ইয়াকুব শাহরিয়ার
এক.
বৃহস্পতিবার শিশুটির সাথে আমার দেখা হয়েছে পশ্চিম পাগলা উপ—স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সামনে। তখন সকাল সাড়ে ১১টা হবে। শিশুটির নাম সাবিনা (ছদ্মনাম)। বয়স ১২ কিংবা ১৩ হবে। তার মা সাথে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ভালো আছো? কোনো উত্তর দিলো না। আবার জিজ্ঞেস করলাম, তখন উত্তর দিলো। বললো— না। আমি ভালো না। ভালো থাকবো কেনো? পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো। আমি আগে থেকেই জানি শিশুটির মেধা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না, অন্য শিশুদের সাথে সে মিশতে পারে না। খেলতে পারে না। তার মেধা সাধারণ শিশুদের মতো বিকশিত হয় না, হচ্ছে না। শরীর বাড়ে কিন্তু মেধা—বুদ্ধি ঠিক শরীরের মতো বাড়ে না। সে অটিজম শিশু। অটিজম হচ্ছে মস্তিষ্কের বিকাশ জনিত সমস্যা। এ ধরণের শিশুরা কম কথা বলে। ছোট ছোট বাক্যে কথা বলে। এরা একা থাকতে ভালোবাসে। তারা স্বাভাবিক মানুষের মতো দ্রুত কথা বলতে পারে না। থেমে থেমে কথা বলে। যদি কোনো অটিজম শিশু হাত দিয়ে কোনো জিনিস নাড়াচাড়া করে দেখতে চায় সেটা করতে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। হাসি—কান্নার মাধ্যমে অথবা দৈহিক ভাষা (ইড়ফু খধহমঁধমব)’র মাধ্যমে তা বুঝাতে পারে না। তারা যা দেখে তা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। একটি নির্দিষ্ট বস্তুর প্রতি (দরজা—জানালা বারবার খোলা বা বন্ধ করা, জলের কল খোলা—বন্ধ আবার বৈদ্যুতিক সুইচ অফ—অন করার মতো কাজে) আকর্ষণ থাকে বেশি। সাধারণ কাজগুলো তারা অসাধারণ ভাবে দেখে এবং করে। বার বার একই কাজ করে। সাধারণত অটিজম শিশুরা কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। দৃষ্টি সংযোগ (ঊুব ঈড়হঃধপঃ) করতে পারে না। চোখের ইশারায় কিছু বলে না। অল্প কিছুতে আনন্দ ও দুঃখ পায়। তাদের চিন্তাধারা সাধারণের চেয়ে ভিন্ন হয়, বুদ্ধি তুলনামূলক কম হয়। অটিজম রোগাক্রান্ত কোনো কোনো মানুষ বিশেষ ক্ষেত্রে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন সে সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের সামাজিক বিকাশ হয় না। কেনো তার মস্তিষ্ক সামাজিকভাবে বৃদ্ধি পায় না, এটাই তার রোগ। আবারও বলছি, রোগ বলতে মস্তিষ্কের রোগ শরীরের না। আমি মনে করি, এই রোগটি আমাদের সমাজের জন্য খুব একটা বিশাল বড় রোগ সেটা বলা যায় না। কারণ এ রোগ বহন করে অনেকে অনেক কিছু করেছেন। মেধার বিকাশ বা সামাজিক বিকাশ না হওয়া যেমন এ রোগের প্রধান লক্ষন তেমনি আমরা দেখেছি অনেক অটিজম শিশু—কিশোরেরা আবার অসাধারণ বুদ্ধি—বিচার সম্পন্ন মানুষও হয়েছেন। বিজ্ঞান—গবেষনায়ও বিশেষ অবদান রেখেছেন অনেক অটিজম মানুষ সে হিসেবও কম নয়। রোগটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা আগে কম ছিলো তাই রোগীর সংখ্যাও কম ছিলো। মানুষ শিক্ষিত হচ্ছেন, সচেতনতা বাড়ছে, রোগ—শোক সম্পর্কেও জ্ঞান বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই রোগীর সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। এ রোগের চিকিৎসারও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
দুই.
