ইকবাল কাগজী
গত ১৫ নভেম্বর দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘১৬ ইউনিয়নে হলো মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর’। বিশেষ প্রতিনিধির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জিবীত করতে এবং মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে রাখার জন্য সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও লাইব্রেরি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার ১৬টি ইউনিয়ন এবং একটি উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও লাইব্রেরি চালু হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়। জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ তাঁর জানামতে সুনামগঞ্জেই প্রথম।’
ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার গড়ে তোলার মহৎ উদ্যোগের যিনি হোতা (ব্যক্তিগভাবে যে-ই হোন তিনি কিংবা যা-ই করুন তাতে কীছু যায় আসে না), নির্দ্বিধায় বলা যায়, অন্তত কতিপয় রাজাকারমনস্ক (এরকম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের ঐতিহাসিক কাজের বিরোধী মানসতার অধিকারী) ব্যতীত সকল মানুষের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অবশ্যই তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাঁর প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ অভিনন্দন। তিনি হতে পারেন একজন যে-কোনও সাধারণ মানুষ কিংবা সমাজের কেউকেটা কেউ অথবা কোনও প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধ লড়ে দেশ স্বাধীন করনেওয়ালা সাধারণ মানুষের কাছে কে কী ইত্যাদি (যে-কারও বিদ্যমান আর্থসামাজিক শ্রেণিস্তরের অবস্থানগত সামজিক মর্যাদা), সার্বিক বিবেচনায়, কোন বড় কথা নয়। আসল কথা হলো, আমজনতার কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের কর্মযজ্ঞে সনিষ্ঠ মানুষটিই সর্বাগ্রে মহৎ ও স্বজন বলে প্রতিপন্ন, ভালোবাসার মানুষ বলে অন্তর থেকে নির্দ্বিধায় বরণীয়। তাঁর চেয়ে তাদের কাছে বেশি আপন বলে আর কেউ হতে পারেন না। কারণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে সুদীর্ঘ সাড়ে চার দশক পেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাদুঘর ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করার মধ্যে একটি আলাদা ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত আছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক তাৎপর্যটা কী? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, (১). দেশের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জিবীত করা (যেহেতু তাদেরকে ইতঃপূর্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সংশ্লিষ্ট মহলের পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টায় বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে), (২). মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং (৩). সর্বোপরি গণচেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান বাংলাদেশের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হয়ে দেখা দিয়েছে এবং (৪). এই ক’টি কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জাতীয়মুক্তির পথে অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
কেবল তাই নয়, প্রকৃতপ্রস্তাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার কর্তব্য পালনের আরেকটি সারার্থ এই যে, গুরুত্বের দিক থেকে বিবেচনায় এটি একধরণের যুদ্ধ। মনে রাখতে হবে, এটা সুদূরপ্রসারী অর্থে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে চলমান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, একটি নয়া যুদ্ধের সূচনা, জাতীয়মুক্তির প্রশ্নে জাতির পক্ষে যে-যুদ্ধটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে এবং জাতিকে এই যুদ্ধটা লড়্ইে উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে হবে, এর আর কোনও বিকল্প নেই। এই যুদ্ধটা একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধটা লড়ে বিজয় অর্জন না করে জাতির মুক্তি কামনার কেবল একটাই অর্থ হতে পারে, যাকে বলা যায়, পশ্চাদপদতার তিমিরে কূপম-ুকের স্বাধীনতা উপভোগ করে বেঁচে থাকার মুক্তি।
