বিশ্ব ক্ষমতাবলয়ে নতুন মেরুকরণের আভাষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাকেন্দ্রে যে একাধিপত্য কায়েম হয়েছিল সেটি চিড় ধরতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য দখলের প্রতিযোগিতায় ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের চাইতে পিছিয়ে পড়েছে। এবার বোধ করি তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বও খর্ব হতে শুরু করেছে। ইসরাইলের রাজধানী জেরুজালেম হওয়া নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব সমর্থন করা না করা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজ্জতির চূড়ান্ত হয়েছেন। এই পরাজয়কে খোদ ইসরাইলের একটি দৈনিক ‘হারেৎস’ লিখেছে, ‘এই ভোট ইসরাইলের জন্য হালকা তিরষ্কার কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রীতিমত এক থাপ্পড়’। জাতিসংঘের মতো একটি নিরীহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের মামুলি একটি প্রস্তাবের ভোটাভোটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতোটা বিব্রতকর বলা হচ্ছে, প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। মূলত এই বিব্রতকর অবস্থার জন্য দায়ী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ভোটাভোটির আগে রীতিমত সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। দুর্বিনীত ট্রাম্প বলেছিলেন, এরা আমাদের কাছ থেকে শুধু কয়েক মিলিয়ন নয় বরং কয়েক বিলিয়ন ডলার নিয়ে থাকে। আর তারপর আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। আমরা নজর রাখব কারা কিভাবে ভোট দেয়। ঠিক আছে, আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিক, তাহলে আমাদের বিস্তর অর্থ বেচে যাবে’। ট্রাম্পের এই ধরনের স্পষ্ট হুশিয়ারি ও হুমকি সত্বেও মানবতা, বিশ্বশান্তি ও ন্যায়ের স্বার্থে বিশ্বসম্প্রদায় সঠিক অবস্থানেই দাঁড়িয়েছিল। জেরুজালেম প্রশ্নে মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দেয় ১২৮ সদস্য রাষ্ট্র। পক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র নয়টি, যার দুইটির একটি হলো ইসরাইল অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভোট দানে বিরত ছিল ৩৫ দেশ, সভায়ই অনুপস্থিত ছিল ২১ দেশ। ভোটদানে বিরত কিংবা সভায় অংশ না নেয়ার সংখ্যা অতীতে কখনও এত বিরাট ছিল না। এরা দোদুল্যমানতায় ভুগছিল এবং শেষ পর্যন্ত নিরবতাকেই শ্রেয় মনে করেছে। সবচাইতে বিষ্ময়কর জিনিস হলো, যে দশটি রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচাইতে বেশি অর্থনৈতিক-সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে তার ৯ রাষ্ট্রই তাদের পক্ষে থাকেনি। দেশগুলো হলো:- আফগানিস্থান, মিশর, ইরাক, জর্ডান, পাকিস্তান, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও ইথিওপিয়া।
জেরুজালেমে মার্কিন সমর্থনপুষ্ঠ হয়ে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তর করলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি বিপুলভাবে বিঘিœত হবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোটগ্রহণের ফলাফল বিশ্ববাসীর শান্তির পক্ষে অবস্থানকেই উর্দ্ধে তুলে ধরল। সাহস করে যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা ভবিষ্যতে এই ধারা আরও স্পষ্ট করবেন বলেই শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসী আশা প্রকাশ করেন। সা¤্রাজ্যবাদের কাছে মুনাফার বাইরে আর দ্বিতীয় কোন বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার্য হয় না। জেরুজালেম প্রশ্নে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মরিয়া চেষ্টা থেকে বিষয়টি আরেকবার প্রমাণিত হলো। এই সা¤্রাজ্যবাদ আসলে বিশ্বকে কিছুই দেয় না। সারা বিশ্বের সম্পদ শোষণ করে তার ছিটেফোটা বিলিয়ে দিয়ে একটি অনুগ্রহভাজন বলয় তৈরি করে। অনুগৃহীতরা সা¤্রাজ্যবাদের যেকোন প্রস্তাবে কোন ধরনের যুক্তির তোয়াক্কা না করে গলা মিলায়। এবার অবস্থা পালটেছে। বিশ্বসম্প্রদায়ের এই অবস্থান ধরে রেখে আরও অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে। জেরুজালেম ইস্যুতে বিশ্ববাসীর শান্তির প্রশ্নে যে একাট্টা অবস্থান দেখা গেল সেটিই হয়ে উঠুক বঞ্চিত বিশ্ববাসীর নতুন শক্তিবলয়।

