হারিয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমি- এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ জরুরি

আবু সুফিয়ান
১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও চার লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখ- ও একটি পতাকা। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পরপরই শরণার্থী পুনর্বাসন ও দেশ পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকটি জরুরি বিষয়কে সযতেœ এড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশ সরকার। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। কিন্তু ৭১-য়ে  পাকিস্তানিদের এদেশীয় দালাল কিংবা রাজাকারদের তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এবং নির্যাতিত নারীদের তালিকা তৈরি করা ছিল অত্যন্ত জরুরি এবং  তখনকার প্রেক্ষিতে কাজটিও ছিল সহজ। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে সেই সহজ কাজটি করা এখন অত্যন্ত কঠিন হবে। জানা কথা, ৪৭ বছরেও শেষ হয়নি মুক্তিযোদ্ধা তালিকার কাজ। এ বছর তালিকা করতে গিয়ে ১১৬টি মামলা হয়েছে আদালতে। অন্যদিকে  গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত করা এবং  স্মৃতিসংরক্ষণের ব্যবস্থা করার ব্যপারে চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেছেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ। তাই ক্রমশ বিলীন হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে একাত্তরের বধ্যভূমি, নিশ্চিহ্ন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো। ইতোমধ্যে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পথে। কিন্তু এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। ঘটছে ইতিহাস বিকৃতি। পরিকল্পিতভাবে জাতিকে প্রকৃত ইতিহাস থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে ওড়েছে শহীদের রক্তরঞ্জিত পতাকা। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি এটা তাদের জন্য লজ্জ¦ার এবং লজ্জার সমগ্র জাতির জন্যও।
চার বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছি। চেষ্টা করছি হারিয়ে যেতে বসা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি উদ্ধারে। অনুসন্ধানে নেমে আমরা লক্ষ করেছি সুনামগঞ্জ জেলার যেসব জায়গায় গণহত্যা সংঘটিত   হয়েছে বা গণকবর দেয়া হয়েছে তা এখন খোঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইচ্ছা করেই স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টিকে সযতেœ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শুরু করেছিলাম ছাতক উপজেলা থেকে। ‘পা-ব’র মুক্তিযোদ্ধা গণকবরটি দেখে মনে বড় কষ্ট পেয়েছি। দেখে বুঝাই যায় না সেখানে ১৮জন মুক্তিযোদ্ধার গণকবর রয়েছে। জেডফোর্সের (৩য় বেঙ্গল) এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা ছাতকের সম্মুখযুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করেন। দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুরের শহীদ সমাধির বেহাল অবস্থা, নইন গাঁওয়ের বধ্যভূমির নেই কোনও চিহ্ন, টেংরাটিলা বধ্যভূমি খোঁজে পাওয়া যাবে না। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার  পিটিআই, বেরীগাঁয়ের লালঘর, কৃষ্ণতলা-বেলাবর হাটি, হবতপুরের খালের বধ্যভূমিতে এখন জনবসতি গড়ে উঠেছে। টুকের বাজারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানে এখন মসজিদের লেট্রিন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া, ডুংরিয়ার গণহত্যার  নেই কোনও স্মৃতিচিহ্ন। দিরাই উপজেলার শ্যামারচর বধ্যভূমি ভূমিখেকোদের দখলে এবং পেরুয়াতে স্মরণ রাখার মত দৃশ্যমান কোনও স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসী-রাণীগঞ্জে ব্যক্তি উদ্যোগে স্মৃতিসৌধ তৈরী করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।  কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে আমরা বিশাল সমুদ্রে সাঁতার কাটছি। দেরি হয়ে গেছে, অনেক আগেই তথ্য সংগ্রহের কাজে এগিয়ে আসা উচিৎ ছিল। তবে এটুকু বলতে পারি আমাদের এ অভিযান চলছে, চলবে। এক্ষেত্রে প্রথমে শারীরিক সুস্থতা এবং পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন। কাজের সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করে এদুয়ের সমন্বয়ে। আমাদের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে যাছাই-বাছাই করে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষকদের কাজে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। এ কাজে হাত দিয়ে মনে হয়েছে দেশের তো বটেই সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধ সম্মন্ধেও আমাদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তবে ঘুরাঘুরি করায় আমাদের তথ্যভা-ার সমৃদ্ধ হচ্ছে। দুঃখ লাগে যখন দেখি কোনও বধ্যভূমি, শহীদ সমাধি, গণহত্যাস্থল কিংবা গণকবর এবং স্মরণীয় যুদ্ধক্ষেত্রগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার সরকারের কাছে নিবেদন এই, অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুন। নতুবা একদিন প্রকৃত ইতিহাস হারিয়ে যাবে। বলা হবে দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি,গন্ডগোল হয়েছিল। তাই ঐতিহাসিক প্রয়োজনে অমাদের গৌরবের স্মৃতিকে ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরী। আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করবেন।                
লেখক: যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক।