এবার কৃষকের ভাগ্য কার হাতে?

এনামুল হক এনি
লঞ্চ যখন ধানকুনিয়া হাওরপাড় ধরে যাচ্ছে তখন দেখা গেলো শত শত কৃষক ফসলরক্ষা বাঁধ টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ লড়ছেন। নদীর পানি উপচে পড়ছে হাওরে বুকে। লঞ্চ থেকে সৃষ্ট ঢেউয়ের চাপে বাঁধের ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কায় কৃষকেরা রাগে ক্ষোভে লাঠি, বাঁশ, কোদাল নিয়ে এগিয়ে আসছেন লঞ্চের দিকে। লঞ্চ থামানোর জন্য বারবার চিৎকার করছেন কৃষকেরা। সারেং ভয় পেয়ে লঞ্চ থামালো। কৃষকদের এমন বিদ্রোহী ভাব দেখে লঞ্চের যাত্রীদের গলা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা। লঞ্চ না থামালে যাত্রীদের ভাগ্যে ভাল মন্দ কিছু একটা অবধারিত ছিল। গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জেলা শহর সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে আমি সেই লঞ্চের একজন যাত্রী হিসেবে ফসলের প্রতি কৃষকের ভালবাসার এমন প্রতিচ্ছবি প্রত্যক্ষ করেছি। ফসলের প্রতি কৃষকের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ এর চেয়ে বেশি আর কি হতে পারে? বরাই নদীর তীরে জয়শ্রী বাজার ঘাট থেকে লঞ্চ সাড়ে ১০টায় ছাড়ার কথা থাকলেও বৃষ্টি আর যাত্রী কম থাকায় প্রায় ঘন্টাখানেক পরে ওইদিন লঞ্চ ছেড়েছিল।
হাওরাঞ্চলের একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করে প্রতিটি কৃষক পরিবারের পরবর্তী এক বছরের খাদ্য নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুরক্ষার বিষয়। যদিও টানা কয়েক বছর ধরে আগাম বন্যার কারণে হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা তাঁদের ফসল শতভাগ ঘরে তুলতে না পারছেন না। অন্যান্য বছর পানি আসার আগে আগে বছরের খোরাকি (খাদ্য যোগান) সংগ্রহ করতে পারতেন। কিন্তু গেলো বোরো মৌসুমে অকাল বন্যা, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দূর্নীতির ফলে প্রায় শতভাগ ফসলডুবির ঘটনার ভয়াবহতা হাওরাঞ্চলের অতীতের যে কোনো দুর্যোগকে হার মানিয়েছে। গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিটিও অপকটে বলেছেন, তাঁরা হাওরের এমন দুর্যোগ কখনও দেখেননি। এতো আগে এভাবে পানি এসে ফসল নষ্ট করেছে এমনটি ঘটেনি।
গত ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখে ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের চন্দ্রসোনার থাল হাওরের শয়তানখালি ফসলরক্ষা বাঁধ দিয়ে ধর্মপাশার বিভিন্ন হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। শুধু ধর্মপাশায় নয় পুরো হাওরাঞ্চলে একের পর এক হাওর ডুবতে শুরু করে এ সময়। যদিও তখন ফসল পুরো পাকেনি বা কাটার উপযুক্ত হয়নি। তাড়াহুড়া করে কাঁচা ধান কেটে গোখাদ্যের চাহিদা মেটাবেন এমন সুযোগও পেলেন না কৃষকেরা। সুযোগ সন্ধ্যানী ব্যবসায়ীরা এমন সুযোগে চালের দাম বৃদ্ধি করে কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলতে শুরু করে। তৎপর হয় প্রশাসন। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসলেও কোথাও কোথাও দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে। কৃষক তাঁর খাদ্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে থাকে। ফসলডুবির ঘটনা সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের সকল মানুষের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে। খাদ্য চাহিদা মেটাতে গোয়ালের গরু পানির দরে বিক্রি করতে শুরু করে কৃষকেরা। ধর্মপাশায় প্রতি বৃহস্পতিবার গরুর হাট বসে। ফসলডুবির পর এপ্রিলের প্রথম হাটে বাজারে যে পরিমাণ গরু ওঠেছিল তা বিগত কোনো হাটে দেখা যায়নি। একদিকে ধান না ওঠায় গোলা খালি, অন্যদিকে গরু বিক্রি করায় গোয়াল খালি হয় কৃষকের। যে যত বড় কৃষক তাঁর ক্ষতির পরিমাণ তত বেশি। যারা ঋণ করে কৃষি কাজে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তাঁদের মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা। একদিকে ঋণের টাকা ও অন্যদিকে  
শ্রমিকদের মুজুরীর টাকা পরিশোধের চিন্তায় পাগল প্রায় কৃষক।
