স্বপন কুমার দেব
চায়না মার্কেট ও স্ট্রবেরী ফার্ম
শেষ হয়ে আসছিলো লেখা। সে রকম বলে দিয়েছিলাম ১৩ তম পর্বে। কিন্তু অনিবার্য কারণে শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ। নানা ব্যস্ততায় অনুপস্থিত কিংবা মাঝে মাঝে উপস্থিত থাকলেও লেখার সময় পাইনি। আবার বলা যায় এক ধরণের ব্লক তৈরী হয়েছিলো। যাই হোক এখন শেষ করতে হবে শেষ অধ্যায়। কুয়ালালামপুর শহরে বেড়াতে গেছেন কিন্তু চায়না মার্কেট ঘুরে আসবেন না তা হয় না। বাস্তবে যাই হোক না কেন চায়না মার্কেটের নামধাম ভ্রমণকারীদের তালিকায় থাকবেই। এমনকি সরকারী ভাবেও সেখানকার দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে চায়না মার্কেট একটি। চায়না মার্কেট সম্পর্কে নানা কথা চালু আছে। যেমন যে মূল্যে যে জিনিসই কিনেন না কেন আপনি ঠগবেন তা নিশ্চিত। দাম শুরু করতে হবে চাওয়া দামের অনেক নিচু থেকে। তারপর উঠা, বাড়া। আবার অনেকের উপদেশ ঘুরে আসেন তবে কেনাকাটা না করাই ভালো। তবে যে উদ্দেশ্যেই হোক চায়না মার্কেট ঘুরে দেখতে কোন পক্ষেরই আপত্তি নেই। এতএব যাওয়া অনিবার্য। চায়না মার্কেট এলাকাকে চায়না টাউন নামেও বলা হয়ে থাকে। ঘুরতে যাবার আগে এর ইতিহাস সম্পর্কে একটুখানি আলোচনা করা যেতেই পারে। শহরের যে এলাকায় অবস্থিত তার নাম পেটালিং স্ট্রিট। খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত। সারা মালয়েশিয়ায় চীনাদের শতকরা জনসংখ্যার হার পনেরো শতাংশের উপরে। কুয়ালালামপুরে যথেষ্ট পরিমাণে চীনারা বসবাস করেন। তারমধ্যে চায়না টাউন অন্যতম। চায়না টাউন এলাকাতেই কুয়ালালামপুর শহরের পত্তনের শুরু থেকে ক্রমশ: চায়না মার্কেট গড়ে উঠে। শহরের মধ্যস্থলে চায়না মার্কেটের সামনে গিয়ে যখন আমরা গাড়ী থেকে নামলাম তখন সেখানে লোকে গিজগিজ করছে। গলি ঘিনজি এলাকা। অনেকটা কলকাতার নিউ মার্কেটের মতো। তবে শানশওকত কম। কিন্তু টাইপটা সেরকমই। হরেক রকমের দোকান আর পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানীরা। চারিদিকে হাঁকডাক। একচেটিয়া চায়নাম্যনদের আর আধিপত্য নেই। এখন অন্যরাও আছেন। এমনকি বাংলাদেশের অনেক ছেলেরাও দোকান নিয়ে বসেছেন। এমনিতেই একটা মাইন্ড সেট্আপ ছিলো শুধু দেখব, কোন কিছু কেনাকাটা নয়। কিনলে ঠগতে হবে। কিন্তু ঠগাঠগি নেই কোথায়? সর্বত্রই এ বিদ্যা বিদ্যমান। একটা কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় কোনও ব্র্যান্ডের কোন বিশেষ পণ্য কিনতে হলে সেই ব্র্যান্ডের স্বীকৃত ব্র্যান্ড শাখা থেকে অবশ্যই কিনে নিবেন। নইলে আসল জিনিসের বদলে পাবেন নকল কিংবা পরিমার্জিত ভাষায় ‘রেপ্লিকা’। এর চেয়ে জেনে শুনে চায়না মার্কেটের মতো বাজার থেকে কেনা বরঞ্চ ভালো। আমরা না না করেও দু’একটা পণ্য কিনে নেই। মেয়েদের লেডিজ ব্যাগ ইত্যাদি। এদিকে ভীড় ক্রমশ: বাড়ছে। গরমও বাড়ছে। কেনাকাটা করতে গিয়ে দেখলাম খুব একটা আকাশ পাতাল দাম দর করা যায় না। এমন দিন সামনে আসবে যখন চায়না মার্কেটও এক দামের মার্কেট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে। তখন অবশ্য আকর্ষণ কমে যাবে অনেকটাই। আপনারা সবাই জানেন ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তন ঘটে গেছে। আধুনিক মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকার মোহাম্মদ মাহাথিরো পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেছেন।
