ব্রহ্মর্ষি শ্রীশ্রীসত্যদেব
তন্নাত্র বিস্ময়ঃ কার্যো যোগনিদ্রা জগৎপতেঃ।
মহামায়া হরেশ্চৈতত্তয়া সম্মোহ্যতে জগৎ।।
অনুবাদ। এই মহামায়া জগৎপতি হরিরও যোগনিদ্রাস্বরূপা। এই জীবজগৎ তৎকর্তৃকই সম্যক্ প্রকার মোহাচ্ছন্ন থাকে। অতএব বিস্মায়ান্বিত হইও না।
ব্যাখ্যা। মেধস্ এইবার সুরথ ও সমাধিকে বিশেষভাবে বুঝাইয়া দিতেছেন তোমরা যে পরিত্যক্ত রাজ্য ও স্ত্রী-পুত্রাদির প্রতি আসক্তি পরিহার করিতে পারিতেছ না, ইহাতে বিস্মিত বা বিষন্ন হইবার কোন কারণ নাই। মহামায়া মোহজননী, তিনি ত’ মুগ্ধ করিবেনই; তুমি ত’ সামান্য জীব, তিনি জগৎপতি হরিরও যোগনিদ্রাস্বরূপ। যিনি এই জগৎকে পালন করিতেছেন সেই জগদ্ ব্যাপক বিষ্ণু বা প্রাণশক্তিও যোগনিদ্রায় আচ্ছন্ন। তিনিই এই জগৎকে মুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন। যিনি যোগনিদ্রা প্রভাবে বিষ্ণুকেও মুগ্ধ করিয়া রাখিতে পারেন, যিনি বিষ্ণুর ন্যায় পরিপুষ্ট সন্তানকেও জগতের খেলা দিয়া ভুলাইয়া রাখিতে পারেন, তিনি তোমার আমার মত জীবকে তাঁহার মহান স্বরূপ হইতে বিচ্যুত করিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে বিমুগ্ধ করিবেন, ইহাতে বিস্ময়ের কি আছে?
কেন তিনি এরূপভাবে জগৎকে মুগ্ধ করিয়া রাখেন? তাঁহারই স্নেহের সন্তান আমরা! আমাদিগকে জগতের খেলায় মুগ্ধ করিয়া তাঁহার কি অভীষ্ট সিদ্ধ হইতেছে? তাঁহার নিজের কোন অভীষ্ট নাই। আমাদের ইষ্টই তাঁহার অভীষ্ট। আমরা এইরূপ মুগদ্ধ হইতে চাহিয়াছিলাম, এইরূপ বহুত্বেও ক্ষুদ্রত্বের খেলা করিবার জন্য একদিন মহতী ইচ্ছাময়ী মায়ের শরণাপন্ন হইয়াছিলাম। সেই দিন হইতে ইচ্ছাময়ী মা আমাদিগকে বুকে করিয়া অনন্ত বহুত্ব অদ্বিতীয় বহুত্ব সম্ভোগ করাইতেছেন। এক মুহূর্তের জন্যও অঙ্কচ্যুত করেন নাই। অনেক সাধক এইখানে আসিয়া বড় সমস্যায় পড়েন। সাধক যখন ‘আর বহুত্ব চাহি না, আর বিষয়-বাসনা চাহি না, আর কামিনী কাঞ্চন চাহি না, আর বহুত্বের খেলা ভাল লাগে না, মা। এক হইতে আসিয়াছি আবার এক কর, মা।’ এইরূপ বলিতে বলিতে সরল নগ্ন শিশুটির মত ধূলিবিলুণ্ঠিত হইয়া মা মা করিয়া কাঁদে, তখনও এই
বহুত্বের স্পন্দন হৃদয়-বিদারক বাসনার সন্ধুক্ষিত বহ্নির শেষ শিখা নির্বাপিত হয় না। শিশু যত চাই না চাই না বলিতে থাকে, মা যে ততই জোর করিয়া সেই অপ্রার্থিত বিষয়সমূহ দিতে থাকেন। আজ না হয় তুমি পরিপুষ্ট হইয়াছ, আজ বিষয়কে অকিঞ্চিৎকর বুঝিয়াছ, তাই আজ আর বহুত্ব চাহি না বলিতেছ; কিন্তু একদিন তুমি এই বহুত্বের জন্যই মায়ের শরণাপন্ন হইয়াছিলে।