বোরো মৌসুমে কৃষি কাজের সাথে যে সকল শ্রমিক যুক্ত থাকেন তাঁরা কাজের সন্ধ্যানে এলাকা ছাড়তে শুরু করেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে পরিচয়পত্র সংগহের জন্য জনতার ভীড় দেখে মনে হয়েছিল হাওরাঞ্চলে নীরব দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে। দুবেলা দুমুঠো খাবারের চাহিদা মেটাতে প্রিয় বাপ দাদার ভিটা ছেড়ে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলা দরিদ্র কৃষক পরিবারের চোখের জল হাওরাঞ্চলের স্বাভাবিক আনন্দকে ম্লান করেছিল। পরিবারের খুদে সদস্য বা বিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থীরা বেঁচে থাকার তাগিদে অভিভাবকদের সাথে শহরমূখী হয়েছিল কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ব্যেও অনেকেই ফিরতে পারেনি। দিতে পারেনি পরীক্ষা। এনজিওদের ঋণের কিস্তির চাপে অসহায় কৃষকদের জীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে। কিস্তি আদায়ে চাপ প্রয়োগ না করার জন্য এনজিওদের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হলেও বিভিন্ন কৌশলে কিস্তি আদায় অব্যাহত থাকে।
তখন বৃষ্টি না থাকায় হাওরের পানিতে স্থীর ধরে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে ৫/৬ মিলিগ্রাম কমে যায় এবং প্রতি লিটারে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায় দশমিক পাঁচ (.৫) থেকে ১ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। ফলে পানিতে পচন দেখা দিয়ে অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে হাওরে মাছের মড়ক দেখা দেয়। এতে মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পচা পানিতে খাবার খেয়ে হাঁসেরও মড়ক দেখা দিয়েছিল তখন। অগভীর জলাশয়ে পচনশীল উদ্ভিদ বা মৃত প্রাণি জমা হলে ঐ জলাশয়ের পানির নীচের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। ফলে অক্সিজেনের অভাবে কীট-পতঙ্গ, শামুক, ঝিনুক ও মাছ ইত্যাদি মারা যায়। এসব জীব পচে জীবাণু তৈরি করে রোগ সৃষ্টি করে থাকে। হাঁস সাধারণত কাদামাটিতে খুটে খাবার খাওয়ার ফলে এই জীবাণু হাঁসের অন্ত্রে বিরাজ করে। ফলে হাঁস বটুলিজম রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ রোগ ওয়েস্টার্ন ডাক সিকনেস নামেও পরিচিত। ক্লোস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া সৃষ্ট নিউরোটকসিন এ রোগের প্রধান কারণ। তবে হাঁসের মৃত্যুর কারণ বটুলিজম কি না নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি।
খাদ্য ঘাটতি পূরণে ওএমএস, ভিজিএফসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করা হলে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি দেখা যায়। তবে সকাল থেকে ওএমএসের চাল বিক্রি শুরু হলেও ভোর থেকে অভাবী মানুষজনকে সংশ্লিষ্ট ডিলারের দোকানের সামনে বসে থাকতে দেখা গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় ওএমএসের চালের বরাদ্দ অপ্রতুল হওয়ায় অনেকেই খালি হাতে ফিরেছেন। আবার অনেক ধনীর পরিবারের লোকজন লোক ভাড়া করে ওএমএসের চাল সংগ্রহ করেছেন। ওএমএসের চাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগে ধর্মপাশা সদর ইউনিয়ন ও বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের ডিলারশীপ বাতিল করে প্রশাসন। ভিফিএফের তালিকা তৈরিতেও হয়েছে বিভিন্ন অনিয়ম। আত্মীয়করণ, দলীয় প্রভাব বিস্তারের ফলে উপযুক্তরা বঞ্চিত হয়েছেন কোনো কোনো ইউনিয়নে। ওএমএসের চাল আত্মসাতের অভিযোগে ধর্মপাশা খাদ্য গুদামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছেন। আবার ওএমএস ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের এক গ্রাম পুলিশ হেনস্থা হয়েছেন এমন ঘটনাও উল্লেখ করার মতো।
গভীর পানির ধান আর ঘি’য়ের উপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠেছিল ধর্মপাশার মধ্যনগর বাজার। এখন আর ঘিয়ের আড়ত নেই এখানে। কিন্তু এখানে অর্ধশতাধিক ধানের আড়ত রয়েছে। প্রতি বছর বৈশাখে হাওরগুলোতে ধানা কাটা শুরু হলে মধ্যনগর বাজারের আড়তগুলোতে উৎসবমূখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধান সংগ্রহের জন্য সুমেশ্বরী নদীতে সারিবদ্ধভাবে বড় বড় নৌকা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আনন্দের সাথে আড়ত থেকে ধান তোলা হয় নৌকায় এবং ধানের চালান নিয়ে যাওয়া হয় দেশের বিভিন্ন চাতালে। এখান থেকে চালান হওয়া বিপুল পরিমাণ ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। এবার এখানে কেউ আসেনি। ধানের আড়তগুলোতে তখন থেকে তালা ঝুলছে। কারও জানা নেই এই তালা আর খুলবে কি না।
