গোলাম সরোয়ার লিটন
নৌকাঘাটের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে দুই যুগের অধিক সময় আগে। তবুও নৌকাঘাট নামে ইজারা প্রদান ও ইজারা আদায় চলছে। নৌযান মালিকদের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা শুধুই ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রশাসনকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঘাট ইজারা নিয়ে থাকেন এবং এ সুবাদে যাদুকাটা ও রক্তি নদী দিয়ে চলাচলকারী মালবাহী নৌযান আটকিয়ে ইচ্ছে মতো চাঁদা আদায় করেন। ঘাট দুইটি হচ্ছে তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের রক্তি নদীর নোয়াহাট গ্রামের সামনে ফাজিলপুর নৌকাঘাট এবং বাদাঘাট ইউনিয়নের যাদুকাটা নদীর ঘাগড়া গ্রামের সামনে ঘাগড়া নৌকাঘাট। নৌপথে এই চাঁদা উত্তোলনের জন্য কাগুজে এই নৌকাঘাট দুইটি দুই কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। একই ভাবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)’ এর নামেও তাহিরপুর ও বিশ^ম্ভরপুরের কোন কোন স্থানে চাঁদাবাজী হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সংস্থার কোন ঘাট বা স্থাপনা না থাকলেও এই সংস্থার ইজারাদার হিসাবে রক্তি নদীর দুইটি স্থানে নদী দিয়ে চলাচলকারী মালবোঝাই নৌযান আটকিয়ে টাকা আদায় করছে আরো পৃথক দুইটি গ্রুপ। একটি হচ্ছে উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের পাতারী এবং অন্যটি জেলার বিশম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের রঙ্গিয়ারচর নামক স্থানে। পাতারি স্থানটি নদীপথে নোয়াহাট থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। পাতারি থেকে রঙ্গিয়ারচরের দুরত্ব নৌপথে তিন কিলোমিটার। জানা যায়. যাদুকাটা ও রক্তি নদী দিয়ে প্রতিদিন ৪ শতাধিক নৌযান পাথর ও বালু বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে থাকে। প্রতিটি চাঁদা আদায়ের স্থানে একটি নৌযান থেকে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। নৌপথের সাত কিলোমিটার স্থান যেতে একটি নৌযানকে চার স্থানে চাঁদা দিতে হয়। নৌযান আটকিয়ে ইচ্ছেমতে চাঁদা আদায় করলেও এজন্য কোন রশিদ দেয় না চাঁদা আদায়ের সাথে জড়িত লোকজন।
যাদুকাটা ও রক্তি নদীপথে চলাচলকারী নৌযান থেকে এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত রোববার তাহিরপুর উপজেলা যাদুকাটা নৌযান মালিক সমিতি স্থানীয় সংসদ সদস্য, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার , তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও ) ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
নৌযান চালক, মালিক ও স্থানীয় এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৯৫ সালের পর থেকে রক্তি নদীর নোয়াহাট এলাকা ও যাদুকাটা নদীর ঘাগড়া নামক স্থানে কোন ধরণের নৌযান নোঙর করা বা মালামাল উঠানামার প্রয়োজন হয় না। সরেজমিনে গিয়েও দেখা যায় এই ঘাট দুইটি শুধুই কাগুজে ঘাট। বাস্তবে এখানে কোন নৌকাঘাটের অস্বিত্ব বা প্রয়োজনীয়তা নেই।
নৌযান মালিক আব্দুর রহমান বলেন, এই দুই ঘাটে আমাদের নৌকা ভিড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। তবুও নদীতে জোর করে ঘাটের লোকজন টোলের কথা বলে নৌকা প্রতি এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকেন। একই ভাবে পাতারি ও রঙ্গিয়ারচর থেকেও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
সাব্বির হাসান নৌযানের চালক সোহেল মিয়া বলেন, মাঝ নদীতে নৌকা থামিয়ে বা পাথর ছুড়ে নৌকা আটকিয়ে তারা ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করে। চাহিদামত টাকা না দিলে মারধোর করে আর নৌকা আটকিয়ে রাখে।
