এনাম আহমেদ
(৪র্থ পর্ব)
যাতায়াতের ক্ষেত্রে আমাদের কপালটাই হয়েছে এমন ! ঘর থেকে বের হলে সুনামগঞ্জ-সিলেট ভাঙ্গা সড়কে প্রাগ ঐতিহাসিক বিরতিহীন বাস। আর কিছু দূর যেতে চাইলে মোঘল আমলের কুমিল্লা বি.আর.টি.সি। অন্তত মস্কো যাব আরামে, তাও না। রীতিমতো হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস। আমার ব্যাগ ৩টি একাই টানতে হল না। আন্তরিক সহযোগিতা করল অ্যাড. মাসুক ও সিপিবি নেতা রমাপদ ভট্টাচার্য্য। প্লেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ক্রু’র পেশাদারী হাসিতে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্ধারিত আসনের কাছে গিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল। একেবারে জানালার কাছে সিট। আরও ভালো খবর হলো আমার পাশের সিটে নাজিয়া ভাবি। প্রচুর খাবার-দাবার উনার হাত ব্যাগে আছে বলে আমার অনুমান। তার অনেক পরে সুমন। তার সিট জালানার কাছে পড়েনি। তবে একটি বিশেষ দরজার কাছে পড়েছে। না পড়াই ভালো ছিল। মন খারাপ করে বসে আছে বেচারা। পিনাক কাছে গিয়ে বলল, সুমন ভাই, তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব যুব উৎসবে যাচ্ছেন আপনি। আর তুচ্ছ জানালা নিয়ে মন খারাপ ? মুহূর্তে সুমনের মন চাঙ্গা হয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে পাশের বিদেশির সাথে কথা বলতে শুরু করে দিল।
আমরা যার যার আসন গ্রহণ করলাম। ২২জনের নামের তালিকা মিলিয়ে দেখা হলো। আমরা উপস্থিতি জানান দিলাম। প্লেন ছাড়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলে দুবাইয়ের এয়ার লাইনস হিসেবে প্রথমে আরবিতে এবং পরে ইংরেজিতে আমাদের নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দেয়া হলো। কোন ভাষাই বুঝতে না পেরে সবাই নির্ভেজাল বসে থাকলাম। প্লেনটা নড়ে উঠতেই সবাই হৈ চৈ করে উঠলাম। প্রকৃত উৎসব শুরু হয়ে গেল বলে ! কত অনিশ্চয়তা, সংকট, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সত্যি সত্যি আমরা রাশিয়া রওয়ানা করতে পারছি। আনন্দে মেতে উঠতে এর চেয়ে বেশী উপলক্ষের আর প্রয়োজন হয় না।
যাই হোক, প্লেনটি রানওয়ের শেষ মাথায় গিয়ে যখন তীব্র শব্দ ও গতিতে ছুটতে শুরু করল, উৎসব ফেলে হঠাৎ আমাদের মনটা হু হু করে উঠল। বিদেশে যাওয়ার আনন্দে ঠিক উল্টো পিঠেই থাকে বেদনা। দেশ তো শুধু নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার আবেগ নয়। হোক না তা শুধু ১৫ দিনের জন্য ছেড়ে যাওয়া। প্লেন যখন ফ্লাই করল, তখন আমরা সত্যিকারের শেকড় ছেড়ার ব্যথ্যা অনুভব করলাম। ঘুরে ফিরে কিছু প্রিয় মুখ চোখের সামনে আসতে লাগল। এরাইতো স্বদেশ! মুহূর্তের জন্য সবাই থমকে গেলাম। এই আবেশ কাটলো প্লেনের ক্রো’রা যখন ট্রলি নিয়ে খাবার পরিবেশন করতে এলেন। খাবার দেখে ক্ষিধেয় আমাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সেই দুপুর বেলা খেয়ে বিমানবন্দরে এসেছিলাম। প্লেনে যখন খাবার সামনে এলো, তখন তো রাত দুপুর। একটি মাইক্রোস্কোপিক