বাস্তবে এখানে কী হয়েছে? তার একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান উপস্থিত করা যাক। বিষয়টিকে কবি শামসুর রহমান উত্তমরূপে বিবৃত করেছেন তাঁর এক কবিতায়। তিনি ১৯৭৫ সালে রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী পরিস্থিতি বিবৃত করে বলেছেন, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়/ মুক্তিযুদ্ধ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’ এদিকে কার্যক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধকে অচরিতার্থ করে তুলার ষড়যন্ত্রের উৎসবিন্দুটির বর্ণনা করেছেন যতীন সরকার এইভাবে, ‘এই দালালরা তথা এ দেশে পাকিস্তানকে চিরকালের জন্য কায়েম রাখতে বদ্ধপরিকর দেশদ্রোহীরা স্পষ্টই বুঝে ফেলেছিল : হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরও তাদের (অর্থাৎ দালালদের) এদেশেই থাকতে হবে। তাই সে-সময়ই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে : এদেশে অবস্থান করেই প্রতিশোধের যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। অদূর ভবিষ্যতে সে-যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতির জন্যই তারা তাদের শত্রুদের (অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারীদের) বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক উৎসটিতে আঘাত করাটাই প্রথম প্রয়োজন বলে অনুভব করল। তাদের সেই অনুভবেরই বাস্তব রূপায়ণ চৌদ্দই ডিসেম্বরে পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী-নিধন।’ ( বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা : ১৬৪-১৬৫)। যতীন সরকার যাদেরকে ‘দেশদ্রোহী’ বলেছেন, ইতিহাস সাক্ষী, তারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর অনেক অনেক দেশবিরোধী অঘটনের ঘটন পটীয়সী (থুড়ি পটীয়ান)। কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী বুদ্ধিজীবীনিধনেই থেমে থাকেনি তাদের সে-প্রচেষ্টা, বরঞ্চ সাড়ে চার দশকের কালপরিসরে সেটা প্রসারিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প- করার পটুত্বে। তারা মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি রাষ্ট্রের স্থপতি মুজিবসহ মুক্তিযুদ্ধের চার নেতাকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশের কিংবা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ হননের সম্ভাব্য সবরকম কার্যক্রম পরিচালনা করতে কোনও রকম কসুর করেনি। ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ হননের’ সেসব কার্যক্রমের একটি নমুনা হতে পারে এরকম : দেশের বধ্যভূমিগুলিকে একে একে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া (সুনামগঞ্জে পিটিআই স্কুলের বধ্যভূটি নামকাওয়াস্তে টিকে আছে, এমনকি সরকারি সতীশচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে পাকহানাদারের গুলিতে নিহত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের কোনও স্মারক/স্মৃতিসৌধ নেই বিদ্যালয়ে), পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানটিতে পার্ক বানানো, একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের রাজনীতিক পুনর্বাসন সম্পন্ন, রাজাকারদের মন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি হওয়া, মুক্তিযুদ্ধের বছরকে ‘গন্ডগোলোর বছর’ এবং এমনকি জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বানানো, লালনের ভাস্কর্য ভাঙা, বিজয়ের অগ্নিশিখা নিভিয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান, সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধচর্চাকে ব্যাহত করা (সুনামগঞ্জে রাজাকারের তালিকা তৈরি করতে গেলে মোহন্তকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া), পচাত্তরের পনোরই আগস্ট দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে প্রচার করা, জঙ্গিবাদের বিস্তার ইত্যাদি অনেক কীছু, তালিকা অনেক দীর্ঘ। এইভাবে, যেখানে যেভাবে পারে, যত্রতত্র সদাসর্বদা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি অবিরাম অব্যাহত আছে। বলতে গেলে বাস্তবতা হলো, দেশের সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মচ্ছব ও মুক্তিযুদ্ধচেতনার উৎখাতের অভিযান চলছে চারদিকে, অথচ দেশটা মুক্তিযুদ্ধ করে অর্জিত হয়েছে।
