বিটিসিএল’র গ্রাহক হ্রাস ও বেসরকারি খাতের উত্থান

সুনামগঞ্জ বিটিসিএল’র বর্তমান গ্রাহকসংখ্যা, বিটিসিএল’র কর্মকর্তাদের আন্দাজ মোতবেক, এখন প্রায় ৮০০। ধারণা করতে কোনই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, এদের সিংহভাগই বিভিন্ন সরকারি দপ্তর। বেসরকারি পর্যায়ে বিটিসিএল’র টেলিফোন সংযোগ এর দেখা মিলে কদাচিৎ। অধুনা বিটিসিএল ইন্টারনেট সুবিধা প্রযুক্ত করায় ১৭৬ জন ব্রন্ডব্যান্ড ব্যবহারকারীর তথ্য পাওয়া গেছে। এই হচ্ছে বিশাল অবকাঠামো সুবিধাসম্পন্ন একসময়ের দুর্দান্ত প্রতাপশালী সরকারি টেলিফোন অফিসের বর্তমান চিত্র। অথচ বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর এই পরিমাণ গ্রাহক যেকোন একটি মহল্লার কয়েকটি বাড়িতেই রয়েছে। বেসরকারি মোবাইল প্রোভাইডাররা যেভাবে গ্রাহক আকর্ষণে ক্রমাগত সফলতা দেখাচ্ছে তার বিপরীতে বিটিসিএল পাল্লা দিয়ে গ্রাহক হারাচ্ছে। এর কারণ কী? সেবার মানের অধোগমন তো রয়েছেই। এর বাইরেও রয়েছে বড় কারণ। এই কারণটি অকথিত, কিন্তু অনেক বেশী প্রভাব বিস্তারকারী। বলা যেতে পারে বিটিসিএলকে অকার্যকর করার একটি জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আর সব সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো এই অকার্যকরকরণের ভূত খুব সংগতভাবেই বিটিসিএল’র ঘাড়েও চেপে বসেছে।  বিটিসিএল’র সেবা সম্প্রসারিত না হওয়া, এর ট্যাকনিকেল সীমাবদ্ধতা, সংকুচিত সেবামান, এ সব কিছুর পিছনেই কারও অপ্রকাশ্য হাত রয়েছে বলে ধারণা করা অসংগত নয়, বরং খুব বেশি যুক্তিযুক্ত। অপ্রকাশ্য হাতগুলো কেবলই বাইরের, এমন ভাবার কারণ নেই। বিটিসিএল’র ভিতরেই হয়ত এই কারসাজিতে সহায়তা দেন কেউ। নতুবা সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকার পরও সরকারি এই টেলিকমিউনিকেশন সংস্থাটির এমন বেহাল অবস্থা এখন হত না।
একসময় সরকারি টেলিফোন বিভাগ ছিল অপ্রতিদ্বন্ধি। তখন তারা অনেক দাপট দেখিয়েছে। রাতারাতি কোটিপতি বনেছেন এই অফিসের অনেকে। সরকারি কোষাগারে টাকা যাওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তি বিশেষের সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে এই সংস্থা। ভৌতিক বিলের নামে গ্রাহক অত্যাচারের অসহনীয় অবস্থা কারও স্মৃতি থেকে মুছে যায় নি। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বসে তীর্থের কাকের মত অপেক্ষমাণ থেকে একটি কল করার সুযোগ নিতেন। নির্ধারিত রেইটের দ্বিগুণ তিন গুণ টাকা খরচ করতেন মানুষ। যখন এই খাতে বেসরকারি প্রতিযোগিতা আসল তখন মহা শক্তিধর এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ঝিমিয়ে পড়ল। এখন একেবারে নিভে যাচ্ছে। মানুষ চায় বিটিসিএল’র সম্প্রসারণ, সমৃদ্ধি, গতি, পরিধি, বৈচিত্র; সবকিছু বাড়–ক। কারণ তাহলে বেসরকারি প্রতিযোগিতাকারীরা কিছুটা হলেও সংযত থাকতে পারে। কিন্তু মুক্তবাজার, বিশ্বায়ন, কর্পোরেট সংস্কৃতি, পূঁজি; এমনসব বাস্তবতায় এই আশা কার্যকর হবে কেমন করে? হতে পারে সরকারের কল্যাণমুখী মানসিকতা থাকলে। মুক্তবাজারেও মুক্তকচ্ছকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় হলো বিকল্প সক্ষমতার জায়গা তৈরি করা। বেসরকারি মোবাইল ও ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের মুনাফামুখী ব্যবসায়ের লাগাম ধরে রাখার জন্যই বিটিসিএল’র প্রয়োজন। যখন সুনামগঞ্জে বিটিসিএল গ্রাহক সংখ্যা ৮০০ থেকে শূন্যে নেমে আসবে, এবং জাতীয়ভাবেই এমন অবস্থা তৈরি হবে,  তখন আসলে আর কোন প্রতিযোগিতার অস্তিত্ব থাকবে না। তখন কঠিন সিন্ডিকেটবাজি শুরু হওয়ার নতুন বাস্তবতা দেখা যাবে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বিটিসিএল’র অভ্যন্তরে শুভবোধের জাগৃতি ঘটুক, এটি আমাদের একান্ত কামনা।