সুমন এন্ড আনিসা নৌযানের চালক সাঈদুর রহমান বলেন, নদীপথে ৭ কিলোমিটার দুরত্ব যেতে ৪ স্থানে আমাকে ১২ হাজার টাকা দিতে হয়। এ কারণে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় আনোয়ারপুর-ফাজিলপুর বালু-পাথর লোড-আনলোড শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, নৌকাঘাটে নৌকা ভিড়ানোর প্রয়োজন নেই, নেই লোড আনলোডের কাজ। তবুও নোয়াহাট ও ঘাগড়ায় নদীর মাঝপথে নৌকা আটকিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়। একইভাবে বিআইডব্লিইটি’এর কোন ঘাট বা স্থাপনা না থাকলেও চলছে নৌযান থেকে চাঁদা আদায়। বেপরোয়া এই চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা চলছে। এজন কাজের সুযোগ হারাচ্ছে হাওরাঞ্চলের সাধারণ শ্রমিকরা।
যাদুকাটা নৌযান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিদ্দিক মিয়া বলেন, নৌপথে অতিরিক্ত চাঁদাবাজির কারণে ৬০ ভাগ ব্যবসায়ী আমাদের এই স্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। চাঁদাবাজি বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে ব্যবসা রক্ষায় আমরা নৌ-ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হব।
বালিজুরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক টানা তিন বারের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, এসব স্থানে কোন ধরণের ঘাটের প্রয়োজন নেই। মুলত সরকার কে কৌশলে ১০ টাকা দিয়ে হাজার টাকা চাঁদাবাজির কৌশল। প্রতিটি নৌযান থেকে এরা একটি স্থানে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে। এই চাঁদাবাজির কারণে দলের ভাবমুর্তি বলতে কিছু আর অবশিষ্ট নেই।
নোয়াহাট থেকে ইজারার টাকা আদায়কারী তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের ফাজিলপুর গ্রামের মর্তুজা আলীর ছেলে ফয়সাল আহমদ(৩৫) বলেন, আমরা বৈধ ভাবে ইজারা এনেছি এবং নিয়মানুযায়ী ২শ থেকে ১১শ’ ৫০ টাকা পর্যন্ত রশিদের মাধ্যমে টোল আদায় করি।
ঘাগড়া নৌকাঘাটের ইজারাদার উপজেলার সদর ইউনিয়নের চিকসা গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে শফিক মিয়া’র (৩৩) মুঠোফোনে বার বার চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া গেছে।
পাতারি নামক স্থানে বিআইডব্লিইটিসি’এর নামে টাকা আদায়কারী উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের দক্ষিণকুল গ্রামের মো. নবাব মিয়ার ছেলে মো. বাবুল মিয়া বলেন, এ মাসে নদী থেকে কোন চাঁদা আদায় করা হচ্ছে না। প্রতি মাসে বিআইডব্লিউটি’এর কাছ থেকে ইজারা এনে তবেই টোল আদায় করা হয়।
বিশম্ভরপুর উপজেলার রঙ্গিয়ারচর থেকে বিআইডব্লিউটিসি’এর নামে টাকা আদায়কারী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দেবেশ তালকুদার বলেন, আমি গত জুন থেকে এই স্থানে (রঙ্গিয়ারচর) নদী দিয়ে মালবাহী নৌযান থেকে টোল আদায় করছি। বিআইডব্লিউটিএ আমাকে আগামি জুন পর্যন্ত এ টাকা আদায়ের বৈধ অনুমতি দিয়েছে। তিনি জানান, বালু ও পাথরবাহী নৌযান থেকে প্রতি ঘনফুট ২৫ পয়সা করে টাকা আদায় করছেন।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিজেন ব্যানার্জী জানান, যাদুকাটা নৌযান মালিক সমিতির অভিযোগের কাগজটি পেয়েছেন। তিনি বলেন, রশিদ ছাড়া কাউকে টাকা দেওয়া যাবে না। আর ইজারাকৃত ঘাট থেকে নির্ধারিত টোল আদায় করা যাবে। যদি কেউ অতিরিক্ত টাকা আদায় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল এ প্রসঙ্গে বলেন, উপজেলার সুলেমানপুর, বালিজুরি’র পাতারি এবং বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার ফতেহ্পুর এলাকায় বিআইডব্লিটি’এর নামে চাঁদাবাজী হয়। জেলা প্রশাসক এই বিষয়ে বিআইডব্লিউটি’এ কে চিঠি দিয়েছেন। তারা যথাযথ জবাব দিতে পারে নি। তিনি টাকা আদায় বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানালেন, বিআইডব্লিউটিসি’এর নামে তাহিরপুরের কয়েকটি এলাকায় চাঁদাবাজী, আমি বলেছি মাইকিং করে লোকজনকে বলার জন্য কেউ যাতে টাকা না দেয়। একইসঙ্গে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবার কথাও বলে দিয়েছি।