মা সে কথা ভুলিয়া যান নাই। তুমি চাহিয়াছিলে; তাই তিনি স্নেহে মুগ্ধ হইয়া তোমারই প্রার্থিত বহুত্ব নির্বিচারে দিতেছেন। পুত্র বিকারের ঘোরে মায়ের নিকট তেঁতুল খাইতে চাহিয়াছিল। মা তখন দেন নাই। এখন পুত্রের বিকার দূর হইয়াছে। তেঁতুল খাওয়ার সেই কথাটি মনে করিয়া রাখিয়াছেন একদিন পুত্র তেঁতুল চাহিয়াছিল। আজ আর সে চাহে না, তথাপি পুত্রস্নেহে বিমূঢ়া মা তেঁতুল আনিয়া সন্তানের মুখের কাছে ধরিলেন। খাও বৎস! একদিন বিকারের ঘোরে চাহিয়াছিলে, তখন তোমায় দিতে পারি নাই, এখন বিকার দূর হইয়াছে, এখন অনায়াসে তেঁতুল খাইতে পার। পুত্রের অনিচ্ছায়ও তখন মা তাহাকে তেঁতুল খাওয়াইয়া থাকেন। ঠিক এইরূপে মহামায়া মা জগৎকে মুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন।
যে সকল সাধক এই অবস্থায় আসিয়া হতাশ হইয়া পড়েন, তাঁহাদের সম্মুখে গুরু মেধস্ কি অভয় বাণীর বিজয়-পতাকা ধরিয়াছেন? বলিতেছেন‘তয়া সম্মোহ্যতে জগৎ’ তিনিই এই জগৎকে মুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন তুমি কি করিবে? মা-ই যে মোহরূপে সাজিয়া তোমায় মুগ্ধ করিতেছেন। ঐ মোহরূপিণী মাকে দেখ। তোমায় মুগ্ধ করিতেছেন! এই বিশ্বাসটি বজ্রবৎ দৃঢ়ধারণায় তোমার বুকে বসাও। যতই মুগ্ধ হও না কেন, তুমি মা বলিতে ছাড়িও না। কাম আসে, বল জয় মা; কাঞ্চন আসে, বল জয় মা; বিষয়-বাসনা আসে, বল জয় মা; মমতা আসে, বল জয় মা; তোমার ভয় কি! সবই যে মা! যে মূর্তিতেই আসুক না কেন, তোমার মা-ই ত’ আসেন। হইক ক্ষুদ্র, হউক মলিন, হউক পঙ্কিলতামায়, তিনি তোমার মা, ইহা নিশ্চয়। তুমি তাঁহাকে অবজ্ঞা কর কেন? ঘৃণাব্যঞ্জক কুটিল কটাক্ষে তাড়াইয়া দিতে চাও কেন? মা বলিয়া তাঁহাকে অভিবাদন কর। মা বলিয়া ঐ মোহরূপিণী মায়ের শ্রীচরণে অশ্রুসিক্ত পুষ্পাঞ্জলি দাও, আর বল—’মা! তুই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের প্রসূতি
মহামোক্ষ প্রদায়িনী রাজ-রাজেশ্বরী হইয়া এমন কাঙ্গাল বেশে এমন ক্ষুদ্রতার সাজে, এত মলিনতার ছদ্মবেশ পরিয়া আমার সম্মুখে আসিলি? হা ভাগ্য আমার!’ এমনই করিয়া মোহরূপিণী মায়ের চরণ ধরিয়া কাঁদ, দেখিবে কি হয়!
(‘সাধন সমর বা দেবী মাহাত্ম্য’ থেকে সংগৃহীত)