বক্স আমাদের সামনে রাখা হল আর আধা কাপ পানি, যেটি আবার অ্যালোমিনিয়াম ফোয়েল দিয়ে মুড়ানো। প্রথমে মনে করেছিলাম, বক্সের মধ্যে টিস্যু ও পানি দিয়েছে যেন আমরা ফ্রেস হয়ে খাবার গ্রহণের জন্য তৈরী হয়ে নেই। কিন্তু এ কি? প্রায় দিয়াশলাই বক্সের মতো বাক্সে পরিবেশন করা হলো কথিত চিকেন বিরিয়ানি। একটু কষ্ট করলে পুরো খাবারটি হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়া যায়। ফসলহারা হাওরবাসী ভূ পৃষ্ঠের অনেক উপরে খাবারের কষ্ট অনুভব করলাম। কাটাচামুচকে ঝাটার মতো ব্যবহার করে একটি একটি ভাত মুখে দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা হাভাতে হয়ে গেলাম। অনেক জার্নির মধ্যে খাবার খেতে পারে না। এমন কাউকে পাওয়া যায় কি না যখন চোখ বুলাচ্ছি, পিনাক সামনে থেকে বলল, ভাই আপনি খেতে না পারলে খাবারটা আমাকে দিয়ে দিয়েন। এরকম মহাকাশীয় (!) দুর্ভিক্ষাবস্থায় গরমে হিমেল হাওয়ার মতো আবির্ভূত হলেন নাজিয়া ভাবি। কিছুক্ষণ পর পর খাবারের আশায় হাতপাতি। তিনি কিছু না কিছু আমাকে দিচ্ছেন। সুমন অনেক দূর থেকে তার লম্বা হাতের সুবিধা নিয়ে জায়গায় বসেই অবলীলায় আমাদের সঙ্গে খাওয়ায় অংশ নেয়।
এমন সময় খবর পাওয়া গেল প্লেনের ক্রো’দের কাছ থেকে খ্যাদ্যদ্রব্য কিনেও খাওয়া যাবে। প্রশ্ন করলাম, এই মহাশূন্যে (!) কোন দেশের কারেন্সি চলছে? জানা গেল, তারা দুবাইয়ের কারেন্সি দিনার নিচ্ছেন, ডলার নিচ্ছেন। এমন কি বাংলাদেশের টাকা যদি ৫০০/১০০০ টাকার নোট হয়, তবে তা দিয়েও খাবার কেনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের টাকা নেবে না বলে সুমনকে চ্যালেঞ্জ করলাম। সুমন বলল, আমার কোন কথাই তো তোমাদের বিশ্বাস হয় না। তবে দেখ, আমি টাকা দিয়েই জিনিস কিনছি। বলেই সে ১০০০ টাকা দিয়ে অত্যন্ত সুস্বাদু কিছু চকলেট কিনে নিয়ে এলো। ভূ পৃষ্ঠে ফিরে গেলে তাকে ফেরত দেয়ার অঙ্গিকার করে তার চকলেটগুলো কয়েকজন মিলে হালাল করলাম। মহাকাশের অঙ্গিকার যেন ভূমিতে ফিরে গিয়ে ভূপতিত না হয়, এ ব্যাপারে সে আমাদের সতর্ক করে দিল। নানান ছলাকলা করে নানান জনের কাছ থেকে এভাবে খেয়ে, নির্মল আনন্দে, গভীর ষড়যন্ত্রে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। প্রায় পৌনে পাঁচ ঘন্টা পরে প্লেনে আবারো কর্কশ আওয়াজ পাওয়া গেল।
মৌলভীবাজারের উদীচীর হাফিজ চৌধুরী জানাল, ভাই আমরা সম্ভবত নামছি। তাকে বললাম, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি জাতিগত অবনমন নয়। এ অবস্থায় আমাদের আকাশে ভেসে থাকা উচিত নয়। জানালা দিয়ে কিছু আলোর কনিকা দেখা গেল। পুরো ভ্রমণে এর আগে আরও দু’বার আলোর ঝলকানি দেখা গেছে। বাকী পুরো পথটি ছিল ঘন অন্ধকার। বিমানবন্দরে প্লেন নামার আগে পাইলট প্লেনের ভেতরে প্রেসারাইজ করেন। এতে যাত্রীদের অনেক সমস্যা হয়। ঘাড়ে, কানে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হয়। অনেকের নাকি নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। প্লেনে দীর্ঘ ভ্রমণের মতো বিরক্তিকর ভ্রমণ আর হয় না। ধীরে ধীরে আমরা দুবাই বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। ভূমিতে নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত হওয়ার পর সবাই হাততালি দিয়ে পাইলটদের অভিনন্দন জানালাম। ব্যাপারটি অতি চমৎকার।