এখন অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা জাতীয়মুক্তির পথে মূর্তিমান সাংস্কৃতিক বিপত্তি হয়ে দেখা দিয়েছে। সে বিপত্তি থেকে জাতির মুক্তি চাই। যতীন সরকার বলেছেন, ‘সমস্ত বিপত্তি থেকে পরিত্রাণ লাভের একমাত্র উপায় হলো মুক্তিসংগ্রামের মূল্যবোধের আলোতে পথ চলা। আমাদের শত্রুদের লক্ষ্যই সেই আলোটিকে নিভিয়ে ফেলা, অন্তত জনগণের দৃষ্টিসীমা থেকে আলোটিকে দূরে নিয়ে যাওয়া। সেই আলোকবর্তিকাটিকে আড়াল করে খোপ খোপ অন্ধকার ওরা এখানে সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছে।’ (বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা : ৯১)।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য নিয়ে একটু আগ্রহী বা অনুসন্ধিৎসু হয়ে ভেবে দেখলে সহজেই বুঝা যাবে যে, সে তাৎপর্যটি জাতিগত আত্মপরিচয় সুসংহত করার প্রচেষ্টার সঙ্গে ওতপ্রোত। ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে জাতিগত নিমজ্জন থেকে মুক্তির জনআকাক্সক্ষা কিংবা শেষ পর্যন্ত ব্যাপকাকারে শোষণ ও শাসন চালিয়ে যাওয়ার আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে জিইয়ে রাখার পুঁজিবাদী চক্রান্তকে প্রতিরোধ করার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশের মানুষের চেতনা থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে গেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিশূন্য সে-মানুষের মানুষ বলে পরিচয় দেবার কীছ ুথাকে বলে মনে হয় না। বিশ্বমানবিক বাস্তবতা এই যে, যে-কোনও স্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিশূন্য মানুষ না-মানুষ হয়ে উঠে, আর যে-কোনও স্থানকালেই স্বভাবত অধিকাংশ সাধারণ মানুষ কখনও না-মানুষ হতে চায় না। বোধ করি এই কারণে মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই জাতিগত পরিচিতি সংহতকরণবিরোধী যে-কোনও প্রচেষ্টার ঘোর বিরোধী, ঐতিহাসিক বাস্তবতার এ কারণেই বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন কিংবা মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, এখানকার মানুষ না-মানুষ হতে চায়নি। পৃথিবীতে কোথাও মুক্তির পতাকা কখনও ভূলুণ্ঠিত হয় না, চিরকাল কারও না কারও হাতে ধৃত হয়ে সদাসর্বদা আকাশে উড্ডীন থাকে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে জাতিবিনাশের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বস্তুতপক্ষে ঔপনিবেশিক সা¤্রাজ্যবাদের সশস্ত্র শাসনাধীনে সংঘটিত হতে দেখা গেছে। ১৯৭১-এর আগে আমাদের বাংলাদেশও (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) সে জাতিবিনাশী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অধীনে নিপীড়িত ছিল এবং একাত্তরে ১ কোটির বেশি লোক ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়েছিল। এখানে গত শতকের শেষার্ধের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রশক্তি সে-নিপীড়নটি নির্মমভাবে পরিচালিত করে। তারা বাংলাভাষাকে আরবি হরফে লোখার ষড়যন্ত্রসহ বাংলাভাষায় আববি-ফারসি শব্দের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাংলাভাষাকে বিকৃত করার (আসলে হত্যা করার) অপচেষ্টা চালিয়েছিল (যে-অপচেষ্টার শেষ লক্ষ্য বাংলাভাষী জাতিসত্ত্বাকে হত্যা করা), এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ও নজরুলকে সংশোধন করতে ছাড়েনি। তাছাড়া পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের দীর্ঘ ২৩ বছরের শাসনামলে পূর্বপাকিস্তানের সম্পদ পাচার করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে, সম্পদের পাহাড় তৈরি করেছে পশ্চিম পাকিস্তানে এবং প্রকারান্তরে পূর্বপাকিস্তান ক্রমে নিঃস্ব, কপর্দকহীন হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ১৯৬৫-এর পাকভারতযুদ্ধে পূর্বপাকিস্তান অরক্ষিত ছিল। একাত্তরের যুদ্ধে আত্মসমর্পণের পূর্বক্ষণে জাতিকে মেধাশূন্য করার অভিপ্রায়ে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের অনুসারীরা মুজিবকে হত্যা করে রাজধানী থেকে দূরে টুঙ্গিপাড়ায় সমাহিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধাদের দেখে দেখে হত্যা করেছে বঞ্চিত করেছে সকল রাজনীতিক অধিকার থেকে। এইসব কর্মকা- মিলে যে-সামগ্রিক একটি প্রক্রিয়া দাঁড়ায়, সেটিকে জাতিগত পরিচিতি সংহতকরণবিরোধী ঔপনিবেশিকতা বলা যায়, যে-প্রক্রিয়াটা পাকিস্তানি শাসকেরা তৎকালের পূর্বপাকিস্তানে সচেতনভাবে প্রয়োগ করেছিল এবং বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের ভেতরে সে-প্রক্রিয়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের নামে পরিচালিত করছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কথিত ‘পাকিস্তানপন্থী’রা। (রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি, জাগৃতি প্রকাশন, দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৬, পৃষ্ঠা : ১৭)।
জাতিগত পরিচিতি সংহতকরণবিরোধী ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ ভাষা আন্দোলনে ব্রতী হয়েছে, সেই আন্দোলনের অনিবার্য পরিণতি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেরও তারা ছিল নায়ক অর্থাৎ শেষ পরিণতিতে একটি জাতিরাষ্ট্রের তারা ¯্রষ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যাপী জাতীয়মুক্তির আন্দোলনের ইতিহাসে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের ঘটনা বাংলাদেশকে এক তাৎপর্যম-িত সম্মানের অধিকারী করেছে। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় যে, তা সত্ত্বেও জাতিগত আত্মপরিচয় সংহতকরণবিরোধী প্রক্রিয়া এখনও ফল্গুধারার মতো এখানে প্রবহমান অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, দেখেশুনে মনে হচ্ছে ক্রমে প্রবল হচ্ছে।
যদি তেমন জাতিনিপীড়নমূলক ঔপনিবেশিক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেমন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ে তৎকালের পূর্বপাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছিল, এমন হলে যে-কোনও দেশের মানুষ জাতিগত পরিচয় অক্ষুণœ রাখার সংগ্রামে অবতীর্ণ হবেই, যার একমাত্র পরিণতি গণদাসত্বের কিংবা পরাধীনতা থেকে মুক্তি। অথবা অন্যভাবে বললে বলা যায় অনিবার্য স্ব-অধীনতা, স্বাধীনতা ও জাতীয়মুক্তির দিকে অভিযাত্রা। এই সংগ্রামেরই একটি সংহত রূপ ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।
একাত্তরোত্তর পৌনে চার বছরের মাথায় রাজনীতিক পটপরিবর্তনের কল্যাণে বাংলাদেশে অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে আত্মপরিচিতি সংহতকরণের পথ থেকে বিচ্যুত করে এ দেশেরই বিভ্রান্ত এক শ্রেণিস্তরের রাজনীতিক প্রতিনিধিরা। চিন্তক সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘… শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকা-ের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা এসেছে তারা অনেকেই পাকিস্তানপন্থী।’ (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা : ১৭)। অর্থাৎ তারা বাংলাদেশের কেউ ছিল না আপাদমস্তক শাসক ও শোষক ছিল। ক্ষমতাসীন হওয়ার সময় থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জনকে মুছে ফেলার সার্বিক প্রয়াস পরিচালনায় তারা ব্যাপৃত ছিল। অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালি জাতীয়তাকে বদলে বাংলাদেশী করা হয়েছিল, সংবিধানে চালানো হয়েছিল ব্যবচ্ছেদের ছুরি।