আমাদের সমাজে অটিজম রোগে আক্রান্ত শিশু বা লোকদের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদেরকে নিয়েই আমরা এগিয়ে চলছি। শিক্ষিত হচ্ছি, সভ্য হচ্ছি। আটকে থাকছি না। তাদের চিকিৎসা করাচ্ছি, তাদের নিয়েই চলছি। তবে যে রোগে লোকাক্রান্ত হয়, মনে হচ্ছে ইদানিং বুঝি সমাজটাও সে রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা ক্রমশ শিক্ষিত হচ্ছি কিন্তু বিচ্ছিন্ন হচ্ছি প্রকৃত শিক্ষা থেকে; সভ্য জাতি হচ্ছি বাহির থেকে কিন্তু ভিতরে প্রচণ্ড করমের অসভ্যতাকে লালন করছি। ভিতর থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি সভ্যতা থেকে। সমাজের বুদ্ধি খুব একটা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। সমাজ ইতিবাচভাবে বেড়েও উঠছে না। বরঞ্চ বুদ্ধি, বিবেকহীন সমাজ আরো এগিয়ে যাচ্ছে নীতি—নৈতিকতাহীনতার দিকে। সমাজ আর একান্নবর্তী থাকছে না, একজন অটিস্টিক শিশুর মতো একলা হচ্ছে বা একলা থাকতে চাচ্ছে। সমাজের কলেবর অটিস্টিক শিশুর দেহের মতো বাড়ছে ঠিক কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বাড়ছে না। মিলেমিশে এক সাথে থাকার বদলে সমাজবাসীরা একা হচ্ছি। কারো সাথে মিশছি না, কারো প্রতি আন্তরিকতা দেখাচ্ছি না। যেনো সম্পূর্ণ সমাজটাই একজন অটিস্টিক রোগীতে রূপান্তরিত হচ্ছি। বর্তমান সময়ে সমাজে শিক্ষাধিক্ষার ব্যপারে একটা হুলুস্থুল পড়েছে ঠিক কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, শিক্ষার্থীদের মাঝে বা শিক্ষকদের মাঝে সে হুলুস্থুল ইতিবাচভাবে পড়েছে কী? একটু খুঁজ নিয়ে দেখুন— কী হচ্ছে শিক্ষার নামে? শিক্ষার নামে সমাজের প্রতিটি স্তরে এখন শিক্ষাভিত্তিক দোকান খোলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকেন খদ্দেরের আশায়। এখানে শিক্ষার্থী না বলে গ্রাহক বলতে পারতাম। তা না বলে কাস্টমারও বলতে পারতাম। কাস্টমার বা গ্রাহক কথাটা এখানে ইচ্ছা করেই ব্যবহার করলাম না— ব্যবহার করলাম তার বাংলা প্রকৃত অর্থ। এটাই এখানে জুতসই শব্দ মনে হচ্ছে। বর্তমান যে শিক্ষা ব্যবস্থা এমন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরাও খুব একটা শিখছে না। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা এ নিবন্ধে না—ই বা লিখলাম। লিখলে ভালো একটি নির্বাচিত বিষয় থেকে পঁচে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার গন্ধ বের হবে। তাই এড়িয়ে যাচ্ছি। কাজের কথায় আসি। শিক্ষা ব্যবস্থা যেমনই হোক কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো এখনো নিজস্বতা বজায় রেখে শিক্ষা দান করে যাচ্ছে? সবাই তো আর পঁচা দুর্গন্ধময় শিক্ষা ব্যবস্থার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাননি? সেখান থেকেই বা কেনো শিক্ষার্থীরা কিছু শিখছে না? সমস্যার একটি জায়গা আমি খুঁজে পেয়েছি। আশা করছি জ্ঞানসমৃদ্ধ পাঠকগণও আমার সাথে একমত হবেন। সমস্যাটা হচ্ছে পরিবারে। পরিবার থেকে এখন কোনো নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। তারা শিখাচ্ছেন না শিক্ষাগুরুর মর্যাদা সকলের উপরে। আবার এও শিখাচ্ছেন না প্রবীণ বয়স্কদের দেখলে আদব দেখাতে হয়। সালাম দিতে হয়। পরিবার এখন শেখায় না স্কুল কলেজে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়, শিক্ষকদের উপদেশ মানতে হয়। চুল খাটো করে রাখতে হয় আর ছেঁড়া পেন্ট পড়তে হয় না এই শিক্ষাটা এখন পরিবার থেকে শিক্ষার্থীরা পায় না। মেয়ে শিক্ষার্থীরাও দেখছি ইদানিং লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে প্রায়জনই বেহায়াপনায় মেতে উঠে। খুবই খারাপ লাগার বিষয় এগুলো। এজন্য বেজায় কষ্ট হয় আমাদের; যারা এসব দেখে প্রতিবাদ করে করে আজ ক্লান্ত প্রায় এবং ভীষণ রকমের হেটার্স ইতোমধ্যে তৈরি করে নিয়েছি। তবু ভালো লাগে আমরা এসব নিয়ে কথা বলছি। সে যে যাই বলুক। এসব ছোটখাটো বিষয়ে বখে যেতে যেতে সুন্দর, সুস্থ্য—সবল সমাজটা আজ অটিজম শিশুদের মতো হয়ে গেছে।
তিন.
আমাদের ভ্রম দৃষ্টির পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজ পাল্টাতে হলে নীতি নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। কারণ যে সমাজ আমাদের, যেখানে আমাদেরকেই থাকতে হবে, সে সমাজ পঁচে গেলে দুর্গন্ধের চরম কুফল আমাদেরকেই ভোগ করতে হবে। সঠিক চিকিৎসা বা পরিচর্যার মাধ্যমে সমাজটাকে উত্তরণের দায়িত্ব নিতে এ হবে সমাজের কারোরই। একজন অটিজম শিশু সঠিক পরিচর্যা পেলে স্বাভাবিক জীবনের চেয়েও ভালো কিছু করে দেখাতে পারেন। অনেকের ধারণা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ও আইজ্যাক নিউটন অটিজম রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তবে তারা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সঠিক পরিচর্যার দরকার। এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনো আবিষ্কার হয়নি (সম্ভবত)। এ রোগের চিকিৎসা হচ্ছে একমাত্র পরিচর্যা, অনুশীলন ও শিক্ষাদান। কোনো চিকিৎসা বিদ্যাই আজ অবদি মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য ওষুধ আবিষ্কার করতে পারেনি। জ্ঞান বাড়াতে হলে দরকার অনুশীলন ও লেখাপড়া করা। আর লেখাপড়া যথাযথভাবে করলে জ্ঞান বাড়বেই। মানসিক বিকাশও ঘটবে। আমরা যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই, কমবুদ্ধি সম্পন্ন শিশুদের স্বাভাবিক জীবন পরিচালনায় উৎসাহিত করি, সহযোগিতা করি তাহলে হয় তো সমাজে তাদের অবদান আরো বেড়ে যাবে। তাদের প্রতি তাচ্ছিল্যতা না দেখিয়ে আমরা যদি সহমর্মিতা আর সহযোগিতার হাত বাড়াই তবেই ইতিবাচকভাবে বেড়ে উঠবে আমাদের অটিজমেরা। সম্পদ হয়ে উঠবে।
শুধু তাদেরকে সহমর্মিতা দেখিয়ে বের করে নিয়ে আসলেই তো হবে না। তাদের মতো আমাদের সমাজটাও যে বুদ্ধি বিবেক হারিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে আছে তাদেরকেও তো উদ্ধার করে আনতে হবে? যদি তা না করি তাহলে নিকট ভবিষ্যতে আমরা একটি বিকলাঙ্গ সমাজে বসবাস করতে হবে। একটি স্বাস্থ্যহীন সমাজে গড়াগড়ি খেতে হবে আমাদের। এমনটা কখনোই কাম্য নয়। সমাজ মুক্তি পাক সামাজিক অটিজম থেকে।
শেষ.
আজ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। জাতিসংঘসহ তাবৎ দুনিয়ায় দিবসটি নানা আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশেও পালিত হবে দিবসটি। যতই ঢাকঢোল পিটিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হোক না কেনো এর সঠিক বার্তাটি কিন্তু লোকের কান পর্যন্ত না পৌঁছে মরমে পৌঁছাতে হবে। সচেতন করে তুলতে হবে প্রকৃতভাবে। তাহলেই দিবস উদযাপনের স্বার্থকতা হাসিল হবে। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল অটিজমেরা। অটিজম রোগ থেতে মুক্ত হোক আমাদের সমাজও।
লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।
- নানা আয়োজনে মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত
- দেশের বহু মানুষ এখনো দিন আনে, দিন খায় – পরিকল্পনামন্ত্রী


