এনাম আহমেদ
৮ম পর্ব
মস্কো হোটেলের দু’তলা বিছানায় আত্মসমর্পনের পর শরীর জানান দিল, দুই রাত আমরা ঘুমাইনি। প্রথম রাতে ঢাকা বিমানবন্দর, তারপর ৮ঘন্টা দুবাই তারপর মস্কো বিমানবন্দর এভাবে আমাদের ২দিন কেটে যায়। শোয়া মাত্র ঘুম। ভুলে যাই পরের দিন সকাল সাড়ে ৯টায় আমাদের সোচিতে যাওয়ার ফ্লাইট। বিমানবন্দর হোটেল থেকে অনেক দূরে। এজন্য হোটেল থেকে আমাদের সকাল ৬টায় বেরোবার কথা। কিন্তু সবাই গভীর ঘুমে অচেতন। এক পর্যায়ে অনেকের চিৎকার চেচামেচিতে ঘুম ভাঙল সকাল ৮টায়। লাফ দিয়ে উঠলাম। ঐ দিন আমরা ১২জন যাব সোচিতে। বাকীরা মস্কোতে থেকে পরবর্তী দুই দিনে যাবে। অন্য হোটেল থেকে গাড়ী নিয়ে এসে আমাদের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেন জালাল ভাই। হোটেল থেকে বের হওয়ার মুখে মস্কোর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মুখোমুখি হলাম। সাথে কনকনে ঠান্ডা। বাংলাদেশী ছাতা দিয়ে মস্কোর বৃষ্টি মোকাবেলা করে গাড়িতে উঠলাম। সেভিয়েত আমলে অপপ্রচার করা হতো, মস্কোতে নাকি বৃষ্টি হলে কেউ কেউ ঢাকাতে ছাতা ধরতেন। মস্কোতে বৃষ্টি হওয়ায় আমরা মস্কোতেই ছাতা ধরলাম। একজন হোটেলে পাসপোর্ট হারিয়ে ফেললেন। বলতে গেলে হারানোর শুভ সূচনা করলেন তিনি। পরবর্তীতে এই ট্যুরে এমন কিছু নেই যা আমরা হারাইনি। আমাদের গাড়ি ছুটে চলার চেয়ে থেমে থাকছে বেশী। মস্কোর পথে পথে ঢাকাইয়া জ্যাম। আমাদের দলনেতা রিয়াদ ভাই ফ্লাইট মিস হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে মস্কোর রাস্তায় বের হতে পেরে খালি পেটেও আমরা আনন্দিত। চলা-না চলার দোলাচলে পড়ে প্রায় দুই ঘন্টা পর আমরা বিমানবন্দর পৌঁছলাম।
ভেতরে ঢুকে দেখি এলাহি কারবার। বিভিন্ন এয়ারলাইনস এর অন্তত: একশটি কাউন্টার। একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখা যায় না, এমন অবস্থা। দীর্ঘ সময় ঘুরাঘুরি করে আমাদের কাঙ্খিত কাউন্টারটি খুঁজে পেলাম। কিন্তু এই পাওয়াটা না পাওয়ারই মতো। কর্মকর্তারা জানালেন প্লেনটি রানওয়েতে চলে গিয়ে লাফ দেয়ার অপেক্ষায় আছে। আমি মনে করেছিলাম, ইউরোপে ফ্লাইট মিস করলে কিছু হয় না, কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ফ্লাইটটি ধরিয়ে দেয়। জানা গেল, এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরিণ ফ্ল্ইাট। এখানে এমন ব্যবস্থা নেই। এখন নতুন করে নগদ রাশিয়ান মুদ্রা রোবলে টিকেট কেটে সোচিতে যেতে হবে। আর্থিক পরিমাণটা বাংলাদেশী টাকায় প্রতিজন প্রায় ১৫ হাজার টাকা। কোথায় আমরা এয়ারপোর্টে এসেছি আকাশে উড়ব, তা না, উল্টো আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। নদী ভাঙ্গা মানুষের মতো আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। শুধু সুমন দীর্ঘদেহী হওয়ায় এয়ারপোর্টের সিলিং এর রডে ধরে ঝুলে থাকল। এক এক জনের হতাশা প্রকাশের ভঙ্গি একেক রকম! একজন অন্যজনকে দোষারোপ করতে থাকলাম। মস্কো থেকে সোচি অনেক দূরে। বাস চলে না। ট্রেনে যেতে দু’দিন লাগে। প্লেনে আড়াই ঘন্টা। ট্রেনের ভাড়া একটু কম। তবে দু’দিন নিজের টাকায় খেলে খরচ গিয়ে প্লেনের টিকেটের সমানই পড়ে। সুমনকে উপর থেকে নামিয়ে আমরা জরুরী বৈঠকে বসলাম। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক বৈঠকের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক। প্রথমে সবাই হিসেব করলাম প্লেনের টিকেট নতুন করে কেনার মতো টাকা আমাদের কাছে আছে কি-না।
