বিজয় রায়, ছাতক
ছাতকের হাওর পাড়ে চলছে ফসলহারা কৃষকদের আহাজারি। বোরো ধান কাটার ভর মৌসুমে হাওরে-হাওরে বইছে জলতরঙ্গ। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসলের পঁচা গন্ধ ছড়াচ্ছে বাতাসে। চৈত্র-বৈশাখ মাসে যেখানে কিষাণ-কিষাণীদের কর্মব্যস্ততায় হাওর পাড় জুড়ে চলতো ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াইয় ও গোলায় তোলার মহোৎসব। এর স্থলে হাওরপাড়ে এখন বইছে কান্না, বিষাদ ও আহাজারি।
শনিবার নোয়ারাই ইউনিয়নের নাইন্দার হাওর ও হাওর পাড়ের ফসলহারা কৃষকদের সাথে আলাপচারিতায় তাদের ফসলহারার বেদনা বিষাদভরে বর্ণনা করেন। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাওর নোয়ারাই ইউনিয়নের নাইন্দার হাওর। নোয়ারাই ইউনিয়নসহ দোয়ারাবাজার উপজেলার আরো ক’টি ইউনিয়নের মানুষের বছরের খাবার আসে নাইন্দার হাওর থেকে। শুস্ক মৌসুমে ধান আর বর্ষায় মাছ। চলতি বছরে হাওরের শতকরা ৬০ ভাগ বোরো ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি নিস্কাষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতার কারণে নাইন্দার হাওরপাড়ের কৃষকদের ফসল হারানোর তিক্ত স্বাদ নিতে হয়। উপজেলার ছোট-বড় ৬৪টি হাওরের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরগুলোর মধ্য ৪৭টি হাওরের ফসল কোনটির আংশিক এবং কোনটি সম্পূর্ণভাবে তলিয়ে গেছে।
ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যের সাথে বাস্তবতার বিরাট ফারাক রয়েছে। কৃষিবিভাগের ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে লুকচুরির বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট।
উপজেলা কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ি চলতি ২০১৫-১৬ বোরো মৌসুমে উপজেলায় ১২হাজার ৭শ ২৫হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ফলনশীল ১১হাজার ৬১০হেক্টর, হাউব্রিড ৩৩০হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ৭৮৫হেক্টর। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে ২৫০ হেক্টর বোরো ফসল এবং আক্রান্ত হয়েছে আরো ৯৭৫হেক্টর আধা পাকা ফসল। কিন্তু কৃষি বিভাগের এই হিসেবের সাথে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণের কোন মিল নেই। চাষাবাদকৃত বোরোর শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ ফসল ইতিমধ্যেই পানির নিচে চলে গেছে। শতকরা ২০ভাগ ফসল কাটা শেষ হয়েছে এবং আরো ২০ভাগ ফসল ডুবু-ডুবু অবস্থায় রয়েছে। কৃষকদের দাবি অপরিকল্পিত বাঁধ ও বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এখানের বোরো চাষীরা তাদের ফসল হারিয়েছেন। পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে দেখেও কিছুই করতে পারছেন না তারা।
ফলসহানির ক্ষতিপূরণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও তুলছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। নাইন্দার হাওড় পাড়ের পাটিবাগ গ্রামের কৃষক আজাদ মিয়া, আলতাবুর রহমান, আফাই মিয়া, রায়হান মিয়া ও লালু মিয়া জানান, শুধু বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তাদের আধাপাকা ফসল এখন পানির নিচে। কিছু জমি কাটতে পারলেও সিংহভাগ ফসলই আধাপাকা থাকায় কাটা সম্ভব হয়নি। বাতিরকান্দি গ্রামের কৃষক মুজিবুর রহমান, সৈয়দ আলী, আকল মিয়া, নুর ইসলাম, রুহুল আমিন আক্ষেপ করে জানান, তাদের ক্ষতির কথা বলে কি লাভ হবে। ফসল হারিয়ে এখন তারা সর্বসান্ত। কেউ খবর নিতেও আসেনি।
বারকাপন গ্রামের কৃষক আফতাব মিয়া তালুকদার, সাজ্জাদ মিয়া, আনর মিয়া কয়েছ মিয়াসহ কৃষকরা বেড়িবাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও পানি নিস্কাষণের ব্যবস্থা না থাকাকে দায়ি করে জানান, এখন পর্যন্ত তারা চার ভাগের এক ভাগ ফসল কাটতে পেরেছেন। বাকী সব আধাপাকা ফসলই এখন পানির নিচে। ভবিষ্যতে বোরো ফসল চাষাবাদে কৃষকরা আগ্রহী হবে না। সরকারের কাছ তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জগলুল হায়দার জানান, প্রতিদিনই ফসলহানির খবর আসছে। জরিপের মাধ্যমে সর্বশেষ সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। তথ্য লুকোচুরির কোন সুযোগ নেই। তবে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
- শ্রমিক অধিকার বিষয়ে অজ্ঞ কৃষিশ্রমিকরা ‘সুরুজ উঠলে খেতও যাই হাইঞ্জা হইলে বাড়িত আই’
- তাজিকদের উড়িয়ে ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা


