বাড়ির কাছে আরশি নগর-ছেঁউরিয়ায় লালন সান্নিধ্যে

কুমার সৌরভ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
লালন শাহ’র মূল মাজারটি ধবধবে সাদা রঙের। মাজারের ছাদের ঠিক মাঝখানে সুদৃশ্য গম্বুজ। চার কোণায় অনুরূপ আকৃতির একটু ছোট আকারের আরও চারটি গম্বুজ। মাজারের ছাদটি কংক্রিটের রেলিং ঘেরা। পুরো ছাদ জুরে আরও কয়েকটি ছোট ছোট গম্বুজ। মূল মাজারের ভিতরে ডান দিকে লালন শাহ’র মাজার, তার বামে লালন শাহ’র পালক মা মতিজান বিবির মাজার। মাজারে উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় মতিজান বিবির মৃত্যু সন ১৮৯৫ খ্রি.। লালনের মৃত্যু তারিখ ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ উল্লেখ আছে। অর্থাৎ লালনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর মারা যান তার পালক মা। মাজারের উন্মুক্ত বিশাল বারান্দায় রয়েছে আরও ৪টি সমাধি। এরা হলেন শীতল শাহ ফকির, বিশাখা ফকিরানী, জগো শাহ ফকির ও জগো শাহ ফকিরের নানী (উনার পরিচয় এভাবেই দেয়া রয়েছে)। মাজারের প্রাঙ্গণে আরও অনেক সমাধি সমাধি। আমি ১২ জনের নাম খাতায় টুকে নিতে পেরেছি।  এই ১২ জনের নাম হলো জেনাই শাহ ফকির, প্যারিনেছা ফকিরানী, কামিনী ফকিরানী, জগো শাহ ফকিরের স্ত্রী, শান্তি ফকিরানী, কুসুম ফকিরানী, ফকির মহিন শাহ, ফকির আফিজ উদ্দিন শাহ, মখছেদ আলী শাহ, মাওলানা মলম শাহ, ফকির গোলাম ইয়াছিন শাহ ও লতিফ শাহ ফকির।  এরা সকলেই লালন শাহের অনুসারী ও পরম্পরায় এই মাজারের খাদেম বা খাদেমের স্ত্রী ছিলেন। এই মাজার কমপ্লেক্সটি লালন নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন। তখন একে লালনের আখড়া হিসেবেই লোকজন জানত। লালন এখানে বসে মুখে মুখে গান রচনা করেছেন, গেয়েছেন, শিষ্যরা ছড়িয়ে দিয়েছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এখন যেমন লালন মাজারকে একটি ধর্মীয় স্থান (পীর-ফকিরদের মাজারের মত) গণ্য করা হয় লালনের জীবিতাবস্থায় এরকমটি ছিল না। কারণ তিনি কখনও কোন প্রচলিত ধর্মমতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর জীবনাচরণে বাউলিয়ানার লক্ষণ সুষ্পষ্ট ছিল। বাউল মতবাদ আমাদের প্রথানুগত ধর্মগুলো থেকে কিছুটা ভিন্নতর। তবে এখন সেই বিশুদ্ধ মতের বাউল খুঁজে পাওয়া দুস্কর। বাউলপনায় ঢুকে পড়েছে নানা মন্দ উপসর্গ। লালন শাহ বাউল হলেও জীবন যাপনের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করতেন না। তিনি নিজে জীবিকা নির্বাহের জন্য আশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল পানের বরজ। এর আয় দিয়েই চলত আখড়া। ভিক্ষাবৃত্তিকে লালন অপছন্দ করতেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল ‘উত্তম চাষ, স্বাধীন বাণিজ্য, পরাধীন চাকরি, নিদানে ভিক, অলস নাদানের কার্য ভিক্ষা’ (বাংলাদেশের বাউল: চালচিত্রের সন্ধানেÑআবুল আহসান চৌধুরী)। অর্থাৎ চাষবাসই উত্তম বিবেচনা করতেন তিনি। লালন অনুসারীদের মধ্যেও ভিক্ষাজীবিতা দেখা মিলে না। তাঁরা হয় স্থানীয় মিল-কারখানায় বিশেষ করে মোহিনি মিলে চাকুরি করতেন। মোহিনি মিল বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে কর্মজীবী বাউলরা নানা পেশায় ছড়িয়ে পড়েন। তবে বিশুদ্ধ বাউল মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে সামাজিক নিপীড়নের মাত্রা বেশি। বাউল খেদা আন্দোলন নাম দিয়ে রীতি মত এই নিরীহ সম্প্রদায়টিকে নির্মূল করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। বাউলদের সম্পর্কে সামাজিক মনোভাব কেমন ছিল তা বুঝা যায় লালন শাহ’র মাজারের একেবারে কাছের মানুষ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিনিধি মীর মশাররফ হোসেনের লেখা থেকেও। তিনি লিখেছেনÑ‘এঁরা আসলে শয়তান, কাফের বেঈমান/ তাকি তোমরা জান না’ (প্রাগুক্ত)। অথবা কুমুদনাথ মল্লিক নদীয়া কাহিনীতে লিখেনÑ ‘কামরিপুর চরিতার্থতা সাধনই বাউল সাধনার উদ্দেশ্য’।  এই নির্মূলকরণ এখনও প্রবহমান। কিন্তু যারা বাউল মতবাদের মতো একটি লোকজ অসাম্প্রদায়িক সহজিয়া অহিংস দর্শনের বিরুদ্ধে প্রাণপাত করছেন তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, বাউল নির্মূলকরণের মধ্য দিয়ে সমাজে শান্তি স্থাপিত হয়েছে? বরং আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি বাউলরা যে বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করেন, তারা গানের মধ্য দিয়ে যে মানবতাবাদের প্রচার করেন, তার কিঞ্চিৎ যদি আত্মস্থ করা যেত তাহলে বরং শান্তি স্থাপনের পথে এক ধাপ অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল।
আমরা যখন লালন শাহ’র মাজারে যাই তখন কোন উৎসবাদি ছিল না। তাই বাউলদেরও তেমন সমাগম ছিল না ওখানে। তবে শুনেছি দোল পূর্ণিমা উৎসব ও ১ কার্তিক এখানে জমজমাট বাউল মেলা হয়ে থাকে। তখন সারা দেশ থেকে ওখানে বিচিত্র সব বাউলের সমাগম ঘটে। তবে ভাল সবকিছুর মধ্যে মন্দ কিছুও থাকে। বাউল মেলাকে ঘিরে অবাধে মদ ও গাঁজার আসর বসাসহ কিছু অসামাজিক কাজের অভিযোগ রয়েছে ব্যাপকাকারে। বাউল সম্প্রদায়কেই এই অনিষ্টকর বিষয়গুলোকে বন্ধ করতে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা যারা বাউল ঘরানার বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী তলোয়ার শাণিত করে আছে তাদেরই সুবিধা হবে। মাজারের বর্তমান খাদেম ফকির মোহাম্মদ আলী শাহ। আমরা তাঁর দর্শন পাইনি। তবে তাঁর ছেলে মশিউর রহমান রিপনের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। রিপন তখন মাজারে বসা ছিলেন। গোলগাল চেহারার কালো রঙের বলিষ্ট স্বাস্থ্যের অধিকারী প্রাণবন্ত তরুণ এই রিপন। তিনি আমাদেরকে মাজারের ইতিহাস ও লালন শাহ সম্পর্কে ধারণা পেতে সহায়তা করেছেন।  
মাজারের পিছনে ‘লালন একাডেমী’। এটাকে একাডেমি বলা হচ্ছে বটে তবে কেন এটি একাডেমি সেটি বুঝতে পারি নি আমরা। আমরা এর কোন একাডেমিক চরিত্র দেখতে পাই নি। এখানে লালন শাহকে নিয়ে কোন গবেষণা পরিচালিত হয়Ñএমন কোন তথ্যও পাওয়া যায় নি। তবে একাডেমির কক্ষে আমাদের সুনামগঞ্জের লোকজ সংস্কৃতির পুরোধা পুরুষ হাছন রাজার ছবি দেখে ভাল লাগল। হাছনরাজা আর লালন শাহ’র মধ্যে স্থান কাল বিশ্বাস সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির মধ্যে ব্যাপক অমিল থাকলেও এই দুই মহাপুরুষের মাঝে সাদৃশ্য হলো, এঁরা দু’জনেই গানের রাজ্যে বিচরণশীল ছিলেন সাধনার নিবিষ্টতা নিয়ে। এঁরা গানে আনন্দ খুঁজতেন, গানে মুক্তি খুঁজতেন এবং গানের মাঝেই স্বরূপ আবিষ্কার করতেন। হাছনরাজা যখন বলেন ‘লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি ভালা না আমার/ কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার’ তখন বোধ করি এর আক্ষেপ ধ্বনি লালনের অন্তরও স্পর্শ করে। লালন তখন বলে উঠেনÑ ‘বাকির কাগজ মন তোর গেল হুজুগে/ কোনদিন তোর আসবে শমন সাধের অন্তপুরে/যেদিন ভিটায় হয় বসতি/দিয়েছিলে মন খোস্কবলতি/তুমি হরদম নাম রাখবে স্থিতি/এখন ভুলে গিয়েছ তারে।’ হাছন-লালন কেউই নীরিশ্বরবাদী নন। তাঁদের পছন্দমত ঈশ্বর আছেন যিনি সর্বজগৎ এর কল্যাণ কামনায় নিয়োজিত। এঁরা উভয়েই ইহজাগতিকতার সাময়িক মায়া কাটিয়ে অপার আনন্দধামে চিরস্থায়ী বসত গড়ার অভিপ্রায়ী। তাই এই জগৎ বাড়ি-ঘর কোন কিছুই তাদেরকে আকৃষ্ট করে না। জাগতিকতার রূপ দর্শনে হাছন কিংবা লালন একই পথের পথিক। যেমন তাঁরা মানুষের জয়গানেও সমভাবেই মুখর ছিলেন। তারা নাস্তিক ছিলেন না, প্রচ-ভাবে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। কিন্তু কেউই ধর্মীয় ভেদরেখা টেনে কোন মানুষকে বিচার করতে শিক্ষা দেন নি। উভয়েই গেয়েছেন মানবতার সনাতন জয়ধ্বনি।  সুতরাং লালনের আখড়ায় হাছন থাকবেন, হাছনের ওখানে লালন, এই তো চিরসত্যরূপ স্বাভাবিকত্ব।
লালন আখড়া দেখা শেষ করতে হচ্ছে। কারণ ইতোমধ্যে রাত হয়ে এসেছে। শরীর ক্লান্ত। রাতে আবার নীড়ে ফেরার জন্য দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হবে। একাডেমির এক স্থানে চোখ আটকে যায়। ওখানে কাঁচের আলমিরায় কাঠের ফ্রেমে চৌকোণো নকশা করা একটি দরোজা সংরক্ষিত রয়েছে। দরোজাটি লালন শাহ যে ঘরে বসবাস করতেন সেই ঘরের। আরেক কোণে একটি বিশাল ফরাশি হুঁকো রয়েছে। কারুকাজম-িত পিতলের হুঁকো এটি। হুঁকোটি লালন সাই ব্যবহার করতেন কিনা জানতে পারি নি। একাডেমি জাদুঘরে আরও সংরক্ষিত আছে কয়েকটি একতারা, বেশ কিছু পিতলের তৈজসপত্র, বিশালাকার ডেকচি, পিতলের মূর্তি ইত্যাদি। এই নিদর্শনগুলো লালন শাহ্ স্বয়ং অথবা তাঁর শিষ্যরা ব্যবহার করেছেন। একাডেমিতে কিছু না থাকার মধ্যে এগুলোই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমরা পরম শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় এক অথবা বহু বাউলের ব্যবহৃত দ্রব্যগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি। দেখে নিচ্ছি বাংলার এক কোণে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে ভাবজাগরণ তৈরি হয়েছিল তার পথিকৃৎ পুরুষ লালন ফকিরের উত্থানপর্বটিও। লালন ভেসে এসেছিলেন যে কালিগঙ্গা নদীতে সেই নদীটি এখন শুকিয়ে মৃতপ্রায়। বাংলার প্রাণসঞ্চারী সাংস্কৃতিক ধারাটিও আজ কালিগঙ্গার মতোই শুকনো, ময়লায় পরিপূর্ণ খালের মত দমবদ্ধ। ¤্রয়িমান এই অর্থে যে, এগুলো হয়ে উঠেছে আনুষ্ঠানিকতা, প্রচার বিলাসিতা, কর্পোরেট স্তাবকতা ও বিকৃতপনার শিকার। প্রতি বছর লালনকে স্মরণ করা হয় মহা ধুমধামে। কিন্তু এই স্মরণ করার মধ্যে আমাদের অন্তরের আলো আরও একটুখানি প্রদীপ্ত হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন কুড়ে কুড়ে খায়। এমন ভাবনা মনে নিয়েই লালন আখড়া ছাড়লাম আমরা তিন বন্ধু। নাকি তিন পাগল?  
পুনশ্চ: ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ পর্বের লেখাগুলো আপাতত এখানেই শেষ টানছি। স্মৃতির ঝাঁপিতে থেকে যাওয়া এমন আরও কিছু বিষয়বস্তু নিয়ে সহসাই ফিরে আসার ইচ্ছা রয়েছে। তবে এই কালপর্বে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সুলেখক ও যশস্বী আইনজীবী স্বপন কুমার দেব এর প্রতি। মূলত তাঁর অকৃত্রিম অনুপ্রেরণায় এই লেখার জন্ম। তিনি যেমন লেখা শুরুর আগে আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন তেমনি প্রতিটি পর্ব প্রকাশের পর ফোন করে অথবা ব্যক্তিগত সাক্ষাতে অকুণ্ঠ প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই প্রশংসার কারণেই অনেকগুলো পর্ব লিখা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘজীবী হোন তিনি। (সমাপ্ত)