দেখা গেল সবারই কোন মতে হয়ে যাবে। তবে দেশের বন্ধু বান্ধবদের জন্য সামান্য কোন উপহার কেনার টাকাও আর থাকবে না। পাষানে বুক বাঁধলাম। এবারের টেনশন ঐ দিন সোচির আর কোন ফ্লাইট আছে কি না ? থাকলে ১২টি টিকেট পাব কি না? খবর নিতে দলনেতা রিয়াদ ভাই কাউন্টারে গেলেন। ফিরে এসে মিশ্র সংবাদ জানালেন। সন্ধ্যার দিকে সোচির শেষ ফ্লাইট আছে, তবে অন্য এয়ারপোর্ট থেকে। এখান থেকে সেখানে পৌছাতে ৪ঘন্টা লাগবে। হাতে সময় মোট ৫ ঘন্টা। তার মানে একটু এদিক ওদিক হলে এই ফ্লাইটও মিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমাদের যার যা ডলার আছে তা-ই দিয়ে টিকেট কাটার সিদ্ধান্ত নিলাম। টিকেট কর্তৃপক্ষ আমেরিকান ডলার নিতে রাজি হলেন না। তাদের দিতে হবে রাশিয়ান রোবল। ছোটতে হল ব্যাংকে। এতে আমাদের মহামূলবান সময় আরোও নষ্ট হল। সময় দ্রুত কমতে থাকায় আমরা ঠিক করলাম গাড়ি রিজার্ভ করে চলে যাব। সুমন দ্রুত হাঁটতে পারায় আমরা তাকেই পাঠালাম গাড়ি রিজার্ভ করতে। তাছাড়া মস্কোর ড্রাইভাররা ইংরেজী বুঝে না। সুমন ইশারায় তা বুঝিয়ে দিতে পারবে। তার ইশারা ভাল। আমরা দ্রুত গাড়ির আশায় এয়ারপোর্টের দরজায় একপায়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সুমন ফিরে এল যুব উৎসবের ৫জন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে। ঐ স্বেচ্ছাসেবকরা মস্কোর প্রতিটি এয়ারপোর্টে যুব উৎসবে যোগদানকারিদের সহায়তা করার জন্য ২৪ ঘন্টা কাজ করছে। আমরা নির্ধারিত ফ্লাইট মিস করায় তারা আন্তরিক দু:খ প্রকাশ করে জানাল, রিজার্ভ বাসে গিয়েও আমরা বিকালের ফ্লাইট ধরতে পারব না। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে যাওয়ার পরামর্শ দিল। তবে ট্রেন পরিবর্তন করতে হবে ৪ বার এবং তা করতে হবে হাতের ইশারায়।
কেউ ইংরেজী বুঝবে না। কোনভাবে একটি ট্রেন ভুল করে ফেললে আর গন্তব্যে যেতে হবে না। একেবারে সাইবেরিয়া নিয়ে যাবে। চরম বিপদে আমরা চরম সিদ্ধান্ত নিলাম। ট্রেনেই যাবো। স্বেচ্ছাসেবকরা আমাদের ট্রেন স্টেশনে নিয়ে গিয়ে টিকেট কেটে দিলেন। ট্রেন স্টেশনে ঢুকতে গিয়েও এয়ারপোর্টের মতো নিরাপত্তা চেকিং। ইউরোপের প্রতিটি পরিকল্পিত শহরে প্রতিটি ট্রেন স্টেশনের কাছে থাকে বাসস্টেশন। এয়ারপোর্ট থেকে হাঁটা দূরত্বে থাকে ট্রেন ও বাসস্টেন্ড। আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় দিলাম। তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠতে গিয়ে কেউ ব্যাগ, কেউ জ্যাকেট এক কথায় যে যা পারি হারালাম। ট্রেন চলতে শুরু করল। লন্ডনের মতো মস্কোতেও দেখা গেল আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন শুধু মাটির নিচ দিয়ে চলে