ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজার

বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ৬ দিন। কিন্তু এখনও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারসহ কোন বাঁধের কাজ পুরোদস্তুর শেষ হয়নি। প্রতি বাঁধে মাটি ফেলা শেষ হলেও বাকি আছে স্লোপ তৈরি, মাটি ড্রেসিং, কমপেকশন ও দুর্বা লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ। অধিক ঝুঁকির ক্লোজারে বিছানো হয়নি কোন ধরনের জিওটেক্সটাইল, ফেলা হয়নি বস্তা, বাঁধা হয়নি বাঁশের আড়। কোন কোন বাঁধে এখনও ফেলা হচ্ছে মাটি। এছাড়া বেলে মাটি দিয়ে বাঁধা হয়েছে বেশ কয়েকটি বাঁধ। বৃষ্টি হলেই
যেগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে কৃষকের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) হাওর ঘুরে এমন চিন্তিত বাস্তবতাই চোখে পড়েছে।
শনির অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ লালুর গোয়ালায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকেরা বাঁধের স্লোপে এখনও মাটি ফেলছেন। সম্পূর্ণ ভরাট করা হয়নি ক্লোজারের গোড়ার বিস্তৃত বড় গর্তটি। ড্রেজারের সামান্য মাটি একাংশে ফেলে এড়ানো হয়েছে গর্ত ভরাটের দায়। এখনও বাকি আছে জিওটেক্সটাইল, বস্তা ও বাঁশের আড়। বৃষ্টি দেওয়ার সাথে সাথে বাঁধে ফেলা নতুন মাটি ধসে পড়ে মহাবিপদ ডেকে আনবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক। এখন পর্যন্ত অরক্ষিতই থেকে যাচ্ছে হাওরখেকো এই ক্লোজার।
এ নিয়ে পিআইসি সভাপতি জিয়া উদ্দিনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বহুত মাটি ফেলা হইছে। এখনও মাটি ফেলা হইতাছে। দুই দিনের মধ্যেই শেষ হইয়া যাইব সবতা। কালকে জিওটেক্সটাইল আইব।’
অপরদিকে শনি হাওরের আরেক ঝুঁকিযুক্ত ঝালোখালি ক্লোজারে মাটি ফেলে ড্রেসিং ও কমপেকশন শেষ করেই কাজের ইতি ঘটানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সেখানে বাকি কাজের আলামত চোখে পড়েনি।
এছাড়া অধিক বরাদ্দকৃত হালি হাওরের মদনাকান্দি পাথাইড়া খালে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের একেবারে গোড়া থেকে মাটি তোলা হয়েছে। সেখানে মাটি ফেলা শেষ হলেও রয়ে গেছে আনুষাঙ্গিক সবকিছু। বেশ ঝুঁকিতে থাকা এই ক্লোজারটির কাজ এখনও চলমান। বৃষ্টি দিলেই বিপজ্জনক এ ক্লোজারটি যে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে এতে কোন সন্দেহ নেই। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকেরা তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
মদনাকান্দি পাথাইড়া খাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দুর্গাপুর গ্রামের রানা তালুকদার বলেন, ‘হালি হাওরের লাগি এই খাল মারাত্মক বিপদের। এই কাজডা আরও মজবুত করার দরকার আছিল। কাজডা তেমন সুবিধাজনক হয় নাই। শক্ত বাঁন্ধের লাগি বাঁশ ও বস্তা ফেলা জরুরী। কিন্তু এগুলো এখনও দেওয়া হইতাছে না। তাহইলে বাঁধ ঠিকব কি কইরা।’
মদনাকান্দি গ্রামের পিন্টু তালুকদার বলেন, ‘কাজ সঠিক সময়ে না করাডা এক ধরনের অপরাধ। হাওর রক্ষার লাগি কাজ সঠিক সময়ে সঠিকভাবে করা অবশ্যই দরকার।’
অপরদিকে আছানপুরের উত্তরে অবস্থিত ৫৮নং পিআইসির হেরাকান্দি খাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সে বাঁধটি যেভাবে বাঁধা হয়েছে তাতে বিপদ প্রায় সুনিশ্চিত। বৌলাই নদীর মোড়ে অবস্থিত এ খালটি অত্যন্ত সরু ও তীর খাড়া করে বাঁধায় নদী পানিতে পূর্ণ হলেই প্রথম ধাক্কায় ভেঙ্গে যাবে হেরাকান্দি খাল।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষক লীগের আহবায়ক মো. আলী আমজাদ বাঁধটি সরজমিন পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, ‘হেরাকান্দি বাঁধটি আরও প্রশস্ত এবং স্লোভ বাড়িয়ে দেওয়ার খুবই দরকার ছিল। কিন্তু যেভাবে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে তাতে নদীতে পানি বাড়লেই ভেঙ্গে যেতে পারে হালি হাওরের এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি। এখানে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’ তবে বাঁধ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘এতে বরাদ্দ দেওয়া হইছে কম, তাই বাঁন্ধের কাজডা একটু চিকন হইছে।’
অন্যদিকে হালি হাওরের ডাকাতখালি, সুইচ্ছার খালসহ মহালিয়া ও পাগনার প্রায় সব বাঁধেই মাটি ফেলা বাদ দিলে অনেক কাজই রয়ে গেছে। কিছু বাঁধে এখনও মাটি ফেলা হচ্ছে। হাওরবিপন্ন সময় ঘনিয়ে আসলেও এখনও শেষ হয়নি বাঁধ রক্ষা কাজ। ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজের নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এ নিয়ে হাওরর পারের ক্ষোব্ধ কৃষকেরা প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ‘গত বছর কাজে গাফিলতির জন্য কিছু পিআইসিকে ধরে নিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় এনে মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ বছর কাজে এত অবহেলা, তারপরও কাউকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি।’
২০১৭ সালে হাওর রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে প্রশংসিত (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) একজন চাকরিজীবী জানিয়েছেন, ‘পাগনার সব বাঁধে মাটি ফেলার কাজ প্রায় শেষ। তবে অন্যসব কাজ বাকি আছে। আর ২৫ ও ২৬নং পিআইসি এখন অনেক পিছিয়ে আছে। ওই দুইটিতে এখনও মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়নি।’
এ ব্যাপারে কাবিটা স্কীম বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘যেখানে যেখানে ত্রুটি আছে সেখানে আমরা বলে দিচ্ছি সেগুলো ত্রুটিমুক্ত করার জন্য। বাঁধের স্লোপ, কমপেকশন ও ঘাস লাগানোসহ আনুষাঙ্গিক কাজের জন্য আমরা আরও পনের দিন সময় চেয়েছি। এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে।’
গত দুইদিন আগে যে বজ্রবৃষ্টি হয়েছে তাতে বিপদের আগাম সুর শোনা গেছে। এ বিপদের কথা মাথায় রেখেই ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজের নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও বাঁধে এখনও কাজ চলমান।