ব্রেক্সিট: অব্যাহত রাখতে হবে কূটনৈতিক তৎপরতা

ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ব্রিটেনের থাকা না থাকার প্রশ্নে গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটেনবাসী ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষেই মত দিয়েছেন। ইইউতে থাকার পক্ষে ও বিপক্ষে যথাক্রমে ৫২ ও ৪৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতে তথা জনরায়ে প্রথম দেশ হিসেবে ব্রিটেন ১৮ জাতির জোট ইইউ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ইইউর সঙ্গে থাকার পক্ষাবলম্বী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের নতুন পথ চলার জন্য প্রয়োজন নতুন নেতৃত্ব।
সারা বিশ্বেই এটি এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কারণ ব্রিটেন তো বটেই বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এ ঘটনার অবশ্যম্ভাবী প্রভাব রয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থনীতিতে এর অভিঘাত দৃশ্যমান হয়েছে। প্রাথমিক ধাক্কায়ই ডলারের বিপরীতে ব্রিটেনের মুদ্রা পাউন্ডের ১০ শতাংশ দরপতন হয়েছে। ব্রিটেনের শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। ইইউ-প্রশ্ন গণভোটে ব্রিটিশ জাতির বিভক্তিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইইউর পক্ষে লন্ডনে এবং বিপক্ষে ওয়েলস ও ইংল্যান্ডে জনরায় এসেছে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ছিল ইইউর পক্ষে। এখন ইংল্যান্ডকে স্বাধীন করে ইইউতে সংযুক্তির দাবি উঠেছে। আবার ব্রিটেনভুক্ত হয়ে স্কটল্যান্ডের থাকা না-থাকার প্রশ্নে আরেক দফা গণভোট আয়োজনের দাবিও জোরালো হচ্ছে। এ অবস্থায় ব্রিটেনের অখন্ডতাও হুমকির মুখে পড়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সব দিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ব্রিটিশ নেতৃত্ব। ব্রেক্সিটের (এক্সিট অব ব্রিটেন) এই দৃষ্টান্ত ইইউভুক্ত অন্য দেশগুলোতেও জনমতকে একইভাবে প্রভাবিত করতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে ইইউর গুরুত্ব¡ ও কার্যকারিতাও সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটেনবাসী যারা ব্রেক্সিটের পক্ষাবলম্বন করেছেন তারাও নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে এমন যুক্তিতেই তা করছেন। ব্রিটেনে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বাংলাদেশি অভিবাসী। এদের বড় অংশই ইইউতে থাকার পক্ষে ছিলেন, তবে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকে মনে করছেন ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে যে অভিবাসী চাপ ব্রিটেনের ওপর ছিল তা হ্রাস পেলে এশিয়ার অভিবাসীদের জন্য সুবিধাজনকই হবে। অন্যদিকে ভিন্নমত হলো- ব্রিটেনে বেক্সিটের পক্ষে যে নেতৃত্ব তারা সাধারণভাবে অভিবাসীদের প্রতিই বিরূপ। তাদের কাছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মর্যাদা ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত হবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকছেই।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন মুক্ত হওয়ার পর এর প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কেমন পড়বে, ব্রিটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো কেমন দাঁড়াবে, সেটা এখন আমাদের জন্য ভাবনার বিষয়। ব্রিটেনের ইইউ থেকে মুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। প্রথমত, বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে অভিবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার বা রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পর ব্রিটেন আমাদের রেমিটেন্সের তৃতীয় বড় উৎস। গণভোটের ফলাফল প্রকাশের পরপরই ডলারের বিপরীতে ব্রিটেনের মুদ্রা পাউন্ডের ১০ শতাংশ দরপতন হয়েছে। এভাবে পাউন্ড, স্টার্লিংয়ের দরপতন ঘটতে থাকলে আমাদের রেমিটেন্স আয়ের পরিমাণও কমবে। দ্বিতীয়ত, প্রভাব পড়তে পারে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে বছরে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয় শুল্কমুক্ত সুবিধায়। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে কিনা সেটা ভাবনার বিষয়। যাই হোক, ব্রিটেন রাতারাতিই ইইউ থেকে বেরিয়ে আসছে না, বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে নতুন ব্যবস্থায় যেতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। এ সময়ে আমাদের কাজ হবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। নতুন ব্যবস্থায় যেন বাংলাদেশ-ব্রিটেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অটুট থাকে, বাণিজ্য সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়- এটাই আমাদের চাওয়া। এর জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে সরকারকে।