জামালগঞ্জ অফিস
জামালগঞ্জে এগিয়ে চলেছে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজের প্রাক জরিপ কাজ। গত ১৮ নভেম্বর উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভায় সংশ্লিষ্টদের বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয়। উপজেলার অধিকাংশ হাওরে পানি থাকায় যথাসময়ে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরুর ব্যাপারেও শঙ্কা প্রকাশ করেছে পাউবো। অন্যদিকে পিআইসি গঠন নিয়েও শঙ্কিত কৃষক।
জেলা পর্যায়ে বাঁধ নির্মাণ কাজে প্রথম পর্যায়ে ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দের পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। প্রাক জরিপ ও প্রকল্প নির্ধারণের পর এ ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন উপজেলার কৃষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ। বিগত বছর পিআইসিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের অপ্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকায় এ বছরও এ রকম হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাদের দাবি পিআইসি গঠনের ক্ষেত্রে স্ব-স্ব ইউনিয়নের হাওর পারস্থ কৃষকের সাথে আলোচনা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া প্রকল্প কমিটি গঠন জেলায় না করে বরং স্থানীয়ভাবে গণশুনানির মাধ্যমে উপজেলায় বসে করার পক্ষে মত দিয়েছেন অনেকে।
২০১৭ সালে ফসল বিপর্যয়ের পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলে ঠিকাদার ও পিআইসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়। পরে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সরাসরি যুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় কৃষককে। তবে স্বচ্ছতার স্বার্থে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করা হলেও পিআইসি গঠনে অব্যাহত রয়েছে সেই পুরোনো খেলা।
২০১৭ সালের ফসলহানিতে অভিযুক্ত পলাতক জনপ্রতিনিধিসহ চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের পিআইসি প্রধান কিংবা পরোক্ষভাবে পিআইসিতে যুক্ত করার বিষয়টি বিগত বছরের মতো এবারও ভাবাচ্ছে কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে। একদিকে অভিযুক্তদের পিআইসিতে না রাখার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিতর্কিতদের কোন না কোনভাবে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ তো আছেই। সব মিলিয়ে স্বস্তিতে নেই হাওর পারের অগণিত কৃষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
এ ব্যাপারে বেহেলী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও হালি হাওর পাড়ের কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ তাদের পছন্দের মানুষ অর্থাৎ যাদের কোন জমিজমা নাই তারাই মূলত পিআইসির কাজ পায়। কৃষকদের কথা শুধু মুখেই বলা হয়। কিন্তু কাজে অর্থে কোন কৃষককে বাঁধের কাজে সম্পৃক্ত করা হয় না। আমরা চাই প্রতিটি ইউনিয়নের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের সাথে সভা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতেই যেন পিআইসি করা হয়।’
ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ধলাপাগনা হাওর পাড়ের রাজাপুর গ্রামের কৃষক মোঃ শামছুদ্দীন জানান, ‘পিআইসি কিতা বুঝি না, কথা হইলো কাজডা সুন্দর ও ভালা হইতো। কৃষকের উপকার হইতো। কিন্তু যারারে বান্ধের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় তারা মেম্বার-চেয়ারম্যান না হইলে সরকার দলের মানুষ। কৃষকরারে নিয়া এই কাজ করলে ভালা হইব।’
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জামালগঞ্জে কৃষক রয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৬০ জন। চলতি বছরে এ উপজেলায় ২৫ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ২ হাজার ৬৫০, উপসি ২২ হাজার ৫শ’ এবং স্থানীয় ২শ’হেক্টর জমি রয়েছে। গত বছর ২৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। গতবারের তুলনায় এ বছর ৬শ’৯০ হেক্টর জমি বেশি আবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর।
হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুযায়ী আমরা প্রতি বছরই ডিসেম্বরের ৫ তারিখের মধ্যে বাঁধ এবং বেড়িবাঁধের প্রয়োজনীয়তা নির্ণয় করি। অনেক বাঁধ এখনও পানির নীচে থাকায় পাউবো কিভাবে সঠিক জরিপ চালাবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কৃষকের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে যেন পিআইসি গঠন করা হয়।’
উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ সহকারী প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, ‘হাওরের পানি এখনও সরেনি। যে দু’একটি স্থানে পানি সরেছে সেখানে প্রাক জরিপ চালানো হচ্ছে। এর জন্য জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী অফিস থেকে দুইটি ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পাউবো এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে জরিপ কাজ চলছে। অপর এক প্রশ্নের তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শেষ করার পর বরাদ্দ কতটুকু লাগতে পারে তা বলা যাবে এবং পিআইসি গঠনের প্রক্রিয়াও তখন শুরু করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘হাওরে প্রাক জরিপ চলছে। এই জরিপের ফলাফল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপর পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত আসবে।’ পিআইসি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে যাব এবং স্থানীয় কৃষকদের মতামত নিয়েই পিআইসি গঠন করব।’
হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের জামালগঞ্জ উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ বলেন, ‘গণশুনানীর মাধ্যমে বাঁধের তীরবর্তী কৃষকদের নিয়ে ও তাদের মতামতের ভিত্তিতে পিআইসি গঠন করতে হবে। পিআইসি গঠন প্রক্রিয়া যেন উপজেলা পর্যায়েই সম্পন্ন করা হয়। জেলায় বসে পিআইসি করলে কৃষকদের মতামতের প্রতিফলন ঘটে না।’