বাঙালির অন্যতম উৎসব পহেলা বৈশাখে হাওরাঞ্চলে কোনো উৎসব দেখা যায়নি। জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বাঁধের কাজে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। হাওরাঞ্চলকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষণার দাবি উঠেছিল সর্বমহলে। তবে দুর্গত এলাকা ঘোষণা নিয়ে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরূপ মন্তব্য হাওবাসীকে মর্মাহত করেছিল। সৃষ্টি হয়েছিল মিশ্র প্রতিক্রীয়ার।
ফসলডুবির পরপরই জেলেদের জন্য জলমহালগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি ওঠেছিল কিন্তু কোথাও কোনো জলমহাল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। ধর্মপাশা, তাহিরপুর, দিরাইসহ অন্যান্য উপজেলায় জলমহালের ইজারাদারদের সাথে স্থানীয় জেলেদের সংঘর্ষে নিহত ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইজারাদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের নির্ধারিত সীমানার বাইরে এসে ভোগ দখল করায় এমনটি ঘটেছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন সংগঠন হাওরপাড়ের মানুষকে সাহায্য করার জন্য ছুটে এসেছেন। প্রমাণ করেছেন মানুষ মানুষের জন্য। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচনী প্রচারণায় রয়েছেন এমন কয়েকজন প্রার্থীকে ত্রাণ দিতে দেখা গেছে। তবে সরকার দলীয় এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন তাঁর নির্বাচনী এলাকার (ধর্মপাশা-মধ্যনগর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ) ৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এক বছরের বেতন পরিশোধের ঘোষণা দিয়ে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। শুধুমাত্র বাদশাগঞ্জ পাবলিক হাই স্কুলে ১ লাখ টাকা বেতন পরিশোধ করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন ডিসেম্বর মাসে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন পরিশোধ করে দিবেন। কিন্তু ৩১ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেই বকেয়া বেতন পরিশোধ করেননি। কিন্তু কেন?
ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কাবিটার নতুন নীতিমালা তৈরি করেছে। নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু করার কথা ছিল কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ধর্মপাশা উপজেলার কোথাও কোনো বাঁধে কাজ শুরু হতে দেখা যায়নি। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করার দায়িত্ব ছিল উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির ওপর। নির্ধারিত সময়ে পিআইসি গঠন হয়নি। পিআইসি গঠনে স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে কিছুটা বিব্রত হতে দেখা গেছে সংশ্লিষ্টদের। কোনো কোনো উপজেলায় পিআইসি গঠনে বিলম্ব হওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা হাওরের জলাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। অথচ জলাবদ্ধতার সাথে পিআইসি গঠনের কোনো সম্পৃক্ততাই নেই। জলাবদ্ধতা হাওরের নতুন সংকট। অন্য বছর কার্তিক মাসের শেষ দিকে কৃষকেরা হাওরে বীজতলা তৈরি করে বীজ বপনের কাজ শুরু করেন। এরপর শুরু হয় চারা রোপন। কিন্তু এবার পৌষ মাসে এসেও হাওরের পানি নামছে না। ফলে বীজ বপন থেকে শুরু করে চারা রোপনে বিলম্ব হচ্ছে।
এবার কৃষকের ভাগ্য কার হাতে? প্রকৃতি নাকি মানুষের? প্রকৃতির ওপর মানুষের হাত নেই। তবে দুর্নীতিবাজ মানুষের কারণে যদি এবার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও  মেরামত কাজে গাফিলতি হয় আর ফসলডুবে তাহলে তা হবে হাওরবাসীর জন্য চরম দুঃখের। যা হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ফেলবে বিরূপ প্রভাব।
লেখক – সাংবাদিক