না, মাটির উপর দিয়ে, এমনকি রাস্তার উপর ফ্লাইওভার দিয়েও চলে। দুপাশের সুদৃশ্য দৃশ্যাবলি দেখে যাচ্ছি। হঠাৎ একজন খাবারের ট্রলি ঠেলে নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হলেন। এতক্ষণে আমাদের খাবারের কথা মনে পড়লো। একেবারে মধ্যদুপুর। মনে করেছিলাম উন্নত দেশের ট্রেন ফ্রি খাওয়াবে, তা না! খাবারের দাম দেখে আমাদের চোখ কপালে এবং কপাল তালুতে উঠে গেল। পানি যে কিনে খাব সেই অবস্থাও নেই। পানির চেয়ে পানীয়র দাম কম। এদিকে আমাদের যে ক্ষিদে বিক্রেতা সহ পুরো ট্রলি খেয়ে ফেলতে পারব এক এক জন। এগারটি স্টেশন অতিক্রম করে আমরা বারতম স্টেশনে নেমে যাওয়ার কথা।
খাওয়ার মনযোগ দেয়ায় আমরা স্টেশনের হিসেবে গোলমাল করে ফেললাম। অতিক্রান্ত স্টেশনকে মাসুক বলছে সাত, যাদু বলছে আট, পিনাক নয়। সুমন বলল তা কি করে হয়? দাঁড়াও আমি ইশারায় জেনে নিচ্ছি। বলেই পাশের ৯০ বছরের বৃদ্ধার সাথে ইশারায় সত্যি সত্যি গল্প জমিয়ে ফেলল এবং নির্ভুল স্টেশনে আমাদের নিয়ে নিয়ে নেমে গেল! সংখ্যায় আমরা ১২ জন। সাথে অন্তত ছোট বড় ৩০ টি লাগেজ। ২৪টি ব্যক্তিগত, বাকি ৬টিতে বাংলাদেশ স্টল সাজানোর জন্য বিভিন্ন সামগ্রীতে পূর্ণ। এই লাগেজগুলোর ওজন সর্বাধিক। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত লাগেজবহন করা ছাড়াও পালাক্রমে স্টলের এই লাগেজগুলোও বহন করে নিচ্ছি এবং মাইনাসের কাছাকাছি তাপমাত্রা থাকার পরও সবাই থামছি। এবার আমরা সুমনের নেতৃত্বে সত্যিকারের আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রবেশ করলাম। সুমনের হাঁটার সঙ্গে আমরা দৌঁড়েও কূল পাচ্ছি না। তার এক স্টেপের সমান আমাদের চার স্টেপ। এক পর্যায়ে চলন্ত সিঁড়ির দেখা পেলাম। পাশাপাশি অনেকগুলো সিঁড়ি। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামছি তো নামছি। অন্তত: একশ ফুট নামার পর আবার হাঁটা। স্টেশনের নাম রাশান ভাষায় লিখা, তাই পড়তে পারি নি। অপূর্ব সুন্দর। ইংল্যান্ডের যে কোন স্টেশনকে হার মানাবে। এক ট্রেন আসে, ৫ সেকেন্ড থামে, আবার তুফানের মতো চলে যায়। ৩মিনিট পর আবার আরেকটা আসে। তার মানে আমাদেরকে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে ৩০টি লাগেজ নিয়ে উঠতে হবে। আমরা বুদ্ধি করে বসাই পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পাঁচ দরজা দিয়ে ট্রেনে উঠলাম। বুদ্ধির ফল পাওয়া গেল পাঁচ স্টেশন পরে নেমেই। হুড়াহুড়ি করে নামতে গিয়ে দেখা গেল আমার পাসপোর্টের ব্যাগ আছে পাসপোর্ট নেই, পিনাক আছে পিনাকের লাগেজ নেই, সুমনের লাগেজ আছে সুমন নেই। কিছু পুনরুদ্ধার করে কিছু না আমরা আবার ছুটতে থাকলাম। এবার ভূ-পৃষ্টে উঠে স্টেশন থেকে বের হতে হলো। পরবর্তী রেল স্টেশন ১ কি.মি দূরে। আমাদের যেতে হলো বেশ কয়েকটি ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে বাংলাদেশী কায়দায়। অর্থাৎ জেব্রাক্রসিং এর ধার না ধরে দৌঁড়ে রাস্তা পার হয়ে গেলাম। তৃতীয় ট্রেনে উঠতে উঠতে আমাদের চারজন সাথিকে হারালাম। ৪র্ত ট্রেনে আমি ছাড়া বাকী সবাই হারিয়ে গেল………(চলবে)


