শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষেই পাঠ দান করতে হবে

দুর্নীতিদমন কমিশন (দুদক) কোচিংবাণিজ্য বন্ধে কতিপয় সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদ থেকে জানা যায়, দুদক শিক্ষা বাণিজ্য প্রবণতা বাড়ার কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছেন সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলো হলো: শ্রেণিকক্ষে ঠিকমত পাঠ দান না করা, পাঠ্যপুস্তক প্রকাশক ও কোচিং মালিক এবং কতিপয় শিক্ষকের অবৈধভাবে স্বল্প সময়ে সম্পদ অর্জনের তীব্র আকাক্সক্ষা, শিক্ষা কার্যক্রম মনিটরিংয়ের অভাব এবং অভিভাবকদের অসেচতনতা ইত্যাদি। এই কারণগুলো চিহ্নিত করে দুদক বলছে, এটা বন্ধ করতে না পারলে সামনে আরও ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করবে। বলাবাহুল্য দুদকের এই পর্যবেক্ষণের সাথে কারোরই দ্বিমত করার কোন অবকাশ নেই। দুদক উত্থাপিত কারণের বাইরে আরও বহু নিয়ামক হয়ত রয়েছে যেগুলো আমাদের শিক্ষার অগ্রগতিকে ভূতের মতো পিছনে টানছে। কিন্তু সারকথা হলো সংশ্লিষ্টদের দ্রুততম সময়ে বিত্তবান হওয়ার এক উদগ্র বাসনা থেকেই যাবতীয় অন্যায় অপকর্মের জন্ম হচ্ছে। দুদক এগুলো রোধের সুপারিশ করেছে। দেশের মানুষও এ ধরনের অসহনীয় অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে চান। যে অভিভাবকের আর্থিক সামর্থ নেই তার সন্তানেরও লেখাপড়ার মৌলিক অধিকার আছে। এই অধিকার যাতে কোনভাবেই রুদ্ধ না হয় সেটি ওই দরিদ্র অথবা স্বল্পবিত্ত অভিভাবকের তীব্র আকাক্সক্ষা। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় এই আকাক্সক্ষা অর্জিত হচ্ছে না। সন্তান সন্ততির লেখাপড়ার খরচ জোগান দিতে গিয়ে অভিভাবকরা চোখে শর্সেফুল দেখছেন। আজ সরকার মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণকে অবৈতনিক করেছেন। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করছে রাষ্ট্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের ব্যাপকভাবে জাতীয়করণ করে তাদের সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভৌত অবকাঠামো বাড়ানো হচ্ছে। জাতীয় চাহিদার আলোকে এই পদক্ষেপগুলো আপাতত কম মনে হলেও জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থাগুলোকে মোটেই কম বলা সমীচীন হবে না। এতসব পদক্ষেপের কারণ কী? কারণ আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দানের বিষয়টি নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। বরং গত অন্তত দুই/তিন দশকে শিক্ষাকে ¯্রফে বাণিজ্যিক উপকরণ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যার টাকা নেই তার শিক্ষা গ্রহণেরও সুযোগ নেই-এমন এক অদ্ভূত বাস্তবতার দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি। বিষয়টি এমন হয়েছে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাবাণিজ্য এখন এমন এক অবস্থায় এসে ঠেকেছে যেটি সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে। মানুষ নানাভাবে এর বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। এই সুনামগঞ্জে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজে নিয়মিত পাঠ দান না করার প্রতিবাদে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছেন। এর জের ধরে পরে সারা দেশে প্রতিবাদী মানববন্ধন পালিত হয়। গণপ্রতিক্রিয়াগুলোর তীব্রতা কত ব্যাপক এখন দুদকের পর্যবেক্ষণ দেখে কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না।
সহজ কথা হলো শিক্ষক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীকে পাঠ দান করবেন। এজন্য রাষ্ট্র অর্থ খরচ করছে। যে শিক্ষক এর পরিবর্তে নিজ বাসভবনে ক্লাস খুলে অর্থ কামাই করার ধান্দায় থাকবেন তারা সব অর্থেই অন্যায় করছেন। তাদের চাকুরিতে নিয়োজিত থাকার কোন অধিকার নেই। আর কেউ যদি প্রাইভেট পড়িয়েই টাকা রোজগার করতে চান তাদেরকে তাহলে চাকুরি ছেড়ে দেয়ার মতো ন্যুনতম নৈতিকতা দেখাতে হবে শিক্ষক নামের মাহাত্ম্য রক্ষার জন্য।