বিশেষ প্রতিনিধি
ডাক্তার হবার স্বপ্ন পূরণ হবে তো অদম্য প্রমার (প্রমা রানী তালুকদার)? নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছে এই শিক্ষা সংগ্রামী। রোববার সকালে শহরের পূর্ব নতুনপাড়ার ছোট্ট একচালা ভাড়া ঘরের বারান্দায় বসে টিনের চুলোয় রান্না করতে মাকে সাহায্য করছিল তমা। এ প্রতিবেদককে পেয়ে প্রমা’র মা নীলিমা রানী তালুকদার জানতে চাইলেন, ‘আমরা দুবেলা পেট ভরে খাওয়াতেই পারি নি, আমার মেয়েটি মেডিকেলে পড়তে পারবে তো, আমরাতো ওর ভাড়ার খরচই দিতে পারবো না।’
প্রমার বাবা অরুন চন্দ্র তালুকদারের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার কামারগাঁও গ্রামে। একসময় গ্রামে বর্গাচাষ করতেন হতদরিদ্র অরুন চন্দ্র তালুকদার। বছর বছর ফসল ডুবে যাওয়ায় ১২ বছর আগেই চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে গ্রাম ছেড়েছেন তিনি। শহরে এসে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই শুরু হয় তাঁর। ঠেলাগাড়ি দিয়ে পথে পথে সবজী বিক্রি করেন তিনি। একপর্যায়ে স্ত্রী নীলিমাকে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) থেকে একটি সেলাই মেশিন দেওয়া হয়। দুজনের সামান্য রোজগারে খেয়ে না খেয়ে পূর্ব নতুনপাড়ার নির্মাণাধীন একটি ঘরে বিনা ভাড়ায় কিছুদিন থাকেন এই দম্পতি।
ছেলে দীপ, অপূর্ব মেয়ে ইমা ও প্রমাকে স্কুলে পাঠাতে ভুল করেন নি তারা। জীবিকার এই কঠিন লড়াইয়ের মধ্যেও ছেলে মেয়েরা সংগ্রাম চালিয়ে যায়। পড়াশুনার পাশপাশি স্কুলের শিশুদের পড়িয়ে নিজেদের খরচ চালায় অরুন-নীলিমার সন্তানেরা। বড় ছেলে দীপ এখন শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে বিবিএ উত্তীর্ণ শেষে মাস্টার্স করছে। মেয়ে ইমা তালুকদার সিলেট নার্সিং কলেজ থেকে মিডওয়াইফারি সম্পন্ন করে চাকুরি খোঁজছে। অপূর্ব তালুকদার সিলেটের শাহপরান সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে।
ছোট মেয়ে প্রমা রানী তালুকদার এবার নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছে। এর আগে সুনামগঞ্জ শহরের কালিবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫, সরকারি এসসি বালিকা বিদ্যালয় থেকে জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএি-৫ এবং সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল সে।
প্রমা বললো, ছোট বেলায় মাকে সেলাই কাজে এবং বাবার কাজে যেভাবে পারা যায় সহযোগিতা করেছি, এখনো করছি। এসএসসি ও এইএসসি পড়ার সময় টিউশনি করেছি। এখনো দুয়েকটি ছাত্র পড়াই। ভাবছি নেত্রকোনা গিয়ে ছাত্র পাব কি-না, মেডিকেলে ক্লাস করে টিউশনি করতে পারবো কি-না। এতো ভাবনার মাঝেও ডাক্তার হবার সংগ্রাম চালিয়ে যাবার কথা জানিয়ে সে বললো, আমার ফলাফলে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি সকলেই খুশি হয়েছেন। সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছেন সকলে। অসীম মনেবলের অধিকারী প্রমা জানালো, মা-বাবার স্বপ্নপূরণের জন্যই ডাক্তার তাকে হতেই হবে।
মা নীলিমা রানী তালুকদার বললেন, সন্তানদের পড়াশুনার তাগাদা দিয়েছি, কিন্তু কিভাবে তারা খরচ যোগালো, এখন কিভাবে পড়বে, আমি কিছুই জানি না। একই মন্তব্য করলেন, বাবা অরুন চন্দ্র তালুকদারও।
এই দম্পত্তি বললেন, ছোট্ট বাসার মাসে ২৭০০ টাকা ভাড়াই ব্যবস্থা করতে সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। দুই বেলার খাবার এখনো মেয়ের জন্য ব্যবস্থা করতে পারি না আমরা। মেয়েকে ডাক্তার হিসাবে দেখার স্বপ্ন আছে, কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না জানেন না তারা।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত সোমবার প্রমা’র ভর্তি ফি’র জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা সহায়তা তুলে দেন।


