অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম দিন আজ

স্টাফ রিপোর্টার
আজ ১ মার্চ। বাঙালি জাতির গৌরব ও অহংকারের মাস। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেই ডাক এসেছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে এ মাসেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেওয়ার চূড়ান্ত সংগ্রামে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই বাঙালির ধারাবাহিক স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ ধাপের প্রতিরোধ শুরু। এদিনই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দু’যুগের ধারাবাহিক শোষণের বলয় থেকে বের হয়ে মুক্তির স্বাদ নিতে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে পুরো দেশ ও জাতি। অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো বিস্ফোরিত হয় মুক্তির সংগ্রাম। এদিন বেলা ১টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খান আকস্মিক এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে তিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ কয়েকটি দলের জাতীয় অধিবেশনে যোগদানের অনিচ্ছার কথা জানান। ইয়াহিয়ার খানের ঘোষণায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গের গোটা জনপদকে অশান্ত করে তোলে। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ। ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কলকারখানার শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার জনতা জড় হতে থাকেন ঢাকার মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণীর সামনে। সেখানে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠকে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ছুটে যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। পরে সেখান থেকে তারা হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত হয়। চূড়ান্ত সংগ্রামের ঘোষণার অধীর অপেক্ষায় উন্মুখ স্বাধীনতাকামী বিক্ষুব্ধ মানুষরা ‘’বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগান দিতে থাকেন। সারাদেশে শুরু হওয়া সর্বাত্মক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সূত্রপাত ঘটে অসহযোগ আন্দোলনের। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রকৃত কর্তৃত্ব চলে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে তার কণ্ঠে ঘোষিত হয় ‘মরতে যখন শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বোÑইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে আরও সুনির্দিষ্টভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় জাতিকে। ইস্পাতকঠিন সুদৃঢ় ঐক্যে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে গোটা জাতি। আরেক দিকে তখন রচিত হচ্ছিল বাঙালি নিধন আর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার নকশা। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানিরা বাঙালির কন্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে ‘অপারেশেন সার্চলাইট’ নামে বাঙালি নিধনে নামে। পাকসেনারা নির্বিচারে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষককে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণহত্যার মধ্যরাতেই তথা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর হাতে গ্রেফতারের পূর্বমুহূর্তে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ডাকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়ায় বাঙালি। অবশেষে অনেক ত্যাগ আর বহু প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে আমরা লাভ করি কাংক্সিক্ষত স্বাধীনতা।