মালয়েশিয়াকে একটা সুউচ্চ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়েছিলেন। ৯২ বছর বয়সে আবার স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন করেছেন নির্বাচনে জয়লাভ করে। একটা আঁচ পেয়ে এসেছিলাম সেভাবেই। হয়তো উনার হাতেই অধিক উন্নতির অপেক্ষায় ছিলো মালয়েশিয়া। যাই হোক স্ট্রবেরী ফার্মের কথায় আসা যাক। মোটামুটি সবাই জানেন স্ট্রবেরী এক ধরনের সুস্বাদু ফল। অনেকটা পাকা লিচুর মতো। আকারেও তেমনি। দেখতে উজ্জ্বল ও লাল রংয়ের । খেতে রসালো ও মিষ্টি। এক কথায় মজাদার। আইসক্রীম, চকোলেট, জুস নানা মুখরোচক খাদ্য ও পাণীয় তৈরীতে স্ট্রবেরী ফল ও রস ব্যবহার করা হয়ে থাকে। স্ট্রবেরী স্বাদের এসব খাদ্য বাজারে, বিশেষত: ছোটদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এমনকি স্ট্রবেরীর কৃত্রিম গন্ধও মন ছুঁয়ে যায়। স্ট্রবেরীর মূল উপাদানগুলি পাওয়া যেতো উত্তর আমেরিকায়। মনে রাখতে হবে কয়েকটি উপাদানের মিশ্রণে স্ট্রবেরীর জন্ম। ১৭১৪ খ্রি: থেকে ফ্রান্সে প্রথমে পূর্ণাঙ্গ স্ট্রবেরী প্লান্টে স্ট্রবেরী উৎপাদন শুরু হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। স্ট্রবেরীর অনেক ধরনের ঔষধি গুণাগুণ আছে। যেমন চোখের জ্যোতি ঠিক রাখতে সাহায্য করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, নানা ধরনের বাতের যন্ত্রণা নিরাময়ে ফলদায়ক। হার্টের বিভিন্ন রোগে স্ট্রবেরী কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম। সর্বোপরি দেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে ক্যান্সার সহ বিভিন্ন রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। তবে স্বাদে মিষ্টি বিধায় ডায়াবেটিস রোগীদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়াই উত্তম। সারা মালয়েশিয়ায় অনেকগুলি স্ট্রবেরী ফার্ম আছে। উৎপাদন হয় অনেক, হয়তো রপ্তানীও হয়। রপ্তানী মানেই তো আয়। আমরা কুয়ালালামপুর শহরের ধারে কাছেই একটি ফার্ম দেখতে যাই। টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকতে হয়। বিশাল উদ্যান। শুধু স্ট্রবেরী ফলের গাছ নয় নানা ধরনের ফুলেও আচ্ছাদিত এবং প্লটে প্লটে বিভক্ত। উপরে নানা ধরনের আচ্ছাদন। সেগুলিতেও বাহারি ফুল। ভেতরে ভেতরে পাকা করা আইল পথে চলাফেরা করতে হয়। প্রচুর পরিমাণে দর্শনার্থী। নয়নাভিরাম পুষ্প উদ্যানে কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছ গাছরাও আছে। স্টিকারে নাম লেখা। তবে আমাদের কাছে দুর্বোধ্য। আমরা যেসময় স্ট্রবেরী ফার্মে গিয়েছিলাম তখন গাছ থাকলেও ফল নেই। কারণ ফল ধরার মৌসুম তখন ছিল না। এক একটি পুষ্প উদ্যান যেনো একেকটি আলাদা জগৎ। ফুলে বা ফলে হাত ছোঁয়ানো নিষিদ্ধ। কিন্তু বাচ্চাদের হুটোপুটি নিষিদ্ধ করলেই বা কি আর না করলেই বা কি আসে যায়। শিশুদের কলতান কারো পক্ষে থামানো সম্ভব নয়। আর থামালে অর্ধেক সৌন্দর্য্যই কমে যাবে। যত ফুল আর ফল ততো ফটো সেশন। বিরামহীন ভাবে চলছে ফটো তোলা। সেলফি, ডেলফি কত কিছু। এখন সবাই বলবেন ডেলফি আবার কি? আসলে কিছু না। চায়ের সঙ্গে টায়ের মতো। ঘুরতে ঘুরতে আমরাও ক্লান্ত। মাঝে মাঝে ফার্মের নিজস্ব দোকান ঘর এবং বিভিন্ন রকম বিনোদনের ক্যাম্প আছে। দোকানগুলিতে অনেক রকমের পণ্য পাওয়া যায়। মাঝারি আকৃতির এক বাক্স স্ট্রবেরী কিনলাম ‘সোনালী সকাল’ এর বন্ধুদের জন্য। ইতোমধ্যে আমাদের প্রাত:ভ্রমণের সংগঠনের এই নামটি দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে গেছে। অনুজপ্রতীম স্নেহভাজন সাংবাদিক শামস্ শামীমের ‘সোনালী সকাল’ সম্পর্কে একটি চমৎকার সচিত্র প্রতিবেদন ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে সর্বত্র সাড়া ফেলেছে। প্রথম আলোর দক্ষ সাংবাদিক ছোট ভাই স্নেহভাজন খলিল রহমানের আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় ছিলাম। ইতোমধ্যে খলিলের চমৎকার প্রতিবেদনটি ছাপা হয়ে গেছে। এতে আরো ঢেউ উঠেছে। খলিল রহমান ও শামস শামীমকে ‘সোনালী সকাল’ এর তরফ থেকে সোনালী ধন্যবাদ। যাই হোক স্ট্রবেরী কিন্তু বন্ধুদের আর দেওয়া হয়নি। জানতাম না এগুলি সম্পূর্ণরূপে ফরমালিন মুক্ত। দুই দিন পর দেশে আসার প্রাক্কালে ব্যাগ গুছাতে গিয়ে দেখি রস বেরিয়ে পঁচন ধরে গেছে। হায়রে ফরমালিন। দুদিকেই কাটে। আশাকরি আগামী সংখ্যায় পেনাং পর্ব দিয়ে লেখার সমাপ্তি টানতে পারবো। (চলবে)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক


