সিভিল সার্জনকে কেন এই আকস্মিক বদলি?

সুনামগঞ্জের নতুন সিভিল সার্জন ডা. তউহীদ আহমেদ কল্লোলের আকস্মিক বদলি আদেশ জেলার সর্বস্তরের মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁরা এই অযৌক্তিক বদলি আদেশটি মেনে নিতে পারছেন না। মানুষের এই মনোভাবের প্রথম প্রকাশ ঘটে ফেসবুকে। বহু সচেতন ব্যক্তি এই বদলির বিরোধিতা করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বদলি আদেশ বাতিলের দাবিতে সংগঠিত কর্মসূচী পালন শুরু করেছে বিভিন্ন সংগঠন। যাঁরা সিভিল সার্জনের বদলি মেনে নিতে পারছেন না, তাঁদের সাধারণ অভিমত হলÑ দুর্নীতি বিরোধী শক্ত অবস্থানের কারণেই তিনি দুর্নীতিবাজ চক্রের রোষানলে পড়ে বদলি হয়েছেন। সবচাইতে আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁর স্থলাভিষিক্ত নতুন সিভিল সার্জন যোগদান করার আগেই ডা. তউহীদকে বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে দায়িত্ব হস্তান্তর করানো হয়েছে। একজন সিভিল সার্জনকে, যিনি কিনা মাত্রই ২০ দিন আগে এই জেলায় যোগদান করেছিলেন, তার এই রহস্যজনক বদলি ও এটি কার্যকর করতে অবিশ্বাস্য দ্রুততার কারণ কী?
জনপ্রশাসনে বদলি একটি স্বাভাবিক বিষয়। কর্তৃপক্ষ চাইলে যে কাউকে যখন-তখন বদলি করতে পারেন। যখন-তখন বদলির শিকার হয়েছেন ডা. তউহিদ। নতুবা বদলি সংক্রান্ত সাধারণ নীতিমালা অনুসারে তিনি অন্তত দুই বছর এখানে চাকুরি করার অধিকার রাখেন। তাঁর যোগদানের আগে পূর্ববর্তী সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তখনও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ ওই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। কিন্তু সাবেক সিভিল সার্জনকে তখন বদলি করানো সম্ভব হয়নি। তিনি স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার পর ডা. তউহিদ সিভিল সার্জনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যোগদানের পর তিনি বেশ কিছু ভাল কথাবার্তা বলেছেন, যাতে জেলাবাসী আগের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। এই আশাবাদের জায়গা থেকেই তাঁর বদলি আদেশটি সকলকে ব্যথিত ও প্রতিবাদী করে তুলেছে। যে বিষয়টি বুঝতে হবে, মানুষের প্রতিবাদী কর্মসূচীর পিছনে ডা. তউহীদের প্রতি অনুরাগ যতটা না জড়িত তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত রূপে দেখার প্রত্যাশা। সুনামগঞ্জের সাধারণ মানুষের এই আবেগের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বুঝতে হবে।
প্রতিবাদী জনতা অভিযোগ করছেন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন অফিস একটি চিহ্নিত দুর্নীতিবাজচক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দীর্ঘদিন যাবৎ। এরা সিভিলসার্জন অফিস ও সদর হাসপাতালের বিভিন্ন পদে কর্মরত। কোনো সিভিল সার্জনই নাকি এই চক্রের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারেন না। কেউ এই সিন্ডিকেটের বিরোধিতা করলেই তাঁকে সরে যেতে হয়। ডা. তউহীদ সম্ভবত শুরুতেই ওই সিন্ডিকেটের সাথে সমঝোতায় রাজি হননি বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছেন। তাঁর বদলির নেপথ্য কারণ হিসাবে এই সিন্ডিকেটবাজিকেই সামনে আনছেন প্রতিবাদকারীরা।
চলমান প্রতিবাদ কর্মসূচী চলাকালীন বৃহস্পতিবার বিকালে তাঁর দায়িত্ব হস্তান্তরের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। কেন একটি অঞ্চলের মানুষ একজন কর্মকর্তাকে রাখতে রাস্তায় নেমেছেন তার প্রকৃত কারণ অনুধাবন করতে চায়নি স্বাস্থ্যপ্রশাসন। স্বাস্থ্যপ্রশাসনের এমন আচরণ অনভিপ্রেত। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা-নিয়মাচার যেমন সত্য তেমনি জনতুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি গ্রাহ্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনগণের জন্যই প্রশাসন। আমরা আশা করব অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ডা. তউহীদকে দায়িত্ব হস্তান্তর করানো হলেও সংশোধিত আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সুনামগঞ্জে রাখা হবে। এতে সাধারণ মানুষ অন্তত মনে এইটুকু শান্তি পাবেন যে, সরকার তাদের আবেগ অনুভূতি আমলে নেন। মানুষ স্বাস্থ্যসেবা কাঠমোকে জনবান্ধব ও সেবাপরায়ণ হিসাবে দেখতে ভীষণভাবে আকুল। সিভিল সার্জনকে স্বপদে রাখার জন্য জেলাবাসীর আকুলতা এই কারণেই।