গোটা দেশকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন সেটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের যোগাযোগ নেটওয়ার্কের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা দিয়েছেন। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও একসময় পাতাল রেল ও বুলেট ট্রেন চালু হবে। বিগত ৮ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনার দৃশ্য পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছেন। বলা যায়, স্বাধীনতার পর এত উন্নয়ন আর কোন শাসনকালে দেখা যায়নি। সড়ক যোগাযোগের প্রভূত উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন সড়ক নির্মাণ, পুরাতন সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ, পুরাতন সেতু ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণ এমন অসংখ্য কাজের ফলে বাংলাদেশে এখন একটি ভাল সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। আমাদের জেলা সুনামগঞ্জের দিকে তাকালেও এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এখন জেলার যেকোন উপজেলায় সড়ক পথে যাতায়াত সম্ভব। যে তাহিরপুরে যেতে মানুষ রীতিমতো প্রস্ততি নিয়ে রওয়ানা হত এখন তারা যখন ইচ্ছা তখনই তাহিরপুর থেকে ঘুরে আসতে পারছেন। শাল্লা ও ধর্মাপাশায়ও বিকল্প ব্যবস্থায় দ্রুত সড়কপথে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এই দুই উপজেলার সরাসরি সড়ক নেটওয়ার্ক দ্রুত চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। রাজধানী ঢাকার সাথে যোগাযোগ সময় ক্রমশ কমছে। রানীগঞ্জের কুশিয়ারা সেতু সম্পন্ন হলে ঢাকায় যাওয়ার জন্য দেড়/দুই ঘণ্টা সময় কমে যাবে। সড়ক যোগাযোগের এত উন্নয়নের মাঝেও এই আট বছরে রেল বিভাগের বড় কোন উন্নয়ন চোখে পড়েনি। শুধু বর্তমান সরকারের আট বছর নয় বরং পাকিস্তান আমল ও স্বাধীনতার পর রেল লাইন উন্নয়নের জন্য জনগণের যে আকাক্সক্ষা ছিল তার ধারে কাছেও পৌঁছানো যায়নি। অবশ্য মাঝখানে এরশাদ সরকারের সময় আন্তনগর ট্রেন চালুর মাধ্যমে কিছুটা উন্নয়ন আনার চেষ্টা করা হয়েছিল পরবর্তীতে যা আটকে যায়। অথচ এই সময়ে পৃথিবীর সব দেশই রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। জাপানে চালু বুলেট ট্রেন ঘণ্টায় কয়েক শ’ কিলোমিটার বেগে চলাচল করে। ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত রেল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হয়েছে। লন্ডনে পাতাল রেলের মাধ্যমে স্বল্পপাল্লার যোগাযোগকে আরামদায়ক ও নির্ঝঞ্ঝাট করা হয়েছে। সারা পৃথিবীতেই সাধারণ মানুষের মূল পরিবহন খাত হিসাবে রেলপথকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু কেন জানি আমাদের দেশেই রেল লাইনের পরিবর্তে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হিসাবে সড়কপথকেই সামনে রাখা হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যয়সাধ্য ও ঝুঁকিবহুল। পক্ষান্তরে রেল যোগাযোগ সাশ্রয়ী ও কম ঝুঁকির। এরকম প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সারা দেশে রেলপথ সম্প্রসারণের ঘোষণা সকলকে আশান্বিত করবে নিঃসন্দেহে।
সুনামগঞ্জের ছাতকে রেললাইন থাকলেও মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরের জেলাসদর পর্যন্ত এই লাইন আর সম্প্রসারণ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে এই এলাকার মানুষ জেলা সদর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত রেলমন্ত্রী থাকা কালে এই দাবি আরও জোরালো হয়েছিল। মন্ত্রীর আশ্বাসে মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল এবার সুনামগঞ্জে রেললাইন আসবেই। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির কারণে প্রবীণ এ্ই রাজনীতিকের মন্ত্রীত্বকাল স্বল্পায়ু হওয়ায় মানুষের আশার প্রদীপ আবারও নিভে যায়। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে এই এলাকার মানুষের রেলসেবা প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানোর চেষ্টার মধ্যে কোন ঘাটতি তৈরি হয়নি। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সুনামগঞ্জবাসীর মনে নতুন করে প্রেরণা জুগিয়েছে। এখন আমরা প্রতীক্ষায় রইলাম সেই শুভক্ষণের যখন সরকার প্রধান সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন কাজের উদ্বোধন করবেন।

