দরকার ইতিহাসকে জানা, ধারণ ও সংরক্ষণ

কোন সমাজ বা সভ্যতাই হঠাৎ সৃষ্ট কোন বিষয় নয়। আজ সমাজ সভ্যতার যে চেহারাটা দেখা যায় তা একদিনে এই রূপে আসে নি। এর পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘকালের কালানুক্রমিক অভিঘাতের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সময়সীমার কিছু হয়ত আমরা জানি, কিছু ধারণা করতে পারি আর অনেক কিছুই জানি না। সেই অজানা সময় থেকে যার শুরু তিল তিল করে, তাই ক্রমোন্নত হতে হতে আজ আমরা চোখের সামনে এক পরিষ্কার বর্তমানকে দেখতে পাই। সুতরাং বর্তমানকে জানতে আমাদের অতীতে ফিরে যেতে হবেই। শিকড়ের কাছাকাছি যাওয়ার এই প্রয়াসটিই ইতিহাস চর্চা। অনেক সময় ইতিহাসকে, ঐতিহাসিক উপাদানকে উপেক্ষা করা হয়, কখনও অস্বীকার করা হয়। কেউ কেউ আবার বা ধ্বংস করে দেন ইতিহাসের উপাদান। ধ্বংস করে চেষ্টা করেন ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নুতন কোন ধারণাকে পাকাপোক্ত করার। এটি ধ্বংসকারীর মানসিক দেওলিয়াত্ব নিঃসন্দেহে। ইতিহাসবিমুখ এই গোষ্ঠী কখনও পৃথিবীর অগ্রগতির জনক নয়, এরা সর্বদাই এক ধরনের পরগাছাস্বরূপ। আমাদের এই জনপদ, নির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান জেলা সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক সীমানার, ইতিহাস ঐতিহ্য খুবই সমৃদ্ধ, বিভিন্ন গবেষণায় এখন এগুলো জানা যাচ্ছে। হাওরের জলরাশির কিনারে, পাহাড়ের পাদদেশে আজ থেকে হাজার বছর আগে শিক্ষায় কৃষ্টিতে সাহিত্যে যে অগ্রসর অবস্থার পরিচয় আজ পাওয়া যাচ্ছে তাতে করে এই এলাকার মাটি ও মানুষের গৌরব বাড়ছে। ভবিষ্যতের গবেষণায় হয়ত আরও নতুন নতুন ইতিহাসের বিষয়বস্তু আমরা জানতে পারব। তবে এজন্য দরকার ইতিহাসকে জানার, ইতিহাসকে ধারণ ও সংরক্ষণ করার বিশেষ উদ্যোগ। বলাবাহুল্য ব্যক্তি পর্যায়ে এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা কখনও অবিচ্ছিন্ন না থাকলেও রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগটি ছিল একেবারেই সীমিত। এবার বোধ করি এই জায়গায়ও অগ্রগতির সম্ভাবনার দুয়ার খোলা শুরু হয়েছে।
এত কথা বলার কারণ হলো, জেলার তাহিরপুর উপজেলার হলহলিয়া গ্রামের প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণ ও গবেষণার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের খবর মিলেছে। জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থী বুধবার সরেজমিন এই এলাকা জরিপ করে গেছেন। তাঁরা এখন এই নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ ও গবেষণার বিষয়ে চিন্তা করবেন। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীনকালে সিলেট অঞ্চল যে তিনটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল তার অন্যতম লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল তাহিরপুরের হলহলিয়ায়। এই গ্রামের কিছু প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ দেখে এমন ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। প্রাচীন এই নিদর্শনগুলোর অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগের অভাবে বিলিন হয়ে গেছে। যে সামান্য কিছু নিদর্শন এখনও রয়েছে সেগুলোকেই কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, আগত পরিদর্শকদলের উদ্দেশ্য ছিল তার উপায় উদ্ভাবন। আমরা এই সাধু উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাই। হলহলিয়া ও এর পাশ্ববর্তী সীমান্তঞ্চল ঘেঁষা বাংলাদেশ ভূখন্ড, জগন্নাথপুরসহ পুরো জেলায়; রয়েছে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি জীবনবোধের বহু গৌরবগাঁথা। এইসব কিছুই নতুন আগ্রহ ও অনুসন্ধানের চমৎকার বিষয়বস্তু হওয়ার যোগ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতাত্ত্বিক দলের এই উদ্যোগের ধারাবহিকতা যেমন আমাদের কাম্য তেমনি ইতিহাস অনুসন্ধানে এখানে আরও নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও বাংলা একাডেমীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।