শনিবার বেশ ঘটা করেই উদযাপিত হলো কমিউনিটি পুলিশিং ডে। কমিউনিটি পুলিশিং বলে বাংলাদেশ পুলিশে বর্তমানে একটি চর্চা রয়েছে। তার মূল কথা হলো জনগণকে সাথে নিয়ে দায়িত্ব পালন। এবারে দিবসটি উপলক্ষে মূল প্রতিপাদ্য বক্তব্য নির্ধারিত ছিলোÑ মুজিববর্ষে পুলিশ নীতি-জনসেবা আর সম্প্রীতি। দিবসটিতে সারা দেশের ন্যায় সুনামগঞ্জ জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন ছিলো চোখে পড়ার মতো। পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের এই নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে একটি দিবস উদযাপন অন্তত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পুলিশ এখন আর প্রভু নয়, তারা জনগণের বন্ধু। ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার সময় জনগণকে দাবিয়ে রাখতে যে পুলিশিং সিস্টেম উপমহাদেশে বৃটিশরা গড়ে তুলেছিলো আজকের স্বাধীন দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা পুলিশ বাহিনির চরিত্র একেবারেই ভিন্ন হবে, এটি খুবই প্রত্যাশিত। কিন্তু আমরা এমন একটি জনবান্ধব পুলিশ পেয়েছি কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ থাকলেও বলা যেতে পারে, মানুষের শেষ ভরসার জায়গা কিন্তু এই পুলিশ বাহিনিই। পুলিশের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে বিভিন্নভাবে পুলিশের জনবান্ধব চরিত্রটিকে প্রস্ফূটিত করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ চালু আছে। এরই অংশ এই কমিউনিটি পুলিশিং। বিশেষ এই দিনকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশ পুলিশের গণমুখী ভূমিকার জায়গাটিকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জনপ্রিয় লেখক ড. জাফর ইকবাল অপরাধী মুক্ত বাংলাদেশ দেখার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন। তিনি ইউরোপের কয়েকটি দেশের জেলখানা বন্ধ করে দেয়ার উদাহরণ টেনে আমাদের প্রিয় দেশটিকেও জেলখানা মুক্ত দেশ হিসাবে দেখতে চেয়েছেন। তার এই সুন্দর আকাক্সক্ষার সাথে বাস্তবতার বিন্দুমাত্র মিল না থাকলেও কিংবা অদূর ভবিষ্যতে এমন অবস্থা তৈরি হওয়ার বাতাবরণের অনুপস্থিতি সত্বেও সকলের মনেই এমন আকাক্সক্ষা সুপ্ত রয়েছে। ড. জাফর ইকবাল দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের মনের আকাক্সক্ষার প্রতিধ্বনি ঘটিয়েছেন বলা যেতে পারে। অপরাধ কমার সাথে দেশের আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্পর্ক একেবারে প্রত্যক্ষ। আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থার সুষম ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা বজায় থাকলে অপরাধপ্রবণতা কমতে বাধ্য। কিন্তু একটি সমাজে সীমাহীন বৈষম্য চালু রেখে অপরাধ থেকে মুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা আপাতত কল্পনা বিলাস হলেও শেষ পর্যন্ত আমাদের ওই রাস্তায়ই হাঁটতে হবে। শুধু আইন-শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থাদির মাধ্যমে পৃথিবীর কোনো দেশে কখনও শান্তি ও নিরপরাধ পরিবেশ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সুতরাং আমরা যখন পুলিশের নিকট থেকে গণমুখী ও আকাক্সিক্ষত ভূমিকা প্রত্যাশা করব তখন আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গণমুখী করার ক্ষেত্র কতটুকু তৈরি করা গেছে। মূলত সমাজের অপরাপর জায়গাকে অপরিবর্তিত রেখে বিশেষ একটি জায়গাকে কখনও পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত উত্তরাধিকার। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিলো এই বাহিনির মধ্য থেকে। পুরো মুক্তিযুদ্ধ জোড়ে পুলিশ বাহিনির ছিলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। স্বাধীন দেশে এই বাহিনি যখন যাত্রা শুরু করে তখন তাঁদের অন্তরে মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শগুলোই জাগ্রত ছিলো। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই বাহিনি এখনও ওই মূল্যবোধ লালন করে চলেছে। জনগণের ভরসার জায়গাও এইটুকু। সর্বস্তরে লোভ-অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভরা একটি দেশে পুলিশ বাহিনি যতটুকু ভূমিকা রাখছে তার জন্যই আমরা এখনও শান্তিতে ঘুমাতে পারছি। এই স্বস্তিটুকু জুগিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশ বাহিনির প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।
কমিউনিটি পুলিশিং ডে উপলক্ষে জনগণকে সাথে নিয়ে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্নের কথা উচ্চারিত হয়েছে তা পূর্ণতা পাক এই আমাদের কামনা।

