো মানসকমল রায়, সিতাংশুকুমার চৌধুরী মিনু, অমিতাভ চৌধুরী পিনু, শ্যামলকান্তি চৌধুরী, গুরুদাস ভট্টাচার্য, শেখর ভট্টাচার্য, সৌরভ দাস (প্রয়াত), জীবন্ময় শ্যাম ভানু,  রঞ্জিত চৌধুরী,  প্রবীর চক্রবর্তী, সমীরণ ও আরও অনেকে। মুসলিম অতিথিদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। তারা আমাদের জলখাবার দিয়ে আপ্যায়ন করতো।
ছোট সময় থেকেই দেখে এসেছি সুনামগঞ্জের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক। সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া আগেও যেমন লাগেনি, এখনও না। সুনামগঞ্জ জেলায় হাজারো মসজিদের পাশাপাশি ৭৬০টি মন্দিরও আছে। শহরের কালীমন্দির, জগন্নাথ মন্দির ও বৈষ্ণবদের আখড়া অতি প্রাচীন। সুনামগঞ্জে দুর্গাপূজা পালিত হত উৎসবমুখর পরিবেশে। আমরা যখন ছোট, তখন মোক্তার পাড়ায় সাইকেল ম্যাকানিক যোগেন্দ্র রায় ও তার প্রতিবেশী শিরিশ রায়ের বাড়িতে দুর্গাপূজা হত। তাদের দু’জনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো। এছাড়া, বাজারে দুইটি ও ষোলঘরে রামকৃষ্ণ মিশনে পাড়ার লোকেরা প্রতি বছর পূজার আয়োজন করতেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন গ্রামের আদি বাসিন্দা অমরচান দাস, মনোরঞ্জন দাস (মনাই টেইলার), নন্দলাল কর, ডা. সতিশ দাস ও লাবু দাস (দাসবাড়ি) সহ পাড়ার লোকজন। তখনকার দিনের পূজা মূলত শাস্ত্রীয় আচারÑআচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে মুসলিম অতিথিরা খুব একটা পূজা ম-পে যেতেন না। মূর্তি তৈরি করতেন আচার্য ঠাকুরগণ। তবে তখন বারোয়ারি পূজার প্রচলন ছিল না। ভাটি অঞ্চল অর্থাৎ দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর প্রভৃতি স্থানে দুর্গাপূজার পরিবর্তে প্রধান্য পেতো মনসা পূজা। দুর্গাপূজা হয় আশ্বিন মাসে, আর মনসা পূজা শ্রাবণ মাসে।
কালের বিবর্তনে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানেও পরিবর্তন এসেছে এবং এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। যোগেন্দ্র রায় ও শিরিশ রায়ের বাড়িতে এখন আর পূজা হয় না। যোগেন্দ্র রায়ের বাড়িটি বর্তমানে মহিলা সমিতির অফিস। আজকাল শহর ও শহরতলীর যেসব স্থানে পূজাম-প তৈরি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল : বাজার (তিনটি), রামকৃষ্ণ মিশন, নবীননগর (দুইটি), হাসননগরের দুর্গাবাড়ি, জগন্নাথ বাড়ি, কালিবাড়ি, ষোলঘর, নতুন পাড়া, উকিল পাড়া, গোরস্থান কাছে বাঁধন পাড়া, মোক্তার পাড়া, মল্লিকপুর, ওয়েজখালি, ব্রাহ্মণগাঁও, বারঘর, তেঘরিয়া, দেবগ্রাম। নতুন পাড়ায় নগেন্দ্র রায়ের বাড়িতে পারিবারিক পূজা হয়। দুই ভাই পূজার আয়োজন করেন। এক ভাই এ বছর, অন্যভাই পরের বছর। নতুপন পাড়ায় বেশ কয়েকটি পূজার মধ্যে উত্তর ও পূর্ব নতুন পাড়ার তাদের স্থাপিত নিজস্ব দুর্গা মন্দিরে বিগত দু’বছর যাবত পূজা করে আসছেন। মূর্তি তৈরিতেও নতুনত্ব এসেছে। দেবীর অঙ্গসৌষ্টভ আগের মতো নয়, মুখম-ল তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আদলে। পূজার আয়োজকরা এখন আর স্থানীয় আচার্য ঠাকুরদের উপর নির্ভরশীল নন। পাল এবং দাসরাও মূর্তি তৈরি করেন। তবে মোহনগঞ্জের কারিগরদের কদর বেশি। আগে একচালা কাঠামে পূজা হতো। এখন বিভিন্ন দেবীর পূজা হয় আলাদাভাবে। ডেকোরেটরদের বদৌলতে ঝক্কিÑঝামেলা কমে গেছে। আজকাল ব্যক্তির চাইতে প্রাতিষ্ঠানিক পূজাই বেশি হচ্ছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পূজার একটি বিশেষ আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা গেছে যে, বর্তমানে শ্রেষ্ঠ মূর্তি কারিগর পুরস্কৃত হন এবং দরিদ্র নরনারী লাভ করেন শাড়ি-কাপড়। জেলার প্রতিটি উপজেলা এবং হিন্দু প্রধান গ্রামে পূজানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ধর্মপাশায় ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বাড়িতে এখনও ধুমধামের সঙ্গে পূজা হয়, কলকাতা থেকে আসেন চৌধুরীরা। বর্তমানে পূজা অনুষ্ঠানে সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা পরিষদ এবং পৌরসভাও আর্থিক সহায়তা দেয়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, বিহার এবং অন্যান্য বাঙালি অধ্যুষিত রাজ্যে জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর মুম্বাই-কাশ্মীর-চ-িগড় ঘুরে যখন কলকাতা পৌঁছলাম তখন সর্বত্র দুর্গাপূজার আসর জমেছে। মনে হল, কলকাতা বোধকরি পূজাম-পের শহর। রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের সর্বত্রই সমাসমারোহে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।  ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ। এমনকি মূর্তি দর্শনও পাপ বলে বিবেচিত হয়। তবে হিন্দুÑমুসলমান সম্প্রীতি, জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক বন্ধনের আলোকে উদার মনোভাবাপন্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানেরা হিন্দুদের পূজা অনুষ্ঠানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তারা  ‘তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার’ এই অমোঘ নীতিতে বিশ্বাস করে। তাই ঈদানীং হিন্দুরা বলে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই স্লোগানটির জনপ্রিয়তা ও গ্রহলযোগ্যতা বাড়ছে।
হাসান শাহরিয়ার : প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস।