একটি শিল্পাঞ্চল একটি এলাকার অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিতে সক্ষম। ওখানে বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়। বিস্তৃতি ঘটে অনেক পেশার। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান হাতিয়ার হলো অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া। কিছু মানুষকে পাঁচ/দশ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে যে ব্যক্তির অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না, গত তিন দশকের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে তার সত্যতা মিলে। ক্ষুদ্র ঋণের চাইতেও দারিদ্রতা নিরসনে বেশি ভূমিকা রেখেছে গ্রামে-গঞ্জে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া, বিশেষ করে গামেন্টস সেক্টরের স্ফীতির কারণে। এখনও আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র। গ্রামে গ্রামে ঘুরলে, মানুষের আ্য়-রোজগার ও জীবন যাপনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে যে কেউ দারিদ্রতার মাত্রা বুঝতে পারবেন। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ বাজার পার্শ্ববর্তী কুশিয়ারা নদীর উপর সেতু নির্মাণের ফলে ওই এলাকার সড়ক ও নৌ যোগাযোগ সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে ওখানে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে এলাকা থেকে। দাবি উত্থাপনকারীরা বলছেন, কুশিয়ারা সেতু নির্মিত হলে রাজধানীর সাথে অত্রাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে। কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে ভৈরব নদী বন্দরের সাথে রয়েছে সহজ নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে কোনো শিল্প কল-কারখানা না থাকা এবং শুধু কৃষি নির্ভরশীলতার কারণে এই অঞ্চলে শ্রমশক্তিরও জোগান রয়েছে প্রচুর। এইসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এখানে অনায়াসে একটি শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক জোনগুলোকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পক্ষে। সারা দেশে উৎপাদন ব্যবস্থার একটি ভিত্তি গড়ে উঠলে সামগ্রিকভাবে দেশের সকল জনগোষ্ঠী এ থেকে উপকার লাভ করবেন। তাই রানীগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার এই দাবিটি যৌক্তিক ও বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনাযোগ্য।
বিশেষ অর্থনৈতিক জোনগুলোতে বৈদেশিক পুঁজি বিনিয়োজিত হয়। তৈরি করা হয় এমনসব পণ্যের কারখানা যা সাধারণত রপ্তানিযোগ্য। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকায় বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সস্তা শ্রমশক্তির কারণে বিদেশিরা কম মূল্যে পণ্য উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে দেখে থাকেন। সরকারের উদ্দেশ্য এইসব বিদেশি পুঁজিকে দেশের ভিতর টেনে এনে কর্মসংস্থান তৈরি ও অর্থনীতিকে তেজিকরণ। তাই কুশিয়ারার তীর ঘিরে অর্থনীতির নতুন যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেটিকে উপেক্ষা করা অনুচিত। সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের মিলনস্থল হল রানীগঞ্জের কুশিয়ারা সেতু। এই সেতুর উভয় পাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা বোরো ধান চাষাবাদ। চাষাবাদে নিয়োজিত কৃষকদের বছরের আট মাস কোনো কাজ থাকে না। এদিকে ধানের ব্যাপক মূল্য পতনের কারণে ধান চাষ করাকে এখন আর লাভজনক হিসেবে দেখছেন না কৃষকরা। ধানের দর পতনের জন্য কৃষক পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে দুর্যোগ। এই জায়গা থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে যেমন ধানের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে তেমনি কৃষকদের বেকার আট মাস কর্মে নিয়োজিত থাকারও ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাহলে এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খোঁজে নিতে পারে।
সাহায্য বা সামাজিক সহায়তা দিয়ে মানুষকে স্বনির্ভর করা যায় না। মানুষ স্বনির্ভর হয় উপযুক্ত সুযোগ ও সুবিধা পেলে। সরকারের দায়িত্ব হল, এই সুযোগ ও সুবিধার ব্যবস্থা করে দেয়া। আমরা আশা করব, রানীগঞ্জ সেতু এলাকায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গড়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করার কাজ সরকার শীঘ্রই শুরু করবেন এবং স্থানীয় মানুষের এই স্বপ্ন, যা মূলত সক্ষম বাংলাদেশ গড়ার অবলম্বন, সেটি সময়ের ব্যবধানে বাস্তবায়িত হবে।

