রঙ্গারচর, সদর উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন জনগণের

আকরাম উদ্দিন
সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রার্থীরা উঠে পড়ে লেগেছেন। প্রার্থীরা মনোনয়ন পেতে জেলা নেতৃবৃন্দ ও কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। ভোটারদের কাছে তাঁরা দলীয় মনোনয়ন পাবেন এমন প্রতিশ্র“তি দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।  ১৯টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এই রঙ্গারচর ইউনিয়নে ৩৫ হাজার জনগণের বসতি রয়েছে। ভোটার আছেন ১৭ হাজার।
এদিকে, প্রার্থীদের প্রচারণার পাশাপাশি ভোটারদের শুরু হয়েছে এলাকায় উন্নয়ন নিয়ে হিসাবের খাতা মেলানোর পালা। তাঁরা গত ৫ বছরে এলাকায় কেমন উন্নয়ন হয়েছে, কী অঙ্গিকার ছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির, এ নিয়ে নিজেদের বৈঠকে সরব হচ্ছেন।
এলাকাবাসী জানান, বিগত সময়ে ইউনিয়ন এলাকায় বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্ব ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা ইত্যাদি শুধু টাকার বিনিময়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। এইসব কার্ড প্রদানে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে টাকা লেনদেন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এমনকি এমন অভিযোগও আনা হচ্ছে যে,  জীবিত ব্যক্তিদের মৃত বানিয়ে কার্ডের ভাতাও উত্তোলন করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।
এলাকায় রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন বিষয়ে স্থানীয় জনগণ জানান, রঙ্গারচর-হরিণাপাটী প্রাইমারী স্কুল থেকে রজব আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার সংস্কার কাজ হয়নি। চান্দপুর-চাতলপাড় স্কুল ও মাজারে যাতায়াতের  রাস্তা সংস্কার কাজ হয়নি। চান্দপুর থেকে নায়েরধারা এলাকায় রাস্তার কাজ হয়নি। চান্দপুর ওয়াপদার বাঁধ হতে মনাফ মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ হয়নি। হরিনাপাটী পশ্চিমপাড়া উত্তর দিকের রাস্তার কাজ হয়নি। বৃন্দাবননগর-রংপুর রাস্তার কাজ হয়নি। অজুদ মিয়ার বাড়ি থেকে নুরুজ আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ হয়নি। এছাড়াও এলাকায় অনেক আবাসিক রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন কাজ হয়নি বলে জানান এলাকার লোকজন। এইসব রাস্তা সংস্কার না হওয়ায় সারাবছর পথচারীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ১,২ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বিগত সময়ে পর্যাপ্ত ও প্রত্যাশিত  উন্নয়ন কাজ হয়নি বলে জানান ওয়ার্ডবাসী।
হরিনাপাটী রঙ্গারচর এলাকায় সরকারী বরাদ্দের প্রায় সকল নলকূপ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁরা জানান, বিগত কয়েক মাস আগে এলাকায় ১৮টি নলকূপ টাকার বিনিময়ে স্থাপন করে দেয়া হয়েছে। রঙ্গারচর এলাকার জনৈক ব্যক্তির একই বাড়িতে দুইটি নলকুপ এবং সাইদুল ইসলামের বাড়িতে ঘরের ভেতরে ১টি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। ইউনিয়নের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অসহযোগিতায় বিগত ৫ বছরে এলাকার উন্নয়ন অবহেলিত বনগাঁও, বৃন্দাবননগর, হাসাউড়া, নৈগাং, শাহাপুর, রংপুর ইত্যাদি গ্রামে বিদ্যুতের ছোঁয়াও লাগেনি।   
ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা রয়েছে আদারবাজার, হরিনাপাটী, হাসাউড়া, বনগাঁওবাজার, নৈগাংবাজার, রংপুরবাজার, ছফেরগাঁওবাজার ও বিরামপুর এলাকায়। ইউনিয়নের মধ্যে বিএনপি’র সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান ফরহাদ রাজা চৌধুরী, আব্দুল আলিম, আব্দুল হাই ও নুরউদ্দিনের প্রচার আছে। আ’লীগের মো. আবুল কালাম, মো. মিজান মিয়া, মো. সামাদ মিয়া, আব্দুল করীম, মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মজিদ, মো. আর্শাদ মিয়া ও জাহাঙ্গীর আলমের প্রচার রয়েছে। এছাড়াও জাপার ফয়জুর রহমানের প্রচার রয়েছে এলাকায়।
ছফেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় কোনো উন্নয়নের কথা বললে মেম্বার-চেয়ারম্যানরা শুধু নাই নাই বলেন। সরকার নাকি বরাদ্দ দেন না তাঁদের। এমন প্রার্থীদের নির্বাচিত করা উচিত নয়।’
বনগাঁও এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সকল শ্রেণী পেশার মানুষ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। এবার প্রার্থীর সংখ্যা একটু বেশি। নাগরিকগণ সেবা নিশ্চিত করতে দুর্নীতি রোধ করতে হবে। এবার চিন্তা করে ভোট দেবো।’  
নৈগাং এলাকার বাসিন্দা সাস্তু মিয়া বলেন, ‘আমরা এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে প্রতি বছর সৎ, নিষ্টাবান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভোট দেই। কিন্তু আশানুরূপ উন্নয়ন হয় না এলাকায়। ভাতার কার্ড নিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে ভাল প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে দূর্নীীত বন্ধ করা উচিত।’
এলাকার বাসিন্দা সৌরভ মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের জন্য কেউ চেষ্টা করেন না। বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের উন্নয়নে আমরা অবহেলিত। শহর এলাকা থেকে এখনও ৫০ বছর পিছিয়ে আছি আমরা। আমাদের সকল বিষয়ে উন্নয়ন প্রয়োজন। যে প্রার্থীর দ্বারা আমাদের উন্নয়ন সাধিত হবে, তাকে ভোট দেয়ার বিষয়টি সকলের বিবেচনায় এনে সৎ, ত্যাগী ও শিক্ষিত প্রার্থীকে ভোট দেয়া প্রয়োজন।’
রঙ্গারচর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমি সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছি। আমি নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়ন করব। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে আমি দুর্নীতি রোধ করব। এটা আমার অঙ্গিকার।’ এলাকায় টেকসই উন্নয়ন এবং ভাতার কার্ডের বাণিজ্য বন্ধ করতে আমাকে নির্বাচিত করুন।’
এলাকার ভোটার রহিমা আক্তার বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমরা অল্পতে গলে গিয়ে যাকে ইচ্ছে ভোট দিয়ে দেই। পরে ৫ বছর যাবত এলাকার উন্নয়নের কথা বলে হতাশায় ভোগি। এবার শিক্ষিত প্রার্থীকে ভোট দেবো। যদি তাঁরা সৎ, নিষ্টাবান ও স্চ্ছল থাকেন।’
সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল আলীম বলেন, ‘এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। বিগত সময়ে আমাদের এলাকায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবো এবং সকল প্রকার সমস্যার সমাধান করবো।’
রঙ্গারচর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ফরহাদ রাজা চৌধুরী বলেন, ‘আমার দায়িত্ব পালনে জনগণের সেবায় ইউনিয়নের চানপুর, ছফেরগাঁও, বৃন্দাবননগর এলাকার অনেক রাস্তা সংস্কার কাজ করেছি। রঙ্গারচর উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষ নির্মাণ করেছি। ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে স্যানিটেশনের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। ইউনিয়নের ছোটখাটো অনেক সমস্যা রয়েছে তা সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাতে ইউনিয়নের সকল জনগণ সুষ্ঠু সেবা পায়। যোগ্য ব্যক্তিরা ভাতার কার্ড গ্রহণ করতে টাকা না দেয়ার জন্য আমি সভা করে জানিয়েছি। যেসকল ইউপি সদস্য ভাতার কার্ড প্রদান করতে টাকার লেনদেন করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’