এনামুল হক, ধর্মপাশা
হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারানোর ঘটনা কৃষকসহ প্রতিটি সাধারণ মানুষকে ব্যতিত করে। এ সময় খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হয় নতুন সংকট। দুবেলা দুমুঠো খাদ্যের জন্য শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। যিনি যত বড় কৃষক তাঁর ক্ষতির পরিমাণ তত বেশি। ধনী গরীব সবাই এক কাতারে। কৃষকেরা দেনার দায় মেটাতে আর শ্রমিকেরা খাদ্য যোগাতে কাজের সন্ধ্যানে প্রিয় গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিতে বাধ্য হন। ২০১৭ সালে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজে সীমাহীন দুর্নীতি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারানো সুনামগঞ্জসহ দেশের হাওরাঞ্চলের চিত্র ছিল এমনই।
এবার প্রতিটি হাওরে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। মিলছে না শ্রমিকের দেখা। উজান থেকে আসছে না শ্রমিকেরা। স্থানীয় শ্রমিকেরাও ঘরবন্ধী। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় তারাও ধান কাটতে হাওরে যেতে বিমুখ। আবার যে সকল স্থানীয় শ্রমিকেরা ধান কাটতে রাজী হচ্ছেন তাদের মুজুরীও বেশি। রয়েছে যে কোনো সময় আগাম বন্যায় পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। তাই পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়া গেলে নির্ধারিত সময়ে কৃষকেরা তাঁদের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ফলে জমির ধান জমিতেই পড়ে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যা বিগত দিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশায় যোগ করবে নতুন মাত্রা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জসহ হাওর অঞ্চলের সাতটি জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭২১ হেক্টর, উফশী ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতরে ধান ১১ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশাসহ বিভিন্ন উপজেলার হাওরগুলোতে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। শ্রমিক সংকট নিরসনে ও শ্রমিকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ ধান কাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ত্রাণের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বালুমহাল ও বারকি শ্রমিকদের ধান কাটার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এবার শ্রমিকদেরকে রাতে নিরাপদে থাকার জন্য স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এদিকে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবু তালেব উপজেলার সকল রিকশা, ভ্যান, অটো, মিশুক ও মোটরসাইকেল চালকদেরকে ধান কাটার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
ধর্মপাশা উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের বিচরাকান্দা গ্রামের কৃষক আহম্মদ আলী জানিয়েছেন, সালদিঘা ও কাইল্যানী হাওরে তাঁর জমি রয়েছে। ধান কাটার জন্য তিনি যে সকল উজানী শ্রমিকের সাথে কথা বলেছিলেন তারা করোনা পরিস্থিতির কারণে আসতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে ধান কাটাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। কিন্তু স্থানীয় শ্রমিকেরা উজানী শ্রমিকদের তুলনায় ৫০০/৭০০ টাকা বেশি দাবি করছে।
সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের মধ্যনগর থানা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক আলাউদ্দিন বলেন, ‘হাওরের কৃষকেরা কীভাবে ধান কর্তন করবে তা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। একদিকে করোনা ভাইরাসভীতি অন্যদিকে শ্রমিক সংকট। তবে বহিরাগত শ্রমিকেরা আমাদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। স্থানীয় শ্রমিকেরাও যদি স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে কাজ করে তাহলেও এ ঝুঁকি থেকে যাবে।’
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ধানকুনিয়া হাওরপাড়ের কৃষক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ধান কাটার মেশিন ক্রয় সহজলভ্য হলে কিংবা ভর্তূকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে সাধারণ কৃষকেরাও মেশিনটি ক্রয় করতে পারতো। ফলে ধান কাটায় অনেকটা সহযোগীতা হতো।’
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘রোববার পর্যন্ত ধর্মপাশা উপজেলায় ৩১ হাজার ৭২০ হেক্টর জমির মধ্যে ১২০ হেক্টর জমির ধান কর্তন হয়েছে। বাইরে থেকে শ্রমিকেরা আসতে শুরু করেছে। আজ (রোববার) দুটি দল ধর্মপাশায় প্রবেশ করেছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবু তালেব বলেন, ‘অন্য এলাকা থেকে যে সকল শ্রমিকেরা আসবে তাদেরকে আলাদা করে রাখার জন্য কৃষকদেরকে বলা হয়েছে। কৃষকদের সুরক্ষায় মেডিকেল টিমও প্রস্তুত রয়েছে।’


