আবু সুফিয়ান
সোমবার সকাল ৭ টা ৩৫ মিনিটে মালেক পীরের কাছ থেকে মৃত্যু সংবাদ শুনে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম। চোখের সামনে ভেসে আসল ৭১ সালে বাঙালি জাতির দুর্যোগ সময়ের কথা। সে সময়ে সফিকুল হক চৌধুরীর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে আমার হৃদয়ে। পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্ম হয় দেশ ও জাতির দুঃসময়ে ভূমিকা রাখার জন্য। তারা ভয়ভীতির তোয়াক্কা না করে জাতীয় দুর্যোগে বিভিন্ন সময়ে এগিয়ে আসেন স্বেচ্ছায়। ১৯৭১ সালে জাতীয় মহা দুর্যোগেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমনি বাঙালি জাতির মুক্তির লড়াইয়ে আকোতভয় ছিলেন, তেমনি তিনি পেয়েছিলেন নিবেদিত প্রাণ বিশাল কর্মীবাহিনী, যারা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত পরিনতির দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। কোন ষড়যন্ত্রই দেশের স্বাধীনতাকে আটকাতে পারেনি। আমরা ছিনিয়ে এনেছি আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা।
সুনামগঞ্জে ১৯৭০’র নির্বাচনে, অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে যেসব ছাত্র নেতারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে সফিকুল হক চৌধুরী ছিলেন অন্যতম। সুনামগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের যে কোন সভায় তাঁর উপস্থিতি ছিল অবধারিত। মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সুজাত চৌধুরী, দেওয়ান ইস্কান্দর রেজা, দেওয়ান মুসাদ্দিক রেজা, মইন খাঁন, মতিউর রহমান, নুরুজাম্মান শাহী, আব্দুল হান্নান, আব্দুল মালেক, সেন্টু দা, নুরুল ভাই ও এখলাছ ভাইরা ছিলেন তাঁর সমসাময়িক। বর্তমানে কেউ আছেন কেউ নেই। তাঁদের মধ্যে ছিল খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাত্র ইউনিয়নকে (মতিয়া) মোকাবেলা করতে গিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থের প্রয়োজন হতো। সেই অর্থ যোগান দাতাদের একজন ছিলেন সফিকুল হক চৌধুরী। তাদের পরিবার ছিল অর্থনৈতিকভাবে সুনামগঞ্জের একটি স্বচ্ছল পরিবার। তাঁর সততার জন্য সংগঠনের অর্থ ভান্ডারের দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন খুবই আন্তরিক। ১৯৭১ খিস্টাব্দের ৪ মার্চ সুনামগঞ্জ শহরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের চরম উত্তেজনাকর মুহুর্তেও তিনি সহকর্মীদের সঙ্গেই ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহে সফিকুল হক চৌধুরী অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিরোধ যুদ্ধ, আমবাড়ী ডিফেন্স, ওয়েজখালী ডিফেন্স, ট্রেজারী পাহাড়ারত মুক্তিযোদ্ধা দল, পিটিআই ভবনে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প, হোটেল হাতেম এবং পরে ইব্রাহিমপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন সদা তৎপর ছিলেন। ক্ষেত্র বিশেষে মালেক পীরকে সহযোগী হিসেবে পেয়েছেন তিনি। মালেকপীর তাঁর আত্মীয় ও প্রিয়জন হওয়ায় দু’জনের মধ্যে ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা। সংগ্রাম পরিষদ কোন কোন সময়ে খাবার জোগান দিতে না পেরে তাকেই ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করতেন এবং তিনিও সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের নিরাশ করেন নি। পারিবারিক প্রভাব ও স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় হাতপাতলে কেউ খালি হাতে ফেরৎ দেয়নি তাঁকে।
১০ মে সুনামগঞ্জ হানাদার বাহিনীর দখলে চলে গেলে সফিকুল হক চৌধুরীসহ ক্যাম্পের সকল মুক্তিযোদ্ধারা ভারত সীমান্তে আশ্রয় নেন। ওই দিন রাতেই ইব্রাহিমপুর থেকে একটি অভিযান পরিচালিত হয় সুনামগঞ্জে। সেই দলে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সফিকুল হক চৌধুরীও অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ভারতের লাল পানিতে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেই ক্যাম্পেও আলফাত উদ্দিন মোক্তার ও আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন বখ্তের সঙ্গে সেই ক্যাম্পের খাদ্য সরবরাহে দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ২০মে আমরা প্রশিক্ষণে চলে গেলে তাঁর সাথে সাময়িকভাবে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সেপ্টেম্বর মাসে বালাট গেলে মইলাম মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট ক্যাম্পে দেখা হয় তাঁর সাথে। সেখানে তিনি ক্যাম্পের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। মালেক পীর, কামাল রাজার সাথে সাক্ষাৎ শেষে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন সফিকুল হক চৌধুরী। নারায়ণতলা যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে মালেক পীর এবং সফিকুল হক চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয় সেখানে। যুদ্ধকালীন সময়ে এটাই শেষ দেখা। মুক্তিযুদ্ধের সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্পিত দায়িত্ব পালনে সফিকুল হক চৌধুরী ছিলেন খুবই আন্তরিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুক্তিযোদ্ধার কোন তালিকায় তাঁর নাম তালিকাভূক্ত হয়নি। তিন মাস পূর্বে হোটেল গুলবাগে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এই প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন। বলেছিলেন স্মৃতিকথা লিখে যাবেন, লিখেছেন প্রকাশও করেছেন। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে র্দীঘদিন তিনি অন্যের সাহায্যে চলাফেরা করেছেন। শেষ মুহুর্তে তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অর্ন্তভূক্তির সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন উপজেলা যাছাই-বাছাই কমিটি। তবে এই সুসংবাদ তিনি শুনে যেতে পারেন নি। এ দুঃখ বোধ নিয়েই ১৯ নভেম্বর ২০১৭ খ্রি. রাত ১১ টা ৫ মিনিটে বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল চৌধুরী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ইন্নালিল্লাহি…..রাজিউন। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাৎ কামনা করি। লেখাটি তাৎক্ষণিক ভাবে লেখা তাই ভুল ত্রুটি মার্জনীয়।
লেখক: সাবেক ডেপুটি কমান্ডার, সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।


