কলেজ জাতীয়করণে জালিয়াতির অভিযোগ খতিয়ে দেখুন

এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ। সরকারের ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একসঙ্গে জাতীয়করণ করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সেরা মাধ্যমিক স্কুল ও একটি করে সেরা কলেজ জাতীয়করণ করার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নাধীন। এরই অংশ হিসেবে এ পর্যায়ে সারা দেশে ৩২১টি কলেজ এবং ৩১৫টি স্কুল জাতীয়করণ করা হচ্ছে। তারমধ্যে প্রথম দফায় ১৯৯টি কলেজ জাতীয়করণের জন্য চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে, যার তালিকাও ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। জুলাই মাসের শুরুতে ঈদুল ফিতরের আগে আগে ‘১৯৯ কলেজ জাতীয়করণে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন’-এর খবর প্রধানমন্ত্রীর তরফে ঈদ উপহার হিসেবেই দেশবাসীর কাছে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ১৯৯টি কলেজ সরকারি করার তালিকা প্রকাশের পর এগুলোর নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে- অনেক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, বাদ দেয়া হয়েছে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে। এ অভিযোগ গুর”তর। এ ধরনের স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি ঘটে থাকলে তা বিতর্কিত করবে, ক্ষতিগ্রস্ত করবে সরকারের একটি মহৎ উদ্যোগকে।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত হয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১০টি কলেজের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানিয়ে গেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ। আপত্তিগুলো হলো, তালিকাভুক্ত এসব কলেজের মধ্যে কোনোটির জমি নেই, কোনোটি সদ্য স্বীকৃতি পেয়েছে আবার কোনোটি গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি ও বঙ্গবন্ধুর খুনির সহচরের কলেজ। এর বাইরে উপজেলার বড় এবং সেরা কলেজকে জাতীয়করণের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যেসব উপজেলায় সরকারি কলেজ নেই সেসব উপজেলার একটি সেরা বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ বা সরকারি করা হচ্ছে। কলেজ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেসরকারি কলেজের অধীনে জমির পরিমাণ, নির্মিত অবকাঠামো, খেলার মাঠ, শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, কলেজের ফলাফল, এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি, জেলা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্যের মতামত ইত্যাদিকে প্রাধান্য দেয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে- উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে স্বজনপ্রীতি এবং বিশেষ এক শ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে ঐতিহ্যবাহী কলেজ বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নতুন ও বিতর্কিত অনেক কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। কলেজের নামে শুধু ‘বঙ্গবন্ধু’ সংযোজিত থাকলেই অন্যসব শর্ত বিবেচনায় নেয়া হবে না, আবার প্রয়োজনীয় সব শর্তপূরণ করলেও শুধু প্রতিষ্ঠাতার পরিচয়ের কারণে কলেজ বাদ পড়বে অথবা স্বজনপ্রীতি বা বিশেষ যোগাযোগের সুবাদে ঐতিহ্যবাহী পুরনো কলেজ বাদ দিয়ে ভুঁইফোড় কলেজকে জাতীয়করণ করা হবে এসব কাম্য নয়। এ ধরনের প্রবণতা গোটা শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এদিকে আরো ১০২টি উপজেলার কলেজকে সরকারি করার তালিকা আগামী সপ্তাহে প্রকাশ করা হতে পারে। অন্যদিকে জাতীয়করণের জন্য অনুমোদিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তালিকাও খুব শিগগিরই আসবে। আমরা মনে করি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের উচিত ঘোষিত তালিকার অভিযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া। অন্যদিকে নাম প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা স্কুল-কলেজগুলোর ব্যাপারেও বিশদভাবে খোঁজ-খবর নেয়া, কোনো অযোগ্য প্রতিষ্ঠান স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির ফাঁক-ফোকরে তালিকাভুক্ত হলো কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। সত্যিই যদি জাতীয়করণের ক্ষেত্রে জালিয়াতি-দুর্নীতি হয়ে থাকে তাহলে দায়ীদের বির”দ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ ব্যক্তি বিশেষের অসদাচরণ কিংবা দায়িত্বহীনতায় বিতর্কিত হোক, ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।