রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেজুলিউশন পাস হওয়ার বিষয়টিকে এক ধাপ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৬ নভেম্বর উন্মুক্ত ভোটে এই রেজুলিউশন পাস হয়। ১৩৫ দেশ এই রেজুলিউশনের পক্ষে, ১০ দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়। ২৬ দেশ ভোদদানে বিরত ছিল। ওআইসি’র পক্ষে সৌদি আরব জাতিসংঘে এই রেজুলিউশন উত্থাপন করে। জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হওয়ায় মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা কোণঠাসা পরিস্থিতিতে যে পড়ে যাবে তা স্পষ্ট। এছাড়া এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উঠে আসা এই বিষয়টির আলোচনা আরও বেশি জোরদার হবে। জাতিসংঘে রেজুলিউশন পাসের এইটুকুই আপাতত সুফল। রোহিঙ্গাদের পক্ষে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই মানবিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলশ্রুতি, জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এজন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
একটি মানবিক ও সহিষ্ণু পৃথিবী গঠনের প্রত্যয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার বিষয়টি সবসময়ই অপরিহার্য। জাতিসংঘ গঠনের প্রেক্ষাপটও এমনই ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে জাতিসংঘের ভূমিকা কাগজপত্রের বাইরে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায় না। এর কারণ হলো পুরো বিশ্ব এখন একাধিক শক্তিবলয়ে বিভক্ত। জাতিসংঘ কোন সিদ্ধান্ত নিলেও শক্তিবলয়ের কোন অংশের সক্রিয় বিরোধিতার কারণে ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়ে উঠে না। জাতিসংঘের এটি একটি বড় সীমাবদ্ধতা। আজ রোহিঙ্গা দলনে মিয়ানমারের ভূমিকা নিয়ে যখন ইউরোপিয় ইউনিয়নভূক্ত রাষ্ট্রসমূহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম দেশগুলো বিরোধিতায় সোচ্চার তখন চীন, রাশিয়া কিংবা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলোর এমন পরষ্পরবিরোধী অবস্থানই বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মূল কারণ। সুতরাং জাতিসংঘে পাস হয়ে যাওয়া সিদ্ধান্তের পরপরই রোহিঙ্গা ইস্যুটির সমাধান শুরু হবে এমন আশা করা যেমন সমীচীন নয় তেমনি এই সিদ্ধান্তের ফলে যে ইতিবাচক বৈশ্বিক মনোভাবের পরিচয় পাওয়া গেল তাকে অবজ্ঞা করাও উচিৎ হবে না।
সমস্যা হচ্ছে, এখন মানুষের চাইতে মুনাফা, বাণিজ্য, আধিপত্য প্রভৃতির মূল্য বেশি। বাণিজ্য কিংবা মুনাফার কারণে ১০/২০ লাখ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ভূক্ত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে তাই এখন বিবেকে বাধে না কারও। এই অমানবিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার প্রত্যয়ই কেবল এ অবস্থার অবসান ঘটাতে পারে। আমাদের কবি যেমন বলেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ এই চিরসত্যকে অন্তরে ধারণ করতে হবে আজ বিশ্ববাসীকে। যেসব উপাদান মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত করে সেগুলোকে পরিহার করে এক হওয়ার যত উপাদান আছে সেগুলোর মিলন ঘটাতে হবে। বিশ্বব্যাপী এই মানবিকতার আহ্বান যত জোরদার হবে তত দ্রুততর হবে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের তৈরি অসহনীয় বৈষম্যের অবসান ঘটানো।