এইরূপ পরিপ্রেক্ষিতে জাতিগত আত্মপরিচিতি সংহতকরণের প্রয়োজনে এর বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু করা সার্বিক বিবেচনায় সমার্থক। এই যুদ্ধটা শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই। যে-যুদ্ধটিকে নবপর্যায়ে শুরু হওয় মুক্তিযুদ্ধ বলে অভিহিত করা যায় অনায়াসে। সুনামগঞ্জে এই নতুন যুদ্ধটি সূচিত হয়েছে ইতোমধ্যে। অতিসম্প্র্রতি সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে শুরু করেছেন কেউ কেউ রীতিমতো ক্ষেত্র সমীক্ষা চালিয়ে, যা অনেক আগেই হওয়া উচিৎ ছিল। সালেহ চৌধুরী (ভাটি এলাকার মুক্তিযুদ্ধ : আমার অহংকার), বজলুর মজিদ চৌধুরী খসরু (রক্তাক্ত একাত্তর), মতিউর রহমান, আবু সুফিয়ান (একাত্তরে সুনামগঞ্জ), সুখেন্দু সেন (শরণার্থী ৭১), হাসান মোরশেদ (দাস পার্টির খোঁজে) প্রমুখের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বইয়ে যুদ্ধকালের ইতিহাস বিভিন্নভাবে ও বিভিন্নমাত্রায় উঠে এসেছে। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে আরও কীছু বই মুক্তিযুদ্ধের উপরে প্রণীত হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার এই মহৎ প্রয়াসটিই আমাদের জাতীয় জীবনে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের অঙ্কুরোগম।
সুনামগঞ্জে গত ১৬ সেপ্টেম্বর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি বীরবিক্রমের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হলো, বেশ একটু আলোচনামুখর পরিসরে। বিষয়টা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগে তেমনটা হতো না, প্রকারান্তরে এড়িয়ে যাওয়া হতো, এমনকি একসময় পাঠাগারটির নামকরণ জগৎজ্যোতির নামে করা হলেও মাঝখানে একবার সেটা প্রত্যাহার করা হয়েছিল (যাঁরা সেটা করেছিলেন তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন যে, এই জগৎজ্যোতিই এই দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে)। এইরূপ ‘আলোচনামুখর পরিসরে’ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জন্মমৃত্যু বার্ষিকী বা স্মৃতিচারণ, তাদেরকে নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি অনুষ্ঠান এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উদ্ধারের সঙ্গে এবারে যুক্ত হলো জেলা জুড়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্যোগ। এইসব কীছুর সমাহার (মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই লেখাসহ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতর্পণ, জীবন ও যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা, তদুপরি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠা) আর একটি মুক্তিযুদ্ধ সূচনার তাৎপর্যময় ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন এই মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ চলতেই থাকবে। ১৬টি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত (ক্রমান্বয়ে অবশিষ্টগুলোতে করা হবে) মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর ও পাঠাগার মুক্তিসংগ্রামের মূল্যবোধের আলো বিকিরণ করবে, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জিবীত করবে এবং মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষিত করবে এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মুক্তিযদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত ও শানিত মুক্তচিন্তার মানুষ তৈরির ব্যাপক অন্দোলনে পর্যবশিত হবে । এই আন্দোলনকে ভবিষ্যতে হয় তো বলা হবে মুক্তচিন্তার উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের আন্দোলন, যা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যদি ইতিপূর্বে জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে পদ্ধতিতে ধ্বংস করা হয়েছে সে-পদ্ধতি এই জাদুঘর ও পাঠাগারগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা না হয়, মুক্তিযুদ্ধের নয়া দিগন্ত খোলার দোয়ারটি কোনও না কোনও শ্রেণিবিশেষের স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া না হয়। শঙ্কা কীছুতেই দূর হয় না, দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। আমরা পত্রিকায় পড়েছি, দোয়ারা বাজারে একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র (দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত) দুবৃত্তদের দখলে চলে গেছে, পত্রিকায় বলা হয়েছে হাসপাতাল দুবৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।