আমরা দেশে যদি যাতায়াতের ক্ষেত্রে গাড়ির স্টাফ, রাস্তা, রাস্তার মধ্যে বাজার, ব্রিজ ইত্যাদি আমাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করত, তাহলে নিশ্চয়ই সিলেট থেকে গাড়ি ঢাকার ফকিরাপুলে নিরাপদে পৌঁছালে আমরা পুরো ব্যবস্থাটিকে হাততালি দিয়ে গাড়ি থেকে নামতাম।
যাই হোক, প্লেন রানওয়ে থেকে প্লেনস্ট্যান্ড এ আসতে অন্তত ২০/২৫ মিনিট সময় লাগলো। এর মধ্যে মশা-মাছির মতো বিভিন্ন প্লেন বিমানবন্দরে নামতে উঠতে দেখলাম। এক পর্যায়ে আমাদের বিমানটি থামলো। জানালা দিয়ে দেখলাম সিঁড়ি এনে লাগানো হচ্ছে প্লেনের সাথে। আনন্দিত হলাম। কারণ প্লেন থেকে সুরঙ্গ পথে সরাসরি বিমানবন্দরের এসির ভেতরে ঢুকে যাওয়ার চেয়ে নতুন দেশের সরাসরি প্রাকৃতিক হাওয়া গায়ে মাখা অনেক রেশী রোমান্টিক। প্লেন থেকেই খবর পেয়েছিলাম দুবাইয়ের ঐ সময়ের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি। তা আমাদের জন্য সহনীয় হলেও হঠাৎ গরম হাওয়া আমাদের নতুন দেশের নতুন পরিবেশে স্বাগত জানাল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে আমাদের জন্য নির্ধারিত বাসে উঠলাম। বাস আমাদের নিয়ে গিয়ে থামল ২নং টার্মিনালের সামনে। অত্যন্ত হতাশ হলাম। কারণ দুবাইয়ের ১নং টার্মিনাল অত্যন্ত জৌলুসপূর্ণ। প্রায় একযুগ আগে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে ঐ টার্মিনালে ছিলাম বেশ কয়েক ঘন্টা। ২নং টার্মিনালটি সেই তুলনায় একটু কম জৌলুসপূর্ণ। বিমানবন্দরে ঢুকে খাবার পানির টেপ দেখে আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। পাঁচ ঘন্টা প্লেনে আমরা কাটিয়েছি আধকাপ পানি খেয়ে ! মরুভূমিতে খাবার পানি পেয়ে আরব শেখদের প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ করলাম। যারা শুধু দুবাই ভ্রমণে বা কাজে এসেছে তারা সোজা গিয়ে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ান। আর আমরা যারা ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার, তারা বাম দিকে এগিয়ে গিয়ে নিরাপত্তা চৌকিতে ধরা খেয়ে খেয়ে ২নং টার্মিনালে প্রবেশ কললাম। নিরাপত্তা চেকিংটি রীতিমতো দুর্বিসহ। পায়ের জুতা খুলতে হয়। সেটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু কোমরের ব্যাল্ট খুললে আরো অনেক কিছু খুলে পড়ে যেতে চায় ! সম্মান এবং মালপত্র একসেঙ্গে টেনে নেয়া অনেক কঠিন। টার্মিনালের ভেতরে ৫নং গেইটের কাছাকাছি সোফায় আমাদের ঘাঁটি গাড়তে বললেন জালাল ভাই। কারণ ৫নং গেইট দিয়েই ৮ঘন্টা পরে আমাদের মস্কোর প্লেনে উঠার কথা। অবশ্য তা সম্ভব হবে এরমধ্যে আমরা আর কোন বিপদ ডেকে না আনলে ……….. (চলবে)


